Logo
Logo
×

আন্তর্জাতিক

ইসরায়েল ও হামাসের সমঝোতা: গাজা যুদ্ধ থামাতে ‘প্রথম ধাপের’ শান্তিচুক্তি সম্পন্ন

ডেস্ক রিপোর্ট

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৫, ১১:১৬ এএম

ইসরায়েল ও হামাসের সমঝোতা: গাজা যুদ্ধ থামাতে ‘প্রথম ধাপের’ শান্তিচুক্তি সম্পন্ন

ইসরায়েল ও হামাস অবশেষে যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপে সম্মত হয়েছে। এই চুক্তির আওতায় গাজায় বন্দি কিছু জিম্মি ও কয়েদিকে মুক্তি দেওয়া হবে। দীর্ঘ দুই বছরের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর এটাই সবচেয়ে বড় আশার খবর। এই যুদ্ধ এখন পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষের প্রাণ নিয়েছে, গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থির করে তুলেছে এবং পৃথিবীর নানা দেশে বিক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ প্ল্যাটফর্মে চুক্তির খবর ঘোষণা করেন। তিনি লিখেছেন, গাজায় বন্দি সব জিম্মিকে শিগগির মুক্তি দেওয়া হবে, আর ইসরায়েল তাদের সেনা প্রত্যাহার করবে এক নির্দিষ্ট সীমারেখা পর্যন্ত—যা ‘দীর্ঘস্থায়ী ও স্থায়ী শান্তি’র প্রথম ধাপ।

হামাস বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত পরিকল্পনার আলোচনার পর তারা এই চুক্তিতে পৌঁছেছে। এতে গাজা উপত্যকা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং বন্দি বিনিময়ের বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। হামাস আরও জানিয়েছে, তারা ট্রাম্প ও মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর কাছে আহ্বান জানিয়েছে যাতে ইসরায়েল পুরোপুরি যুদ্ধবিরতি কার্যকর করে। সংগঠনটি বলেছে, এখনো জীবিত থাকা ২০ জন জিম্মিকে তারা সপ্তাহান্তের মধ্যেই মুক্তি দিতে প্রস্তুত, আর বন্দি বিনিময় প্রক্রিয়া শুরু হবে চুক্তি সইয়ের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে।

বুধবার এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন, জিম্মিরা সোমবারের মধ্যেই ঘরে ফিরবে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘ঈশ্বরের কৃপায় আমরা সবাইকে ঘরে ফিরিয়ে আনব।’

নেতানিয়াহু এই দিনটিকে ‘ইসরায়েলের জন্য মহান দিন’ বলে উল্লেখ করেন এবং জানান, বৃহস্পতিবার তার সরকার বৈঠক করে গাজা যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুমোদন করবে। তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের জিম্মিদের মুক্তির এই পবিত্র প্রয়াসে নিষ্ঠা দেখানোর জন্য আমি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার দলকে হৃদয়ের গভীর থেকে ধন্যবাদ জানাই।’

ট্রাম্পের ঘোষণার পর তেলআবিবে ‘হোস্টেজ স্কয়ারে’ লোকজন জড়ো হয়ে উল্লাস প্রকাশ করে। কেউ কেউ চিৎকার করে বলে ওঠে, ‘ট্রাম্পকে নোবেল পুরস্কার দাও!’ কেউ কেউ শ্যাম্পেন খুলে আনন্দে কেঁদে ফেলে, মুক্তিপ্রাপ্ত পরিবারদের জড়িয়ে ধরে।

গাজায় খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর মানুষ মিশ্র অনুভূতিতে ভরে ওঠে। কেউ বিশ্বাস করতে পারছিল না, কেউ আনন্দে কেঁদে ফেলেছিল। গাজার বাসিন্দা সামের জৌদে সংবাদ সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘সত্যি বলতে, খবরটা শুনে আমি কাঁদা থামাতে পারিনি। আনন্দের কান্না। দুই বছরের বোমা, ভয়, ধ্বংস, অপমান—প্রতিটি দিন মৃত্যুভয়ে কেটেছে।’

ট্রাম্প একে ‘আরব ও মুসলিম বিশ্ব, ইসরায়েল, প্রতিবেশী দেশ ও যুক্তরাষ্ট্র—সবাইয়ের জন্য মহান দিন’ বলে বর্ণনা করেন। তিনি কাতার, মিসর ও তুরস্ককে ধন্যবাদ জানান মধ্যস্থতার ভূমিকার জন্য। তার কথায়, ‘ধন্য তারা, যারা শান্তি আনে।’

নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প ফোনে কথা বলেন এবং একে অপরকে অভিনন্দন জানান। নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে ইসরায়েলি সংসদে বক্তৃতা দেওয়ার আমন্ত্রণও জানান।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে সব পক্ষকে আহ্বান জানিয়েছেন যেন তারা এর শর্ত পূর্ণভাবে মেনে চলে।

ভারত থেকে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কেয়ার স্টারমারও। তিনি একে বলেছেন ‘গভীর স্বস্তির মুহূর্ত’। তিনি বলেন, ‘মিসর, কাতার, তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের অক্লান্ত কূটনৈতিক প্রচেষ্টার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। এখন প্রয়োজন দ্রুত এই চুক্তি বাস্তবায়ন ও গাজায় মানবিক সহায়তার সব বাধা তুলে নেওয়া।’

চুক্তি সফলভাবে কার্যকর হলে এটি হবে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হিসেবে সবচেয়ে বড় পররাষ্ট্রনীতি অর্জন। জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার সময় তিনি গাজা ও ইউক্রেনের যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যদিও বাস্তবে তা তার ধারণার চেয়ে অনেক কঠিন হয়ে পড়ে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কাতার ও তুরস্কের প্রতিনিধিরা এ সপ্তাহে মিশরের শার্ম আল শেখে তিন দিনব্যাপী পরোক্ষ আলোচনায় অংশ নেন। এই আলোচনাতেই প্রথম ধাপের ২১ দফা পরিকল্পনার ওপর দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা তৈরি হয়।

চুক্তির বিস্তারিত এখনও প্রকাশ হয়নি, আর বাস্তবায়ন কঠিন হবে বলেই মনে করা হচ্ছে। তবে এটি সফল হলে গত দুই বছরে যুদ্ধ থামাতে যত চেষ্টা হয়েছে, তার মধ্যে এটাই সবচেয়ে কার্যকর হবে বলে অনেকে মনে করছেন।

চুক্তি ঘোষণার পর ট্রাম্প ফক্স নিউজকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র গাজার পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখবে। তার কথায়, ‘আমরা তাদের সফল হতে সাহায্য করব, শান্তি টিকে থাকুক সেটিও নিশ্চিত করব। আমি খুবই আত্মবিশ্বাসী—মধ্যপ্রাচ্যে এবার সত্যিকারের শান্তি আসবে।’

এই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের আকস্মিক হামলা দিয়ে, যেখানে প্রায় ১২০০ ইসরায়েলি নিহত হন, তাদের অধিকাংশই ছিল সাধারণ মানুষ। এরপর ইসরায়েলের পাল্টা অভিযানে কয়েক হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে, গাজা বিধ্বস্ত, আর বিশ্ব রাজনীতি নড়ে গেছে।

গত কয়েক দিনে ট্রাম্পের আহ্বানে ইসরায়েল কিছুটা হামলা কমালেও পুরোপুরি বন্ধ করেনি। গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েলি হামলায় মারা গেছে আটজন—যা সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম। গত মাসে প্রতিদিনের মৃত্যুর সংখ্যা ছিল এর প্রায় দশগুণ।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন