Logo
Logo
×

আন্তর্জাতিক

যুদ্ধ শেষের ‘নিশ্চয়তা’ চায় হামাস, দ্বিতীয় দিনের আলোচনায় ইঙ্গিত

ডেস্ক রিপোর্ট

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৫, ১০:৩০ এএম

যুদ্ধ শেষের ‘নিশ্চয়তা’ চায় হামাস, দ্বিতীয় দিনের আলোচনায় ইঙ্গিত

হামাস জানিয়েছে, তারা এমন নিশ্চয়তা চাইছে যাতে ইসরায়েল গাজায় চলমান যুদ্ধ সম্পূর্ণ বন্ধ করে এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড থেকে সেনা প্রত্যাহার করে নেয়। মিসরে দ্বিতীয় দিনের মতো পরোক্ষ আলোচনার পর এই তথ্য প্রকাশ পায়।

মঙ্গলবার মিসরের শার্ম আল-শেখে আলোচনার দ্বিতীয় দিন শেষ হয়।

এর আগে হোয়াইট হাউসে যুদ্ধ শুরুর দ্বিতীয় বার্ষিকীতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, গাজা নিয়ে সমঝোতার ‘বাস্তব সুযোগ’ তৈরি হয়েছে।

এরপর বুধবার থেকে আলোচনায় যোগ দিচ্ছেন কাতার ও যুক্তরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা। তারা আলোচনায় অংশ নিতে মিসরের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন।

মঙ্গলবার দিনের শুরুতে হামাসসহ বেশ কয়েকটি ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীর জোট এক যৌথ বিবৃতি দেয়। তারা জানায়, ‘সব উপায়ে প্রতিরোধ অব্যাহত থাকবে।’ সেই সঙ্গে বলে, ‘ফিলিস্তিনি জনগণের অস্ত্র কেড়ে নেওয়ার অধিকার কারও নেই।’ এটি আসলে ট্রাম্পের পরিকল্পনায় থাকা হামাস নিরস্ত্রীকরণের প্রস্তাবেরই প্রতিক্রিয়া।

হামাসের জ্যেষ্ঠ নেতা ফাউজি বারহুম বলেন, তাদের আলোচকরা যুদ্ধের অবসান এবং গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ‘সম্পূর্ণ প্রত্যাহার’-এর নিশ্চয়তা চান। কিন্তু ট্রাম্পের পরিকল্পনায় সেনা প্রত্যাহারের সুনির্দিষ্ট সময়সূচি নেই—সেটি কেবল তখনই শুরু হবে, যখন হামাস তাদের হাতে থাকা ৪৮ জন ইসরায়েলি বন্দিকে ফেরত দেবে। ধারণা করা হয়, তাদের মধ্যে প্রায় ২০ জন এখনো জীবিত।

একজন জ্যেষ্ঠ হামাস কর্মকর্তা আল জাজিরাকে বলেন, গাজার সেনা প্রত্যাহারের ধাপের সঙ্গে মিলিয়ে পর্যায়ক্রমে বন্দিমুক্তির পরিকল্পনা করছে হামাস। মঙ্গলবারের আলোচনায় মূলত এই বন্দিমুক্তি ও ইসরায়েলি বাহিনীর প্রত্যাহার মানচিত্র নিয়েই আলোচনা হয়। হামাস পক্ষ জানায়, শেষ ইসরায়েলি বন্দি মুক্তির মুহূর্তেই গাজা থেকে শেষ ইসরায়েলি সেনার চলে যাওয়া নিশ্চিত করতে হবে।

হামাসের প্রধান আলোচক খালিল আল-হাইয়া মিসরের রাষ্ট্রীয় সংযোগমাধ্যম আল কাহেরা নিউজকে বলেন, ‘আমরা দখলদার শক্তির ওপর এক মুহূর্তের জন্যও ভরসা করি না।’ তিনি বলেন, হামাস যুদ্ধ সম্পূর্ণ বন্ধের জন্য ‘বাস্তব নিশ্চয়তা’ চায়, কারণ ইসরায়েল এর আগেও দুইবার যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভঙ্গ করেছে।

অন্যদিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েল আক্রমণের বার্ষিকী উপলক্ষে এক বিবৃতিতে বলেন, গত দুই বছরের সংঘাত ছিল ‘আমাদের অস্তিত্ব ও ভবিষ্যতের জন্য এক যুদ্ধ।’ তিনি বলেন, ইসরায়েল এখন ‘গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের মুহূর্তে’ রয়েছে। যুদ্ধবিরতির প্রসঙ্গ না তুলেই জানান, ইসরায়েল যুদ্ধের মূল লক্ষ্যগুলো অর্জন না করা পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে যাবে—সব বন্দি ফেরত আনা, হামাসের শাসন ব্যবস্থা ধ্বংস করা এবং গাজাকে আর কখনও ইসরায়েলের জন্য হুমকি হতে না দেওয়া।

তবু আলোচনাকে আশাব্যঞ্জক বলছেন অনেকে। কারণ, ইসরায়েল ও হামাস উভয় পক্ষই ট্রাম্পের পরিকল্পনার বেশ কিছু অংশে সম্মতি জানিয়েছে।

কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি বলেন, মধ্যস্থতাকারী তিন দেশ—কাতার, মিসর ও তুরস্ক—আলোচনার সময় পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেদের অবস্থান নমনীয় রাখছে এবং নতুন ধারণা তৈরি করছে। তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো পূর্বধারণা নিয়ে আলোচনায় যাই না। আলোচনার মধ্যেই কাঠামো গড়ে তুলি, যা এখনই হচ্ছে।’

আল-আনসারি জানান, কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুররহমান আল থানি বুধবার মিসরে আলোচনায় যোগ দেবেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে থাকবেন স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণই প্রমাণ করে, মধ্যস্থতাকারীরা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।’

তবে যুদ্ধ শেষ হলেও প্রশ্ন রয়ে যায়—গাজা কে পরিচালনা করবে, কে পুনর্গঠন করবে, আর সেই বিপুল ব্যয় বহন করবে কে?

ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছেন, হামাসকে কোনো প্রশাসনিক ভূমিকায় রাখা হবে না। ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, গাজা পরিচালনা করবে ফিলিস্তিনি ‘প্রযুক্তিবিদদের’ একটি দল, যারা আন্তর্জাতিক অস্থায়ী শাসন সংস্থা ‘বোর্ড অব পিস’-এর অধীনে কাজ করবে। সেই বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে থাকবেন ট্রাম্প নিজে ও যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার।

হামাসের মুখপাত্র বারহুম বলেন, তাদের দাবি হলো ‘একটি ফিলিস্তিনি জাতীয় সংস্থার তত্ত্বাবধানে অবিলম্বে পূর্ণ পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু করা।’ হামাস জানিয়েছে, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তারা গাজার প্রশাসনে অংশ নেবে না।

এদিকে আলোচনার মধ্যেও ইসরায়েল গাজায় বিমান ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। মঙ্গলবার গাজা সিটি ও আশপাশের সাবরা ও তল আল-হাওয়া এলাকায় হামলায় অন্তত ১০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হন বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনের সরকারি সংবাদ সংস্থা ‘ওয়াফা’। পুরো যুদ্ধজুড়ে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৬ হাজার ৬০০-এরও বেশি। গত শুক্রবার ট্রাম্প বোমা হামলা বন্ধের আহ্বান জানানোর পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন আরও অন্তত ১০৪ জন।

আল জাজিরার প্রতিবেদক হিন্দ খুদারি মঙ্গলবার জানান, গাজার পূর্বাঞ্চলে এক কিশোরকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এবং দক্ষিণে খান ইউনিসে পৃথক হামলায় অন্তত ছয় ফিলিস্তিনি মারা গেছেন। তিনি বলেন, ‘সবাই শান্তিচুক্তির অপেক্ষায়, অথচ বোমা পড়া থামছে না। ইসরায়েলি বাহিনী এখনো আবাসিক এলাকা ধ্বংস করে চলেছে—যে জায়গাগুলোতে ফিলিস্তিনিরা ফিরে গিয়ে জীবন গড়ার স্বপ্ন দেখছিল।’

মার্কিন গবেষণা সংস্থা এসিএলইডি জানায়, গত দুই বছরে গাজায় ১১ হাজারেরও বেশি বিমান ও ড্রোন হামলা এবং ৬ হাজার ২৫০টিরও বেশি গোলাবর্ষণ ও আর্টিলারি আক্রমণ চালানো হয়েছে। শুধু গাজাতেই বিশ্বব্যাপী সংঘাতে নিহত মোট মানুষের প্রায় ১৪ শতাংশ প্রাণ হারিয়েছে।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই যুদ্ধে ১,৭০১ জন চিকিৎসাকর্মী নিহত হয়েছেন।

সূত্র: আল জাজিরা

Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন