আল জাজিরার মতামত প্রতিবেদন
বিশ্বজুড়ে বদলে যাচ্ছে জনমত, ইসরায়েলকেও বদলাতে হবে
সোমদীপ সেন
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৫, ০১:৩৪ পিএম
শুক্রবার হামাস যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ‘২০ দফা গাজা শান্তি পরিকল্পনা’-র প্রতি তাদের আনুষ্ঠানিক জবাব পাঠিয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ফিলিস্তিনি সংগঠনটি জানিয়েছে, তারা গাজার প্রশাসনিক দায়িত্ব একটি টেকনোক্র্যাটদের (অরাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের) হাতে তুলে দিতে রাজি, আর এর বিনিময়ে তারা ইসরায়েলের হাতে থাকা ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্তি চায়।
এই জবাবকে স্বাগত জানিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইসরায়েলকে ‘তাৎক্ষণিকভাবে বোমাবর্ষণ বন্ধ করার’ নির্দেশ দেন।
তবু হামাসের প্রতিক্রিয়া পাঠানোর পরের ৪৮ ঘণ্টায় ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৯৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
যদিও ট্রাম্পের প্রস্তাবিত এই পরিকল্পনা ফিলিস্তিনিদের জন্য কিছুটা স্বস্তি বয়ে আনতে পারে, বাস্তব অর্থে এটি শান্তি আনবে না—কারণ স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কেবল ফিলিস্তিনের কাছেই নয়, ইসরায়েলের কাছেও দায়িত্ব নিতে হবে।
ইসরায়েলকেও তার সহিংসতা ও ধ্বংসযজ্ঞের নীতি থেকে সরে আসতে হবে।
এখন যদি ইসরায়েলের জন্যও একটি বাস্তব শান্তি-পরিকল্পনা ভাবা যায়, তা হতে পারে এমন—
ইসরায়েলি রাজনীতি ও জনজীবনকে চরমপন্থা থেকে ফিরিয়ে আনতে হবে। গত দুই বছরে ইসরায়েলের রাজনৈতিক নেতারা প্রকাশ্যে ফিলিস্তিনি গণহত্যাকে সমর্থন করেছেন, অনেকে তা উদ্যাপনও করেছেন। সেই মানসিকতা বদলাতে হলে শিক্ষা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে সহনশীলতা ও সহাবস্থানের চর্চা জরুরি।
ইসরায়েলের সেনাবাহিনীকে সংস্কার করতে হবে। বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করা বা ফিলিস্তিনি বাড়িঘর ধ্বংসের ভিডিও নিয়ে ব্যঙ্গ করা—এসব আচরণে মানবিক মূল্যবোধের কোনো স্থান নেই। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের ভিত্তিতে সেনাবাহিনীর আচরণবিধি নতুনভাবে গড়ে তুলতে হবে।
ইসরায়েলের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচারের আওতায় আনতে হবে। মানবাধিকার সংস্থা ও বিভিন্ন সংগঠন ইতিমধ্যেই যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ সংগ্রহ করছে।
গাজার অবরোধ শেষ করতে হবে। ২০০৭ সাল থেকে যে স্থল, আকাশ ও সমুদ্র অবরোধ চলছে, তা তুলে দিয়ে মানুষ ও পণ্যের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করতে হবে।
গাজায় আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দল বা শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন করতে হবে, যাতে ইসরায়েলি সেনা বা উগ্রবাদীদের পক্ষ থেকে কোনো সহিংসতা না ঘটে।
আন্তর্জাতিক আদালতের ২০২৪ সালের রায়ে বলা হয়েছে, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ। সেই অনুযায়ী, ইসরায়েলকে অবিলম্বে এসব কর্মকাণ্ড বন্ধ করে অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে।
পশ্চিম তীর ও জেরুজালেমকে সামরিক দখলমুক্ত করতে হবে। চেকপোস্ট, দেয়াল, নজরদারি টাওয়ার—সব তুলে দিয়ে ফিলিস্তিনিদের ভূমির ওপর তাদের অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে।
হাজারো ফিলিস্তিনি এখনও ইসরায়েলের কারাগারে বিচার ছাড়াই বন্দি আছেন। প্রশাসনিক আটকনীতি বন্ধ করে তাদের মুক্তির ব্যবস্থা নিতে হবে।
ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের ‘নিজ দেশে ফেরার অধিকার’ নিয়ে আলোচনায় বসতে হবে। এর জন্য ফিলিস্তিনি প্রতিনিধি, জাতিসংঘের সংস্থা ও শরণার্থী বিষয়ক সংগঠনগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
ইসরায়েল তার নীতির পক্ষে আন্তর্জাতিক প্রচারণায় বিপুল অর্থ ব্যয় করছে—২০২৪ সালে শুধু এই খাতে ১৫ কোটি ডলার ব্যয় হয়েছে। এসব প্রচারণা অন্য দেশের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ করছে কি না, তা আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ প্যানেলের মাধ্যমে তদন্ত করতে হবে।
অবশ্য, ইসরায়েল সরকার এই দশ দফা বাস্তবায়নে আগ্রহ দেখাবে—এমন সম্ভাবনা এখনই কম।
তবুও বিশ্ব জনমত দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ইসরায়েলের একতরফা বক্তব্য আর আগের মতো প্রভাবশালী নেই।
বিশ্বজুড়ে ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে—ফিলিস্তিন প্রশ্ন কেবল ফিলিস্তিনের নয়; এটি গোটা মধ্যপ্রাচ্য ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
আর এই জটিল বাস্তবতাকে স্বীকার করেই, ইসরায়েলের ওপর দায়িত্বের ভার সঠিকভাবে চাপিয়ে দিয়েই কেবল স্থায়ী শান্তির পথ খোলা সম্ভব।
সোমদীপ সেন ‘ডিকলোনাইজিং প্যালেস্টাইন: হামাস বিটুইন দ্য অ্যান্টিকলোনিয়াল অ্যান্ড দ্য পোস্টকলোনিয়াল’ বইটির লেখক। তিনি প্রিটোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর এশিয়ান স্টাডিজ ইন আফ্রিকা-এর গবেষণা সহযোগী হিসেবে কর্মরত।
