Logo
Logo
×

আন্তর্জাতিক

অং সান সুচির মুক্তির জন্য চীনের সহায়তা চাইলেন ছেলে কিম এরিস

Icon

এমি চিউ

প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৫, ০৯:৩৯ এএম

অং সান সুচির মুক্তির জন্য চীনের সহায়তা চাইলেন ছেলে কিম এরিস

জীবনের বেশিরভাগ সময়ই আলোচনার বাইরে থেকেছেন কিম এরিস। বয়স এখন তার আটচল্লিশ। মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সুচির ছোট ছেলে তিনি। বিখ্যাত মায়ের নামের আড়ালে থেকেও বরাবরই নীরব ছিলেন। সংবাদমাধ্যম যখন তাকে খুঁজে ফিরত, তখনও তিনি মুখ খুলতেন না—মায়ের সঙ্গে দেখা করার বিরল সুযোগে ফটোগ্রাফারদের ক্যামেরা ঝলসে উঠত, আর কিম থাকতেন নির্বাক।

কিন্তু ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর সবকিছু বদলে যায়। মায়ের কারাবন্দি জীবন, দুর্বল হয়ে পড়া হৃদযন্ত্র আর কঠোর একাকী কারাবাসের খবর পৃথিবীকে জানাতে বাধ্য হয়ে এবার নীরবতা ভাঙলেন তিনি। লন্ডনে বসে বিশ্বের কাছে আকুতি জানালেন—মাকে যেন মুক্তি দেওয়া হয়।

অং সান সুচি, এখন আশির কোঠায়, জীবনের মোট উনিশ বছর কাটিয়েছেন বন্দিত্বে। কখনও গৃহবন্দি, এখন একাকী কারাগারে। ১৯৯১ সালে পাওয়া নোবেল শান্তি পুরস্কারটি তার দুই ছেলে গ্রহণ করেছিলেন মায়ের অনুপস্থিতিতে।

কিম এরিস বিশ্বাস করেন, সুচির মুক্তিতে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে চীন। তার ভাষায়, ‘চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের প্রতি আমার অনুরোধ—তিনি যেন মায়ের মুক্তির জন্য আহ্বান জানান। চীন মিয়ানমারের পুরোনো বন্ধু, সবচেয়ে বেশি প্রভাব তাদেরই।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার জানামতে, চীনের কর্মকর্তারাও সুচিকে দেখতে চান, কিন্তু কাউকেই তার কাছে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। কেউ যদি তাকে দেখতে পারে, অন্তত নিশ্চিত হওয়া যাবে তিনি এখনও বেঁচে আছেন।’

কিম বলেন, ‘আমি সব সময় ভাবি, মা হয়তো কারাগারে মারা যেতে পারেন। ওখানকার অবস্থা ভয়াবহ।’

জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের কারাগারগুলোতে বন্দিদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চলে—বৈদ্যুতিক শক, বেত্রাঘাত, শ্বাসরোধ, যৌন নিপীড়ন, এমনকি প্লায়ার্স দিয়ে নখ উপড়ে ফেলা পর্যন্ত।

মিয়ানমারের ছায়া সরকার ‘ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট’ জানিয়েছে, সুচি যদি বন্দিত্বে থাকেন বা সেখানেই মারা যান, তাহলে দেশের সংকট আরও গভীর হবে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিষয়ক মন্ত্রী সাসা বলেন, ‘এতে দেশ বিভক্ত হয়ে পড়বে, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হবে, জাতীয় ঐক্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।’

কিম এরিসের নিজের জীবনেরও বড় অংশ কেটেছে মায়ের অনুপস্থিতিতে। মাত্র ১১ বছর বয়সে মা তাকে রেখে মিয়ানমারের রাজধানী ইয়াঙ্গুনে যান অসুস্থ নানিকে দেখতে। তারপরই শুরু হয় সুচির রাজপথের লড়াই, আর কিমের একাকী বেড়ে ওঠা।

কিম এরিস

কিম বলেন, ‘আমার বিশ্বাস, মায়ের চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল অনেক ভালো। তিনি জানতেন, দেশের উন্নতির জন্য সেই সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ।’ তার কণ্ঠে আজও ভেসে আসে আশার সুর—‘চীন একসময় মিয়ানমারের বন্ধু ছিল। মায়ের নেতৃত্বে সেই বন্ধুত্বে আস্থা ছিল, এখন সেটাই ফিরিয়ে আনতে হবে।’

২০২০ সালের জানুয়ারিতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং মিয়ানমারে রাষ্ট্রীয় সফরে যান। দুই দিনের সেই সফরে অং সান সুচির সঙ্গে তার বৈঠকে স্বাক্ষর হয় ৩৩টি চুক্তিতে। এসব চুক্তির মধ্য দিয়ে গতি পায় বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ–এর আওতায় থাকা চীনের বড় বড় অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলো—এর মধ্যে ছিল রাখাইন প্রদেশে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ, চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর এবং ইয়াঙ্গুনে নতুন শহর গড়ার পরিকল্পনা।

সেই বছরই সুচির প্রশাসন যোগ দেয় চীনের পৃষ্ঠপোষকতায় গঠিত আঞ্চলিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ‘রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ’-এ, যেখানে অংশ নেয় এক ডজনেরও বেশি এশিয়া-প্যাসিফিক দেশ। এর আগে ২০১৫ ও ২০১৬ সালেও সুচি সফর করেছিলেন চীন।

চীন এখন মিয়ানমারের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক বিনিয়োগকারী। দ্য ইরাওয়াডি–এর সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চীনের বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৭৭০ কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি, আর চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৩০০ কোটির বেশি। চীন গত বছর মিয়ানমার থেকে ৪৪ হাজার টন বিরল খনিজ আমদানি করেছে, যা তাদের মোট আমদানির ৫৭ শতাংশ।

কিম এরিস মনে করেন, এই ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভেতরেই লুকিয়ে আছে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। তিনি বলেন, ‘মিয়ানমারের সংকট এখন চীনের জন্যও বিপদ ডেকে আনছে। সামরিক জান্তার নিয়ন্ত্রণে দেশজুড়ে গড়ে উঠছে অবৈধ কার্যক্রমের কেন্দ্র, যেখানে হাজার হাজার চীনা নাগরিক ও বিদেশি মানুষ পাচার হয়ে দাসের মতো কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে।’ জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মানুষকে জোরপূর্বক এসব প্রতারণার কেন্দ্রগুলোতে কাজ করানো হয়।

এই কেন্দ্রগুলো চীনের নাগরিকদেরও লক্ষ্য করে প্রতারণা চালাচ্ছে, যাতে ইতিমধ্যেই বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে। কিম বলেন, ‘চীন নিজের মতো করে স্থিতি ও সমৃদ্ধি চায়—তাদের জন্যও, এই পুরো অঞ্চলের জন্যও।’

২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমার এক গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে, যেখানে মারা গেছে সাত হাজারেরও বেশি মানুষ। সামরিক জান্তা এখন দেশের অর্ধেকেরও কম এলাকায় কার্যত নিয়ন্ত্রণ রাখে। ডিসেম্বরে নির্ধারিত নির্বাচন নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্ক তীব্র—অনেকেই একে ‘প্রহসন’ বলে অভিহিত করেছেন। ৪০টিরও বেশি রাজনৈতিক দল (যার মধ্যে সুচির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) রয়েছে) অংশগ্রহণ থেকে নিষিদ্ধ। ২০২০ সালের নির্বাচনে এনএলডি পেয়েছিল ৮২ শতাংশ ভোট। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, অভ্যুত্থানের পর থেকে এখন পর্যন্ত ২৯ হাজার ২০৯ জনকে রাজনৈতিক কারণে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ২২ হাজারেরও বেশি এখনও কারাগারে বন্দি।

এই প্রেক্ষাপটে কিম এরিস বলেন, ‘চীন শান্তি, জাতীয় ঐক্য আর জনগণের ইচ্ছার ভিত্তিতে সরকার দেখতে চায়। কিন্তু ভুয়া নির্বাচন দিয়ে সেটা সম্ভব নয়।’ তার বিশ্বাস, এই নির্বাচন দেশকে আরও অরাজকতা আর দুর্ভোগের দিকে ঠেলে দেবে—‘কারণ কেউ ফলাফল মেনে নেবে না, লড়াই আরও বাড়বে।’

কিম শেষ পর্যন্ত একটিই কথা বলেন—‘আমি বিশ্বাস করি, আমার মায়ের মুক্তিই মিয়ানমারের সংকট সমাধানের প্রথম ও সবচেয়ে জরুরি শর্ত।’


এমি চিউ কুয়ালালামপুরভিত্তিক একজন স্বাধীন সাংবাদিক। তিনি মূলত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের কিছু অংশ নিয়ে কাজ করেন। এর আগে তিনি ইন্দোনেশিয়া, হংকং ও সিঙ্গাপুরে কর্মরত ছিলেন। চ্যানেল নিউজএশিয়া ও রয়টার্সের সাবেক সংবাদদাতা এমি চিউ বিনিয়োগ ব্যাংকিং খাতেও কাজ করেছেন—সেখানে তিনি দাইওয়া ক্যাপিটাল মার্কেটস সিঙ্গাপুরের একজন বিশ্লেষক ছিলেন।

scmp.com থেকে অনুবাদ।

Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন