ট্রাম্প গাজায় বোমা বর্ষণ ‘অবিলম্বে’ বন্ধ করতে বললেন, হামাস রাজি জিম্মি মুক্তিতে
ডোনাল্ড ট্রাম্প গাজায় ইসরায়েলের বোমাবর্ষণ অবিলম্বে বন্ধ করতে বললেন। একইসাথে তিনি হামাসের পক্ষ থেকে তাঁর শান্তি-প্রস্তাব আংশিকভাবে মেনে নেওয়াকে স্বাগত জানালেন। দুই বছরের ভয়াবহ যুদ্ধের পর এই প্রথম দুই পক্ষকে বেশ কাছাকাছি অবস্থানে দেখা যাচ্ছে।
ট্রাম্পের প্রস্তাবে হামাস রাজি হয়েছে সব জিম্মিকে মুক্তি দেওয়ার, তার বদলে ইসরায়েলি কারাগারে থাকা ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্তি এবং গাজা শাসনের দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার শর্তে। এই ঘোষণার পর শুক্রবার রাতে একটি বিবৃতিতে হামাস জানায়, তারা প্রস্তাবের কিছু বিষয় নিয়ে আরও আলোচনা চায়। তবে তারা অস্ত্র সমর্পণের ব্যাপারে কিছু বলেনি – যেটি ট্রাম্পের পরিকল্পনার একটি মুখ্য শর্ত।
ট্রাম্প বলেন, ‘হামাসের বিবৃতি দেখে আমি বিশ্বাস করি, তারা টেকসই শান্তির জন্য প্রস্তুত। ইসরায়েলকে এখনই গাজায় বোমা হামলা বন্ধ করতে হবে, যাতে আমরা দ্রুত ও নিরাপদে জিম্মিদের ফিরিয়ে আনতে পারি। এটা শুধু গাজার ব্যাপার নয়, এটা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে বহু প্রতীক্ষিত শান্তির প্রসঙ্গ।’
একটি ছোট ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, ‘আজ একটি বিশেষ দিন। সবাই ন্যায়সঙ্গতভাবে বিবেচিত হবে।’
হামাসের প্রতিক্রিয়ার পর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দপ্তর থেকে একটি বিবৃতি জানায়, তারা জিম্মি মুক্তির প্রথম ধাপ ‘অবিলম্বে বাস্তবায়নের’ প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে ইসরায়েল ট্রাম্পের বোমা হামলা বন্ধের আহ্বানে কোনো মন্তব্য করেনি।
দীর্ঘ সময় ধরে ট্রাম্পই একমাত্র আন্তর্জাতিক নেতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন যিনি নেতানিয়াহুকে যুদ্ধবিরতিতে রাজি করাতে পারেন।
তবে গাজায় পরিস্থিতি ভিন্ন। ট্রাম্পের আহ্বানের পরও ইসরায়েলি ট্যাংক গাজার কেন্দ্রস্থল তালাতিনি সড়কে গোলাবর্ষণ করেছে বলে জানায় বাসিন্দারা। হামাস বিবৃতি দেওয়ার ঠিক পরে গাজা শহরে বিমান হামলাও আরও বেড়ে যায়। রিমাল পাড়ায় একাধিক বাড়ি আক্রান্ত হয়েছে। খান ইউনিসেও হামলা হয়, তবে হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
এএফপির এক সাংবাদিক জানান, আল-মাওয়াসির উপকূলীয় এলাকায় টেন্টে থাকা বহু ফিলিস্তিনি ‘আল্লাহু আকবার!’ ধ্বনি দিয়ে উল্লাস প্রকাশ করেন হামাসের সিদ্ধান্ত জানার পর। সেখানকার বাসিন্দা সমাহ আল-হু বলেন, ‘খবরটা পড়েই কাঁপতে শুরু করলাম। মনে হলো, আল্লাহ শেষমেশ আমাদের একটু মুক্তি দিলেন।’
হামাস এক বিবৃতিতে জানায়, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রস্তাবে উল্লেখ করা বিনিময় সূত্র অনুযায়ী সব দখলদার বন্দিকে – জীবিত বা মৃত – মুক্তি দিতে আমরা প্রস্তুত।’ তারা আরও জানায়, ‘গাজার প্রশাসন স্বাধীন ও জাতীয় ঐক্যমতের ভিত্তিতে গঠিত এক ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট প্রশাসনের হাতে তুলে দিতে প্রস্তুত, যেটি আরব ও ইসলামী সমর্থনে পরিচালিত হবে।’
তবে ট্রাম্পের প্রস্তাবের কিছু বিষয় নিয়ে তারা আরও আলোচনা চায়। সেই বিষয়গুলোর মধ্যে গাজা থেকে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহার, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিশ্চয়তা, এবং স্থায়ী যুদ্ধবিরতির প্রশ্ন থাকতে পারে।
হামাসের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা আল জাজিরাকে বলেন, ইসরায়েল গাজা থেকে পুরোপুরি সরে না গেলে তারা অস্ত্র সমর্পণ করবে না। এর মাধ্যমে দুই পক্ষের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট হয়।
ট্রাম্পের পরিকল্পনায় যুদ্ধ তাৎক্ষণিকভাবে থামানো, ৭২ ঘণ্টার মধ্যে জিম্মি ও বন্দি বিনিময়, ধাপে ধাপে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহার, হামাসের অস্ত্র সমর্পণ এবং ট্রাম্পের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী প্রশাসন গঠন করার কথা বলা হয়েছে।
এই প্রস্তাবে গাজায় সাহায্য প্রবাহ এবং ধ্বংসস্তূপ পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। গাজা বর্তমানে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের মুখে পড়েছে।
এই পরিকল্পনাকে হামাসের জন্য অসুবিধাজনক বলেই দেখা হচ্ছে। পুরো পরিকল্পনা মেনে নিলে হামাসের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিসেবে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। অথচ ইসরায়েলকে বড় কোনো ছাড় দিতে বলা হয়নি। আন্তর্জাতিক চাপ রয়েছে হামাসের ওপর।
হামাসের পক্ষ থেকে এখনো অস্ত্র জমা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি না আসলেও জিম্মি হস্তান্তরের বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, প্রায় দুই বছরের যুদ্ধজুড়ে এই জিম্মিদেরই তারা মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে। তাদের মুক্তি দিয়ে ফায়দা তোলার রাস্তা সংকুচিত হয়ে যাবে।
গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানায়, ইসরায়েলের হামলায় এ পর্যন্ত ৬৬,২৮৮ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন প্রায় ১,৭০,০০০ জন – যাদের অধিকাংশই সাধারণ মানুষ। এতে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া বা পরোক্ষভাবে মারা যাওয়া মানুষের সংখ্যা অন্তর্ভুক্ত নয়।
জাতিসংঘের তদন্ত কমিশন এবং অনেক মানবাধিকার সংস্থা মনে করে, গাজায় ইসরায়েল গণহত্যা চালিয়েছে। তবে নেতানিয়াহুর সরকার বলছে, তারা আত্মরক্ষায় কাজ করেছে।
যুদ্ধ শুরু হয়েছিল ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর, যেদিন হামাসের নেতৃত্বে সশস্ত্র গোষ্ঠী ইসরায়েলে আক্রমণ করে প্রায় ১,২০০ জনকে হত্যা করে এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করে।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হামাসের প্রতিক্রিয়াকে স্বাগত জানিয়ে জানিয়েছে, তারা মিসরের সঙ্গে মিলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার সমন্বয় করছে।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মুখপাত্র বলেন, তিনি ‘সব পক্ষকে এই সুযোগ গ্রহণ করে গাজার ট্র্যাজেডি শেষ করতে’ আহ্বান জানাচ্ছেন।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার একে ‘উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি’ বলে মন্তব্য করেন এবং পরিকল্পনাটি ‘বিলম্ব না করে বাস্তবায়নের’ আহ্বান জানান।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ লেখেন, ‘সব জিম্মির মুক্তি ও গাজায় যুদ্ধবিরতি এখন হাতের নাগালে!’ জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ বলেন, ‘প্রায় দুই বছর পর এটাই শান্তির সবচেয়ে বড় সুযোগ।’

