Logo
Logo
×

আন্তর্জাতিক

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন

ম্যানচেস্টার সিনাগগে হামলার পুরো ঘটনা

ডেস্ক রিপোর্ট

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৫, ১১:১১ এএম

ম্যানচেস্টার সিনাগগে হামলার পুরো ঘটনা

হিটন পার্ক শুলে সেই সকাল ভোর থেকেই ভিড় জমতে শুরু করেছিল। উত্তর ম্যানচেস্টারের এই সিনাগগে ছিল ইয়োম কিপুরের বিশেষ প্রার্থনা—ইহুদিদের বর্ষপঞ্জিতে সবচেয়ে পবিত্র দিন। সাদা লম্বা পোশাকে রাব্বি ড্যানিয়েল ওয়াকার প্রার্থনা শুরু করেছিলেন। কিন্তু সকাল ৯টা ৩১ মিনিটের মধ্যে তার পোশাক রক্তে ভিজে গেল।

প্রার্থনার উদ্দেশে যাত্রীরা আসছিলেন, এমন সময় একটি ছোট কালো গাড়ি অস্বাভাবিকভাবে চালিয়ে এসে সিনাগগের গেটে ধাক্কা মারে। প্রথমে অনেকে ভেবেছিলেন চালকের হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই দেখা গেল, গাড়ি থেকে কালো পোশাক পরা এক ব্যক্তি নেমে ছুরি হাতে লোকজনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে।

‘এটা ছিল একেবারে উন্মত্ত আক্রমণ,’ বললেন এক প্রত্যক্ষদর্শী। প্রবীণ এক ব্যক্তি গেটের সামনে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে রইলেন। আরেকজন গাড়ির নিচে আটকে গেলেন। আঙিনায় ঢোকার চেষ্টা করছিল হামলাকারী, জানালায় ছুরি চালিয়ে ঢুকতে চাইছিল, আর ভেতরে উপাসকেরা মরিয়া হয়ে দরজা আটকাচ্ছিলেন।

ছয় মিনিটের মধ্যেই সশস্ত্র পুলিশ গুলি চালিয়ে হামলাকারীকে মাটিতে ফেলে দেয়। কিন্তু মাটিতে শোয়া অবস্থাতেও তার কোমরে বাঁধা তিনটি সাদা জিনিস দেখা যায়। এক পথচারী চিৎকার করে উঠলেন, ‘ওর কাছে বোমা আছে!’ আতঙ্কে জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকা ভেতরের মানুষরা স্তব্ধ হয়ে গেলেন। হামলাকারী উঠতে চাইলে আবারও গুলি চালানো হয়—এইবার প্রাণঘাতী।

এই অল্প সময়েই ইয়োম কিপুরের দিনে ইহুদি সম্প্রদায়কে আতঙ্কে কাঁপিয়ে দিল হামলাকারী। দুজন নিহত এবং অন্তত চারজন গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলেন। পুলিশ পরে বলল, উপাসকদের সাহস না থাকলে হামলাকারী সিনাগগের ভেতরে ঢুকতে পারত।

সকাল ৯টা ৩৭ মিনিটেই গ্রেটার ম্যানচেস্টার পুলিশ বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কা ঘোষণা করে ‘অপারেশন প্ল্যাটো’ চালু করল। সেনাবাহিনীর বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল ছুটে এল। ওয়েলসসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে অতিরিক্ত বাহিনী এনে মোতায়েন করা হলো।

৭৫ বছর বয়সী ফ্রান ব্যারি তাঁর ফ্ল্যাটের জানালা থেকে বিশৃঙ্খলার শব্দ শুনতে পান। ‘সাড়ে নয়টার দিকে এক ধাক্কার শব্দ শুনলাম। তারপর কয়েকটা গুলির মতো শব্দ হলো। কিছুক্ষণ পরই দেখি সশস্ত্র পুলিশ, ফায়ার ইঞ্জিন, সবকিছু হাজির।’

প্যারামেডিকরা আহতদের সাহায্য করতে ছুটে আসছিলেন। সিনাগগ ঘিরে ফেলল পুলিশ। কেউ বের হতে পারল না। হেলিকপ্টার নামল, সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন হলো। অনেকেই তখনও মোবাইল বন্ধ রেখেছিলেন—এই দিনে ফোন না চালানোর নিয়ম মেনে। তাই খবর ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছিল।

এদিকে এক নারী শুধু নাইটড্রেস পরে ছুটে এলেন এডিলম রোডে। তাঁর স্বামী ভেতরে ছিলেন, ফোন ধরছিলেন না। কাঁপা কণ্ঠে তিনি বললেন, ‘আমি অসুস্থ লাগছে, আমি শুধু পায়জামা পরেই দৌড়ে চলে এসেছি।’ তাঁর ছেলেও ভয়ে কেঁপে উঠছিল।

ব্যারি জানালেন, পুলিশ এসে ফ্ল্যাটের সব বাসিন্দাকে জানালা থেকে দূরে সরতে বলল। পরে এসে সরাসরি বলল সবাইকে অবিলম্বে সরিয়ে নেওয়া হবে। যারা ভেতরে আটক ছিলেন, তাদেরও বের করে আনা হলো। ‘আমরা যখন বের হলাম, দেখলাম বোমা স্কোয়াড, রোবট, সবকিছু। সত্যিই শিউরে উঠেছি।’

পরের দুই ঘণ্টায় বিশেষজ্ঞরা তিনটি নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ ঘটালেন—একটি ছিল সন্দেহভাজনের গাড়িতেও। তখনই নিশ্চিত হলো, এটি একটি সন্ত্রাসী হামলা।

পুরো ম্যানচেস্টারের অন্যান্য সিনাগগে পুলিশ পাঠানো হলো, হাসপাতালগুলোও লকডাউন করে দেওয়া হলো।

মধ্যাহ্নে উপাসকেরা কাঁথা জড়িয়ে, বোতলজাত পানি হাতে, হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। বাচ্চাদেরও শান্ত করার চেষ্টা চলছিল।

৩৯ বছর বয়সী জশ অ্যারনসন বললেন, তিনি পরে সিনাগগে আসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ৯টা ৩৭ মিনিটে গুলির শব্দ শুনে তিনি বুঝে যান, কিছু একটা ঘটছে। ইসরায়েলি সংবাদপত্র মারিভ–এর রিপোর্টার তিনি। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সংবাদ সংগ্রহ করেছেন। ‘আমি সেই শব্দ চিনে ফেললাম। ভাবলাম, হে ঈশ্বর, এ যে গুলির শব্দ! তারপর এত সাইরেন শুনে নিশ্চিত হলাম কিছু মারাত্মক ঘটছে।’

অ্যারনসন দেখলেন রাব্বি ওয়াকারের পোশাক রক্তে ভিজে গেছে। তিনি বললেন, ‘এটা ভাষাহীন করে দেয়। আমি সাংবাদিক, যুদ্ধ দেখেছি, কিন্তু ভাবিনি আমার নিজের এলাকায় এমন ঘটবে।’

অল্প সময় পরই পুলিশ কাছের এক গলিতে অভিযান চালিয়ে দুজনকে গ্রেপ্তার করল। পরে জানানো হলো, আরও দুজন পুরুষ এবং এক নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

গ্রেটার ম্যানচেস্টারের এই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ইহুদি সম্প্রদায় বসবাস করে আসছে। কাছেই বড় মুসলিম জনগোষ্ঠীও রয়েছে। চার মাস আগে এই এলাকায় দেয়ালে ‘নাজি জিউস আর স্কাম’ লেখা হয়েছিল। আরও কিছু হামলা হয়েছিল সিনাগগ, রেস্তোরাঁ, বাসস্টপে।

পুলিশ জানাল, হামলাকারীর নাম জিহাদ আল-শামী, বয়স ৩৫। তিনি ব্রিটিশ নাগরিক, সিরীয় বংশোদ্ভূত। তিনজনকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার’ অভিযোগে আটক করা হয়েছে।

অনেকেই বলছেন, গাজা সংঘাতের পর এই এলাকায় ইহুদিবিরোধী ঘৃণা বাড়ছে। এই হামলাও তারই অংশ হতে পারে।

অ্যারনসন বললেন, ‘এটা সবার জন্য এক সতর্কবার্তা। ইহুদিদের প্রতি যে ঘৃণা বেড়েছে, তারই প্রকাশ। আমাদের মধ্যে সংলাপ দরকার। ইসরায়েলে যা হচ্ছে, তার সব দায় ইহুদিদের ওপর চাপানো উচিত নয়।’

পুলিশ কর্ডনের বাইরে ব্যারি হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘সভ্য সমাজে এমন হয় না। এতে কারও উপকার নেই। আমি ভীষণ দুঃখ পাচ্ছি।’

তাঁর প্রতিবেশী জয়স গোল্ডস্টোন (৭৫) বললেন, ‘আমরা কাঁপছি। আমাদের এখানে কখনও শত্রুতা ছিল না। আমি ক্যাথলিক পরিবারে জন্মেছি, আমার স্বামী ইহুদি—আমাদের সবার দশ আদেশ এক, তবে কেন আমরা মিলেমিশে থাকতে পারি না?’


Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন