আল জাজিরার বিশ্লেষণ
ট্রাম্প-নেতানিয়াহু কি সত্যিই গাজা শান্তি পরিকল্পনায় একমত হয়েছেন? মূল বিষয়গুলো কী?
এলিজাবেথ মেলিমোপোলস
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:১১ পিএম
সোমবার হোয়াইট হাউসে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বললেন, তারা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আনার পথে ‘খুব কাছাকাছি’ পৌঁছে গেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বললেন, ‘অন্তত ন্যূনতমভাবে হলেও, আমরা খুব, খুব কাছাকাছি।’
তিনি ২০ দফার একটি নতুন পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন, যা দিয়ে গাজায় যুদ্ধ থামানো এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে আটকানো ইসরায়েলি বন্দিদের মুক্ত করার চেষ্টা হবে। কূটনৈতিক সূত্র বলছে, হামাসের প্রতিনিধি দল ইতিমধ্যেই এ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করছে।
ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘এটা এক বড় দিন, দারুণ এক দিন। শুধু গাজার জন্য নয়, তার বাইরেও। একে বলা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি, আমি বলি চিরশান্তি।’
তিনি জানান, বৈঠকে ইরান, বাণিজ্য, আব্রাহাম চুক্তির সম্প্রসারণসহ নানা বিষয় নিয়ে কথা হয়েছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাই ছিল গাজার যুদ্ধ শেষ করার উপায়।
ট্রাম্প জানান, আরব ও মুসলিম দেশগুলো লিখিতভাবে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে—তারা গাজা নিরস্ত্রীকরণ করবে, হামাস ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর সামরিক শক্তি দ্রুত ভেঙে দেবে। তিনি বলেন, ‘শুনছি হামাসও এটি চাইছে। এটা ভালো লক্ষণ।’
তার পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, হামাসের টানেল, অস্ত্রভাণ্ডার ও কারখানা ধ্বংস করা হবে। পাশাপাশি গাজায় নতুন একটি ‘অন্তর্বর্তী কর্তৃপক্ষ’-এর সঙ্গে স্থানীয় পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলা হবে।
ট্রাম্পের প্রস্তাব অনুযায়ী যুদ্ধ শেষে গাজা পরিচালনা করবে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্কহীন একটি ফিলিস্তিনি প্রযুক্তিবিদ নেতৃত্ব। তবে এই নেতৃত্ব বেছে নেবে ফিলিস্তিনি জনগণ নয়, বরং একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা, যার নাম হবে ‘বোর্ড অব পিস’। এর চেয়ারম্যান হবেন ট্রাম্প নিজেই।
তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারসহ কিছু আন্তর্জাতিক নেতা এই বোর্ডে থাকতে আগ্রহী। হামাস বা অন্য কোনো সশস্ত্র সংগঠন এর অংশ হবে না।
গাজার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র, আরব ও অন্যান্য মিত্র মিলে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী গঠন করবে। তবে নেতানিয়াহু সংবাদ সম্মেলনে বললেন, ‘ইসরায়েল দীর্ঘ মেয়াদে নিরাপত্তা দায়িত্ব রেখে দেবে। গাজায় বেসামরিক প্রশাসন চলবে, তবে হামাস বা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ নয়, বরং যারা শান্তিতে বিশ্বাস করে তাদের দ্বারা।’
হামাস এখনো এ পরিকল্পনার জবাব দেয়নি। ট্রাম্প বলেন, ‘এখন হামাসের পালা। তবে এ হামাস আগের মতো নেই। তাদের নেতৃত্ব একাধিকবার ধ্বংস হয়েছে। এখন অন্য মানুষদের সঙ্গে আমাদের কথা হচ্ছে।’
গাজায় অবস্থানরত আল জাজিরার সাংবাদিক তারেক আবু আজজুম জানান, অনেক ফিলিস্তিনি এই পরিকল্পনা নিয়ে সন্দিহান। তারা মনে করছে, হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ ও সরিয়ে দেওয়ার শর্ত হয়তো মানা হবে না। তবে যুদ্ধবিরতি, বন্দি বিনিময় আর সেনা প্রত্যাহারের আশা তারা হারায়নি।
সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প স্পষ্ট করেন, যদি হামাস প্রস্তাব না মানে, তবে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের পাশে থাকবে। তিনি নেতানিয়াহুকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘যদি তারা অস্বীকার করে, তবে আপনারা যা করার করবেন, আমাদের পূর্ণ সমর্থন থাকবে।’
নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমি আপনার পরিকল্পনাকে সমর্থন করি। এটি আমাদের যুদ্ধের লক্ষ্য পূরণ করবে। সব বন্দিকে ফিরিয়ে আনবে, হামাসের সামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা ভেঙে দেবে এবং নিশ্চিত করবে গাজা আর কখনো ইসরায়েলের জন্য হুমকি হবে না।’
তিনি আরও বলেন, যদি হামাস রাজি হয়, তবে প্রথম ধাপে সামান্য সেনা প্রত্যাহার করা হবে এবং ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সব বন্দি মুক্তি পাবে। এরপর আন্তর্জাতিক সংস্থা হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের কাজ চালাবে। কিন্তু যদি তারা অস্বীকার করে বা প্রতারণা করে, ‘তবে ইসরায়েল নিজেই কাজ শেষ করবে।’
ট্রাম্প আবার ফিলিস্তিনিদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমি তাদের চ্যালেঞ্জ করছি—নিজেদের ভাগ্য নিজেরা নিয়ন্ত্রণে নাও। সন্ত্রাস ত্যাগ করো, ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে চলো। তারা কঠিন জীবন কাটিয়েছে, কিন্তু তারা ভালো কিছু প্রাপ্য।’
তবু প্রশ্ন রয়ে গেছে—এই পরিকল্পনা কি সত্যিই স্থায়ী শান্তি আনবে, নাকি আবারও যুদ্ধের পথ খুলে দেবে।
