Logo
Logo
×

আন্তর্জাতিক

আল জাজিরার বিশ্লেষণ

আফগানিস্তানের বাগরাম ঘাঁটি: কেন ট্রাম্প এত মরিয়া সেটি ফেরত পেতে?

Icon

রুচি কুমার

প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০১:৪১ পিএম

আফগানিস্তানের বাগরাম ঘাঁটি: কেন ট্রাম্প এত মরিয়া সেটি ফেরত পেতে?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আফগানিস্তানের শাসক তালেবানের কাছে দাবি জানিয়েছেন, তারা যেন বাগরাম বিমানঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রকে ফিরিয়ে দেয়। পাঁচ বছর আগে ট্রাম্পই তালেবানের সঙ্গে যে চুক্তি করেছিলেন, তার ভিত্তিতেই কাবুল থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার ঘটে।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর লন্ডনে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকার ‘বাগরাম ফেরত পাওয়ার চেষ্টা করছে’। তিনি বলেন, ‘আমরা ওটা কোনো মূল্য ছাড়াই দিয়ে দিয়েছিলাম। এখন সেই ঘাঁটিই ফেরত চাই।’

দুই দিন পর, ২০ সেপ্টেম্বর, নিজের ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে আরও কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি দেন ট্রাম্প। তিনি লেখেন, ‘যদি আফগানিস্তান বাগরাম বিমানঘাঁটি তাদের প্রকৃত নির্মাতা, অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রকে ফেরত না দেয়, তবে ভয়াবহ কিছু ঘটতে যাচ্ছে।’ তালেবান অবশ্য এ দাবি সরাসরি নাকচ করেছে।

এর আগে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক ব্রিফিংয়ে (যা পরে হোয়াইট হাউসের ওয়েবসাইট থেকে সরানো হয়) ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমরা বাগরাম রাখার পরিকল্পনা করেছিলাম, সেখানে অল্প সংখ্যক সেনা রাখার কথা ছিল।’

বাগরাম বিমানঘাঁটির ইতিহাসও জটিল। কাবুল থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরের এই ঘাঁটি প্রথম গড়ে তোলে সোভিয়েত ইউনিয়ন, পঞ্চাশের দশকে। ঠান্ডা যুদ্ধের সময় আফগানিস্তান হয়ে ওঠে এক রণক্ষেত্র। ১৯৭৯ সালের আক্রমণের পর সোভিয়েত সেনারা এক দশক ধরে ঘাঁটিটি নিয়ন্ত্রণ করে। পরে উত্তর জোট সেটির দখল নেয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তালেবানদের হাতে চলে যায়।

২০০১ সালে ন্যাটো বাহিনী আফগানিস্তানে প্রবেশ করলে বাগরাম হয়ে ওঠে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির কেন্দ্র। এখানে ছিল বিশেষ কমান্ড সেন্টার, হাসপাতাল, ব্যারাক, এমনকি ফাস্ট ফুড রেস্তোরাঁও। বন্দিশিবির হিসেবেও এর কুখ্যাতি ছিল। ২০০৯ সালে ঘাঁটিটি একসঙ্গে প্রায় দশ হাজার মানুষ ধারণ করতে সক্ষম ছিল। ২০২১ সালের আগস্টে সেনা প্রত্যাহারের সময় যুক্তরাষ্ট্র অনেক অস্ত্র ও সরঞ্জাম ধ্বংস করলেও বাকি অংশ লুট হয়ে যায়, পরে তালেবান নিয়ন্ত্রণ নেয়।

তাহলে কেন ট্রাম্প ঘাঁটিটি ফেরত চান? তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্র তাড়াহুড়া করে চলে আসায় বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও সামরিক সম্পদ ফেলে গেছে, যা তালেবানের হাতে গেছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলত কৌশলগত কারণেই ঘাঁটিটি গুরুত্বপূর্ণ। আফগানিস্তানের পাহাড়ি ভূখণ্ডে বড় সামরিক বিমান নামানোর মতো জায়গা বিরল, সেখানে বাগরামই সবচেয়ে বড় অবলম্বন। এছাড়া, এটি চীনের সীমান্ত থেকে মাত্র ৮০০ কিলোমিটার দূরে।

ট্রাম্পও সম্প্রতি বলেছেন, ঘাঁটিটি ‘চীনের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জায়গা থেকে মাত্র এক ঘণ্টার দূরত্বে’। চীন অবশ্য প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, ‘আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে তাদের জনগণ। উত্তেজনা বাড়ানো বা বিরোধ সৃষ্টি করা জনপ্রিয় হবে না।’

তবে যুক্তরাষ্ট্র আদৌ বাগরাম পুনর্দখল করতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বিশ্লেষক অ্যাশলি জ্যাকসনের মতে, তত্ত্বগতভাবে এটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও, আফগানিস্তানে মার্কিন সামরিক মিশন সমাপ্ত করার ঘোষণার সঙ্গে এ ধরনের পদক্ষেপ সাংঘর্ষিক হবে।

অন্যদিকে, তালেবানও ঘাঁটি ছাড়তে রাজি হবে না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এটি করলে তালেবানের রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়বে এবং সংগঠনের অভ্যন্তরে ভাঙন দেখা দেবে।

২১ সেপ্টেম্বর তালেবানের উপপ্রবক্তা হামদুল্লাহ ফিত্রাত স্মরণ করিয়ে দেন, দোহা চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে আফগানিস্তানের ভৌগোলিক অখণ্ডতা বা অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আর হস্তক্ষেপ করবে না।

বিশ্লেষকদের মতে, বাগরাম ইস্যুটি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য দরকষাকষির কৌশলও হতে পারে। হয়তো বড় দাবি জানিয়ে পরে ছোট কিছু নিয়ে সমঝোতা করা—যেমন কিছু অস্ত্র ফেরত পাওয়া—এই হতে পারে পরিকল্পনা। অন্যদিকে, তালেবানও যদি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসে, তবে তা তাদের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়াবে।

তবু শেষ পর্যন্ত বিষয়টি নির্ভর করবে, ট্রাম্প কী চান আর তালেবান কী দিতে পারে—সেটির ওপর।


Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন