জাতিসংঘে নেতানিয়াহুর বক্তৃতার সময় হল ছাড়লেন কূটনীতিকরা, গাজায় ‘কাজ শেষের’ হুমকি
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বক্তব্য রাখতে এসে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু আবারও জানালেন— গাজায় হামলা থামবে না। বরং তার ভাষায়, ‘কাজ শেষ করতে হবে’। একইসঙ্গে তিনি ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়াকে বললেন ‘পাগলামি’, ‘অসুস্থ চিন্তা’।
এই বক্তব্যে যখন নেতানিয়াহু মঞ্চে উঠলেন, তখন হল ছাড়লেন ৫০টিরও বেশি দেশের শতাধিক কূটনীতিক।
সম্প্রতি যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া—এই সব দেশ ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটেই জাতিসংঘের এই অধিবেশনে নেতানিয়াহু দাঁড়িয়ে বললেন— ‘দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান পাগলের প্রলাপ, আমরা এটা করব না’।
তার ভাষায়, ‘৭ অক্টোবর হামলার পর ফিলিস্তিনের হাতে জেরুজালেমের এক মাইল দূরে রাষ্ট্র তুলে দেওয়া মানে ৯/১১–এর পর নিউ ইয়র্কের এক মাইল দূরে আল-কায়েদার হাতে রাষ্ট্র তুলে দেওয়ার মতো’।
এই বক্তব্য চলাকালেই নিউ ইয়র্কের রাস্তায় বিক্ষোভে ফেটে পড়েন হাজারো মানুষ। টাইমস স্কয়ারে ছিল প্রধান সমাবেশ, যেখানে ফিলিস্তিনের পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষজন বলছিলেন— ‘গাজায় হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করো’।
বক্তব্যে নেতানিয়াহু বলেন, ‘গাজার শহরে হামাসের শেষ ঘাঁটি রয়েছে। আমরা এই যুদ্ধে জয়ী না হলে, ৭ অক্টোবরের মতো হামলা বারবার ঘটবে। তাই যত দ্রুত সম্ভব আমরা এই যুদ্ধ শেষ করতে চাই।’
এদিকে, ঠিক বক্তৃতার আগেই গাজায় নিহত হন আরও অন্তত ২২ জন, জানায় সেখানকার সিভিল ডিফেন্স। আল জাজিরার খবরে বলা হয়, সকালে শুরু হওয়া অভিযানে নিহত হন ৪৭ জন, যার মধ্যে আটজন ছিলেন গাজা মাঝামাঝি নুসাইরাত শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া সাধারণ মানুষ।
নেতানিয়াহু তার বক্তব্যে জোর দিয়ে বলেন, ইসরায়েল ‘গণহত্যা’ চালাচ্ছে— এই অভিযোগ ভিত্তিহীন। তিনি বলেন, ‘যদি সত্যিই কোনো দেশ গণহত্যা চালাত, তাহলে তারা কি আগেই সাধারণ মানুষদের নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে বলত?’
তবে এই বক্তব্যে আন্তর্জাতিক মহলের আগ্রহ ছিল খুবই কম। যুক্তরাষ্ট্র আর যুক্তরাজ্যের প্রতিনিধিরা থাকলেও, ছিল মূলত জুনিয়র পর্যায়ের কূটনীতিকরা।
নেতানিয়াহু দাবি করেন, ‘অনেক দেশ আমাদের প্রকাশ্যে সমালোচনা করলেও, পর্দার আড়ালে প্রশংসা করে। তারা ইসরায়েলের গোয়েন্দা তথ্য কাজে লাগিয়ে নিজেদের দেশে হামলা ঠেকাতে পেরেছে।’ তবে কোন দেশের কথা বলছেন, তা তিনি বলেননি।
বক্তব্যে তিনি হামাসের নেতাদের উদ্দেশে বলেন, ‘অস্ত্র ফেলে দাও। আমার জনগণকে মুক্তি দাও। সব জিম্মিদের ছেড়ে দাও। না হলে ইসরায়েল তোমাদের খুঁজে বের করবে।’
এই পুরো বক্তব্য প্রচার করা হয় গাজার লাউডস্পিকারে, এমনকি নেতানিয়াহুর অফিস দাবি করে— গাজার মানুষদের মোবাইলে এই বার্তা পাঠানো হয়েছে। যদিও গাজায় থাকা সাংবাদিকরা এর কোনো প্রমাণ পাননি।
এদিকে, নিউ জিল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইনস্টন পিটারস বলেছেন, এই মুহূর্তে তারা ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেবে না, তবে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানে তারা বিশ্বাসী। তাঁর মতে, এই সময়ে স্বীকৃতি দিলে যুদ্ধবিরতির আলোচনা আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
নেতানিয়াহুর এই বক্তব্য, তার কড়া ভাষা, এবং গাজায় ক্রমাগত বেড়ে চলা মৃত্যুর মিছিল— সব মিলিয়ে এই মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট আরও গভীর হয়ে উঠেছে। শান্তির পথ কোথায়, তার উত্তর এখনো মেলে না।

