উত্তাল লাদাখ, আন্দোলনের নেতা ‘থ্রি ইডিয়টসের র্যাঞ্চো’ গ্রেপ্তার
সোনম ওয়াংচুক। ছবি: সংগৃহীত
ভারতের উত্তর সীমান্তে অবস্থিত এতকালের শান্ত অঞ্চল লাদাখ এখন বিক্ষোভে উত্তাল। লাদাখকে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা এবং সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের অন্তর্ভুক্তির দাবিকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠে এই অঞ্চলটি।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক খবরে বলা হয়েছে, লাদাখের এ পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদার দাবির আন্দোলনের কর্মী শিক্ষাবিদ ও ম্যাগসেসে পুরস্কারপ্রাপ্ত সোনম ওয়াংচুককে গ্রেপ্তার করেছে দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
আজ শুক্রবার (২৬ সেপ্টেম্বর) বিকেলে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে আন্দোলনে উসকানির অভিযোগ আনা হয়েছে। গ্রেপ্তারের পর তাকে একটি অজ্ঞাত স্থানে নেওয়া হয়েছে।
সোনমের আরেক পরিচয় হলো ‘থ্রি ইডিয়টস’ সিনেমায় আমির খান অভিনীত ‘র্যাঞ্চো’ চরিত্রটি তৈরি হয়েছিল তার আদলে। ওই সিনেমার পর লাদাখে তার তৈরি স্কুলটিও পর্যটকদের কাছে দর্শনীয় হয়ে ওঠে। সমাজ ও শিক্ষা নিয়ে মশগুল থাকা ৫৯ বছরের এ মানুষটি ২০১৯ সাল থেকে লাদাখের ভঙ্গুর পরিবেশ রক্ষায় উদ্যোগী হয়ে ওঠেন।
এনডিটিভির খবরে বলা হয়েছে, সোনমের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে মব উসকে দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছিল। এই অভিযোগ করা হলে তিনি গতকাল বৃহস্পতিবার বলেছিলেন, এই অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হলে তিনি খুশি হবেন। তার একদিন পরই আজ তাকে গ্রেপ্তার করা হলো।
ভারত সরকারের একটি সূত্র বলছে, তার বিরুদ্ধে জাতীয় নিরাপত্তা আইনে (এনএসএ) অভিযোগ আনা হয়েছে। এই আইনে কোনো ধরনের জামিন ছাড়াই দীর্ঘদিন আটকে রাখা যায়। সূত্রটি জানিয়েছে, আজ রাত বা আগামীকাল সকালে তাকে লাদাখ থেকে অন্য কোথাও নেওয়া হতে পারে।
এদিকে, তাকে গ্রেপ্তারের পর সরকার ভুয়া তথ্য ছড়ানো ঠেকাতে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দিয়েছে। এর একদিন আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সোনমের অলাভজনক প্রতিষ্ঠান স্টুডেন্ট এডুকেশন অ্যান্ড কালচারাল মুভমেন্ট অব লাদাখের (এসইসিএমওএল) নিবন্ধন বাতিল করে। ফরেন কন্ট্রিবিউশন (রেগুলেশন) অ্যাক্ট বা এফসিআরএ, ২০১০ এর আওতায় প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধন বাতিল করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বিদেশি তহবিল গ্রহণের অভিযোগ আনা হয়েছে। যদিও সোনম এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
এর আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাকেসহ অন্যান্য আন্দোলন কর্মীদের তাদের দাবি-দাওয়া নিয়ে ডেকেছিল। যদিও আলোচনার পর সোনম জানিয়েছিলেন, তাদের দাবি না মেনে উল্টো নতুন শর্ত দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এরপর লাদাখের রাজ্য মর্যাদা এবং সংবিধানের ষষ্ট তফসিলে অন্তর্ভুক্তির দাবিতে অনশনে যান সোনমা। এর এক পর্যায়ে বিক্ষোভ তীব্র হতে থাকে।
গত বুধবার সেই বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নেয়। ওইনদিন বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে অন্তত চারজন নিহত এবং ৮০ আহত হয়। আতদের মধ্যে ৪০ জন পুলিশ সদস্য। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর। বিক্ষোভকারীরা লাদাখের লেহ জেলার লেহ শহরে অবস্থিত বিজেপির একটি কার্যালয় ও সরকারি কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করে। যদিও সোনম বলেছেন, সহিংস বিক্ষোভে তার সায় নেই। তিনি গান্ধীবাদী। শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালানোর পক্ষে। সহিংস হয়ে উঠায় তিনি আন্দোলন প্রত্যাহার করেন।
উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে ভারতের সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের পর থেকে জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের মর্যাদা হারিয়ে ভারতের একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত হয়। সেসময় জম্মু ও কাশ্মীর থেকে লাদাখকে আলাদা করা হয় এবং একেও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করা হয়। এর আগে, ৩৭০ অনুচ্ছেদ জম্মু ও কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছিল, যা ভারতের অন্যান্য রাজ্য থেকে এটিকে আলাদা করেছিল। ২০১৯ সালের পর, জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ দুটি পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিভক্ত হয়। মূলত তখন থেকেই রাজ্যের মর্যাদা ফেরানোর দাবিতে বিক্ষোভ চলছে লাদাখে।
যেখানে সহিংসতা হয়েছে, সেই লেহ অঞ্চল মূলত বৌদ্ধপ্রধান। এখানকার জনগণ বহু বছর ধরেই স্বতন্ত্র অঞ্চলের দাবি জানিয়ে আসছে। অন্যদিকে মুসলিম অধ্যুষিত কারগিল জেলার জনগণ ভারত-শাসিত কাশ্মীরের সঙ্গে পুনরায় যুক্ত হতে চায়। ২০১৯ সালের পর থেকে দুটি সম্প্রদায়ই একসঙ্গে রাজ্যের মর্যাদা ফেরানোর পাশাপাশি চাকরির কোটা সংরক্ষণসহ স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানিয়ে আসছে।
লাদাখকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করার পর সেখানকার মানুষ যে প্রতিশ্রুত সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত, সেই দাবিতে সোনম দীর্ঘদিন ধরে সরব।
তার প্রধান দাবিগুলি হলো- লাদাখকে ভারতীয় সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের অন্তর্ভুক্ত করে আদিবাসী মর্যাদা এবং ভূমি ও কর্মসংস্থান সুরক্ষা নিশ্চিত করা। লাদাখের জন্য রাজ্যত্বের মর্যাদা প্রদান করা।

