Logo
Logo
×

আন্তর্জাতিক

আল জাজিরার মতামত প্রতিবেদন

রাজনৈতিক সহিংসতা আমেরিকার ক্ষত, যার সমাধান সাদা আমেরিকার হাতে

Icon

জেরেল এজেল

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:০৭ পিএম

রাজনৈতিক সহিংসতা আমেরিকার ক্ষত, যার সমাধান সাদা আমেরিকার হাতে

আমেরিকার রাজনীতি এখন এমন এক সংকটকাল পার করছে, যেখানে সহিংসতা যেন তার অঙ্গ হয়ে উঠেছে। আর সেই সহিংসতার সর্বশেষ রূপটি দেখা গেল ইউটাহ-তে, যেখানে এক বক্তৃতা অনুষ্ঠানে গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান রক্ষণশীল রাজনীতিক চার্লি কার্ক। এই মৃত্যু শুধু একজন ব্যক্তির নয়, এটি মার্কিন রাজনীতির ভেতরে গভীর হয়ে বসে থাকা বিভক্তি ও উত্তেজনার প্রতিচ্ছবি।

চার্লি কার্ক ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ডানপন্থী রাজনীতির এক উজ্জ্বল ও বিতর্কিত মুখ। তাঁর বক্তব্য, চিন্তাভাবনা, এবং বিশেষ করে বর্ণবাদ ও অভিবাসনবিরোধী অবস্থানের কারণে তিনি দীর্ঘদিন ধরেই তীব্র সমালোচিত হচ্ছিলেন। তবে তাঁর মৃত্যু–একজন ২২ বছর বয়সী শ্বেতাঙ্গ যুবকের হাতে—এটাই প্রমাণ করে, সহিংসতা কেবল মতাদর্শগত বিরোধ থেকে নয়, বরং এক ধরনের অন্তর্নিহিত সামাজিক রেষারেষি থেকেও জন্ম নেয়। এবং তা যেন আগুনে ঘি ঢেলে দেয় আমেরিকার পুরোনো ক্ষত, বর্ণবিদ্বেষ।

যদিও এই হামলা চালিয়েছে একজন সাদা রিপাবলিকান পরিবারের ছেলে, কিন্তু শুরুতেই এর জবাবে সামাজিক মাধ্যমে যেসব প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, সেগুলোর একটি বড় অংশ আবার কৃষ্ণাঙ্গ ছাত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে সন্দেহের চোখে তাকিয়েছে। এই প্রতিক্রিয়াগুলো কেবল ভুল পথেই নেয়নি সমাজকে, বরং তা আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের বর্ণবিদ্বেষের শিকড় কতটা গভীর এবং রাজনৈতিক সহিংসতা কীভাবে সেই বিভেদের আগুনকে আরও উসকে দেয়।

আজকের আমেরিকায় যেকোনো বড় রাজনৈতিক আলোড়নের মাঝখানে পড়ে যান সংখ্যালঘু নাগরিকরা। সাদা ডানপন্থী ও বামপন্থীদের পারস্পরিক দোষারোপে, তর্কে-বিতর্কে, নীতিনির্ধারণে, অবধারিতভাবে তারা হয়ে উঠছেন একেকটি ‘পাত্র’—যখন কখনো বাঁচানোর, কখনো বা হেয় করার। বাস্তবে তারা নিজেরাই নিজের পক্ষে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছেন না।

চার্লি কার্কের মতো একজন বক্তার জীবন ও কর্ম নিয়ে হয়তো অনেকের দ্বিমত থাকবে। আমিও বৈষম্য ও অন্তর্ভুক্তির প্রবক্তা হিসেবে তাঁর অনেক মতাদর্শের ঘোর বিরোধী। তবে কার্কের বক্তৃতা ও লেখায় যে একধরনের নির্লজ্জ স্পষ্টভাষিতা ছিল, তা তাকে রাজনৈতিক বিতর্কে এক ব্যতিক্রমী অবস্থানে এনে দাঁড় করিয়েছিল। তিনি সেই সব বিষয় নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতেন, যেগুলো নিয়ে সাধারণত রাজনৈতিক নেতারা কৌশলে চুপ থাকেন।

একবার এক পডকাস্টে কার্ক বলেছিলেন, “আমি যদি কোনো কৃষ্ণাঙ্গ পাইলট দেখি, মনে মনে ভাবি—আশা করি, সে যোগ্য।” এই ধরনের বক্তব্য, যদিও বর্ণবাদী এবং অনভিপ্রেত, কিন্তু এটি একা নয়। বিগত বছরগুলোতে তিনি গাজা যুদ্ধ, অভিবাসন এবং আমেরিকার ইতিহাসসংক্রান্ত অনেক বিতর্কিত বিষয়ে এমন অনেক মন্তব্য করেছেন, যেগুলো দেশের একাংশকে আহত করেছে, আরেকাংশকে উজ্জীবিত।

আমি তাঁর সেই বিতর্কিত ইউটিউব সিরিজ ‘প্রুভ মি রং’ দেখেছি—ইচ্ছায় হোক বা অ্যালগরিদমের খপ্পরে পড়ে। সেখানেও দেখা যেত, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে গিয়ে তরুণ ছাত্রদের যুক্তির ফাঁদে ফেলতেন, যাদের অনেকেই বিতর্কে অদক্ষ। তিনি এমনভাবে প্রশ্ন করতেন, যাতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসত ‘জাতি’ এবং তার চারপাশের বিভাজন। ছাত্রদের ফাঁদে ফেলে জেতার যে আনন্দ তিনি উপভোগ করতেন, তা ছিল যেন একধরনের মঞ্চস্থ রাজনীতি—যেখানে সংখ্যালঘুরা প্রায়ই হয় অবজ্ঞার পাত্র, নয়তো করুণা পাওয়ার যোগ্য কেউ।

এই রাজনীতি শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, গোটা বিশ্বেই এক ভয়ের বাতাবরণ তৈরি করছে। তবে আমেরিকায় এর দায়ভার যাদের কাঁধে সবচেয়ে বেশি, তারা হলেন সাদা আমেরিকানরাই। কেননা রাষ্ট্রক্ষমতা, ভোটের প্রভাব, মিডিয়ার ভাষ্য—সবই এখনো বড়ো অংশে তাদের হাতে। চার্লি কার্কের উত্থান, তার চারপাশে গড়ে ওঠা বিতর্ক, আর তার মর্মান্তিক পরিণতি—সব মিলিয়ে এক কঠিন বাস্তবতা সামনে এনে দেয়। এই সহিংসতা থামাতে হলে, জাতিগত বিভাজন প্রশমিত করতে হলে, সত্যিকার অর্থে রাজনৈতিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে—তাতে নেতৃত্ব নিতে হবে সাদা আমেরিকাকেই।

এই কথাগুলো বলা সহজ, কিন্তু মানা কঠিন। তবু এটাই সত্য।

চার্লি কার্কের মৃত্যুর পর, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া প্রতিক্রিয়াগুলোর দিকে আমি চোখ রেখেছিলাম—একজন সমাজতাত্ত্বিক হিসেবে, আবার একজন সাধারণ মানুষ হিসেবেও। অনেকেই তাকে নিয়ে শোক জানালেন, তাকে তুলে ধরলেন একজন সত্যভাষী হিসেবে, যিনি নাকি আমেরিকার ঐতিহ্যবাহী মূল্যবোধের কণ্ঠস্বর ছিলেন। অন্যদিকে, অনেকেই ক্ষোভে ফেটে পড়লেন। তারা বললেন, চার্লির এটাই প্রাপ্য ছিল। তাকে ‘বর্ণবাদী’ বলে চিহ্নিত করে যারা দীর্ঘদিন সমালোচনা করে এসেছেন, তাদের মুখে যেন একধরনের বিজয়ের হাসি। এসব প্রতিক্রিয়ার ভেতর দিয়ে একটা কথাই স্পষ্ট—আমেরিকায় এখন রাজনীতি মানেই যেন যুদ্ধ, আর প্রতিপক্ষের মৃত্যুতে যেন এক পক্ষের স্বস্তি।

কার্ক জানতেন, তিনি যা বলছেন তার মূল্য দিতে হতে পারে। তিনি জানতেন, তার ভাষা কতটা তীক্ষ্ণ, আর সেই ভাষায় কত মানুষের জীবন তীব্রভাবে প্রভাবিত হতে পারে। তবু তিনি থামেননি। বরং তিনি এমন সব বিষয়কে খোলামেলা তুলে ধরেছেন—যেমন অস্ত্র অধিকার—যা যুক্তরাষ্ট্রের নির্দিষ্ট শ্রেণির কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, আবার অনেকের কাছে চরম উদ্বেগের।

২০২৩ সালের এক জরিপ বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে সাদা পরিবারের প্রায় অর্ধেকের কাছেই আগ্নেয়াস্ত্র আছে। কিন্তু যারা বন্দুক হাতে প্রাণ হারান, তাদের বড় অংশই কৃষ্ণাঙ্গ বা ল্যাটিনো। যাদের হাতে অস্ত্র কম, তাদের ক্ষতির আশঙ্কা বেশি। অথচ তারা আইন পরিবর্তনের জন্য যথেষ্ট রাজনৈতিক ক্ষমতা রাখেন না। আমেরিকায় গড়পড়তা মানুষ যখন অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের পক্ষে, তখনও তা বাস্তবায়ন হয় না। এই বৈষম্যের চেহারাটা আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে যখন বোঝা যায়—এটা মূলত সাদা ডানপন্থী ও বামপন্থীদের একধরনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, যার কষ্ট সহ্য করতে হয় সংখ্যালঘুদের।

গত দুই দশকে সংখ্যালঘুদের রাজনৈতিক উত্থান হলেও, মূল ক্ষমতার চাবিকাঠি এখনো সাদা আমেরিকানদের হাতে। ট্রাম্প প্রশাসনে ৯০ শতাংশের বেশি নিয়োগপ্রাপ্ত ছিলেন সাদা। সুপ্রিম কোর্টে ছয়জন বিচারপতি সাদা। ৫০ জন গভর্নরের মধ্যে ৪৭ জনই সাদা। আর কংগ্রেসে সংখ্যালঘু সদস্যের সংখ্যা মাত্র ২৮ শতাংশ। এই কাঠামো এখনো বড় এক বাধা হয়ে আছে ন্যায়বিচারের পথে।

এই ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা থেকেই তৈরি হয়েছে এক ধরনের বিপজ্জনক সহাবস্থান—সাদা ডানপন্থী ও সাদা বামপন্থীর মধ্যে। ডানপন্থীরা দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের ভেতরের জাতিগত ক্ষোভকে উসকে দিচ্ছে। আর বামপন্থীরা সেসব ক্ষোভকে রাজনৈতিক বারুদ হিসেবে ব্যবহার করে যাচ্ছেন। কিন্তু প্রকৃত অর্থে, তারা কেউই সমস্যার গভীরে পৌঁছাতে পারেননি। চার্লি কার্কের মতাদর্শকে থামানোর চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু তার উত্থানকে বোঝার চেষ্টা হয়নি। এই ব্যর্থতার খেসারত দিচ্ছেন সংখ্যালঘুরা।

কার্ককে নিয়ে যারা হতাশ ছিলেন, তারাও জানেন, একটি হত্যাকাণ্ড কখনো কোনো সমাধান হতে পারে না। এটি বরং প্রতিকূলতাকে আরও তীব্র করে তোলে। আফ্রো-আমেরিকানরা এই বেদনা ভালো করেই চেনেন। জন এফ কেনেডি, মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র, ম্যালকম এক্স—তাঁদের মৃত্যুও এসেছিল গুলিতে। কিন্তু সেসময় রাজনীতির মঞ্চে এমন নেতাও ছিলেন যারা চেয়েছিলেন উত্তেজনা কমাতে, ক্ষত সারাতে।

চার্লি কার্ক বহু রূপে উপস্থিত ছিলেন—কখনো বক্তা, কখনো চ্যালেঞ্জার, কখনো বিতর্কিত চরিত্র। কিন্তু তিনি এমন এক আমেরিকার ছবি এঁকেছিলেন, যা সাদা, ধারাবাহিক এবং কিছুটা ভয়ংকরও। এই ছবি দেখে অনেকেই অভিভূত হয়েছেন, আবার অনেকেই প্রতিরোধ করেছেন। কেউ কেউ তার বাকস্বাধীনতাকে শ্রদ্ধা করেছেন, কিন্তু তার চিন্তাভাবনায় ভীত থেকেছেন। আর এই জায়গাতেই প্রশ্নটা জেগে ওঠে—যদি আমরা রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ে সত্যি কথা বলতে চাই, তবে সংখ্যালঘুদের সেই অব্যক্ত বাস্তবতাকেও সামনে আনতে হবে, যাঁরা বারবার হয়ে উঠছেন এই নাটকের নিঃশব্দ চরিত্র।



জেরেল এজেল একজন সমাজবিজ্ঞানী এবং বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো মেডিকেল সেন্টারে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে কর্মরত। তিনি রাজনীতির জাতিগত ও সাংস্কৃতিক দিকগুলো নিয়ে গবেষণা করেন।


Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন