গাজায় জাতিসংঘ বাহিনীর আহ্বান জানাল ফ্রান্স
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বিশ্ববাসীর সামনে সোমবার রাতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বিশেষ অধিবেশনে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেছেন— ফ্রান্স এখন থেকে ফিলিস্তিনকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘‘গাজায় যুদ্ধ, গণহত্যা আর মৃত্যু থামানোর সময় এসেছে। ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায়ের দাবি মেনে নেওয়ার সময় এসেছে। এখন স্বীকৃতি দেওয়ার সময়— গাজা, পশ্চিম তীর ও জেরুজালেমসহ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে।’’
তার এই ঘোষণা হলে জাতিসংঘের হল ঘরে কিছু দেশ থেকে করতালি ও দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা জানানো হয়।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ একে বলেছে ‘‘ইতিহাসের এক সাহসী সিদ্ধান্ত’’।
তবে সেখানে উপস্থিত ছিল না যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কোনো প্রতিনিধি। ইসরায়েল এই উদ্যোগকে গুরুত্ব দেয়নি।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ সাধারণ পরিষদে বলেন, ‘‘এই সম্মেলন এক মাইলফলক। তবে এটা শেষ নয়, বরং শুরু মাত্র। ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে পূর্ণ সদস্যপদ দেওয়া উচিত।’’
এদিকে, আরব ও মুসলিম নেতারা নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন, যাতে গাজার ভবিষ্যতের জন্য একটি আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনী গঠনের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়।
ফ্রান্সের সঙ্গে যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়াও ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
জাতিসংঘে ফ্রান্স ও সৌদি আরব একসঙ্গে একটি শীর্ষ বৈঠক আয়োজন করে— যেখানে দুই-রাষ্ট্র ভিত্তিক শান্তির পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এই পথকে ‘‘অচল’’ বলে আগেই ঘোষণা করেছেন।
সোমবার রাতে মোনাকো, বেলজিয়াম, আন্দোরা, মাল্টা এবং লাক্সেমবার্গ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়। এতে এখন পর্যন্ত বিশ্বের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস তার বক্তৃতায় বলেন, ‘‘রাষ্ট্র হয়ে ওঠা কোনো পুরস্কার নয়— এটা ফিলিস্তিনিদের অধিকার।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘৭ অক্টোবর হামাসের ভয়াবহ হামলার কোনোই ন্যায্যতা নেই। তবে এর জবাবে ফিলিস্তিনি জনগণকে যেভাবে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে, তারও কোনো যুক্তি নেই।’’
ইসরায়েলের জাতিসংঘ দূত দানি ড্যানন পুরো অধিবেশনকে বলেছেন ‘‘একটি লজ্জাজনক রাজনৈতিক সার্কাস’’।
যুক্তরাষ্ট্র আগেই সতর্ক করে বলেছে, এই স্বীকৃতির জবাবে ইসরায়েল কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে।
ইসরায়েল হুঁশিয়ার করেছে— তারা চাইলে পশ্চিম তীর দখল করে নিতে পারে। কারণ, হামাস এই স্বীকৃতিকে তাদের বিজয় হিসেবে দেখাচ্ছে।
গুতেরেস তার বক্তব্যে আরও বলেন, ‘‘পশ্চিম তীরে বসতি গড়ার এই ধারা, দখলের হুমকি, সহিংসতার বাড়াবাড়ি— এসব বন্ধ করতেই হবে। তা না হলে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পথ হারিয়ে যাবে।’’
ফ্রান্স জানিয়েছে, তারা যে আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনীর প্রস্তাব দিচ্ছে, তা হামাসকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেবে।
জাতিসংঘের অনুমোদিত এই বাহিনী গাজায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, হামাসকে নিরস্ত্র করবে এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের জন্য পুলিশ ট্রেনিং দেবে।
এদিকে গাজা সিটিতে সোমবার ইসরায়েলের অভিযানে অন্তত ৩৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। শুধু গাজা শহরেই প্রাণ গেছে ৩০ জনের।
ইসরায়েল দাবি করছে, শহরের ভেতরে ৩ হাজার হামাস যোদ্ধা লুকিয়ে আছে। আন্তর্জাতিক উদ্বেগ উপেক্ষা করেই তারা অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।
আরব লিগ ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে— হামাস আর কোনোভাবেই সরকারে থাকবে না। গাজা, পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুজালেম শাসন করবে নতুনভাবে নির্বাচিত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ। হামাসকে অস্ত্র জমা দিতে হবে।
ট্রাম্প এবার দ্বিতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে জাতিসংঘে ভাষণ দিতে এসেছেন। ভাষণের পর আরব নেতাদের সঙ্গে এই প্রথম সরাসরি গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হবে।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ট্রাম্প এবার ‘‘বিশ্বব্যবস্থার পতন’’ নিয়ে কড়া বক্তব্য দেবেন, এবং বলবেন এই পতনের পেছনে ‘‘বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো দায়ী’’।
তিনি তুরস্ক, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও মিসরের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। তবে তার অবস্থান এখনও স্পষ্ট নয়— তিনি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে হামাসের বিকল্প মনে করেন কি না।
তিনি কিছু কর্মকর্তা ও ৮৯ বছর বয়সী মাহমুদ আব্বাসের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন, এমনকি আব্বাসকে নিউইয়র্কে আসতেও দিয়েছেন না।
আবাস ভার্চুয়াল বক্তৃতায় বলেন, ‘‘১৪৯টি দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে, আমরা তাদের ধন্যবাদ জানাই। আর হামাসের ৭ অক্টোবরের হামলা ও বেসামরিক লোকদের হত্যা-অপহরণ— আমরা তারও নিন্দা জানাই।’’
আরব নেতারা ট্রাম্পের কাছ থেকে একটি স্পষ্ট উত্তর চান— তিনি আরব লিগের পরিকল্পনায় সহমত কিনা।
এই পরিকল্পনার নেতৃত্ব দিচ্ছেন টনি ব্লেয়ার ও জারেড কুশনার।
প্রস্তাবে ফিলিস্তিনিদের গণহারে বহিষ্কারের কথা বলা হয়নি, যদিও ট্রাম্প মাঝে মাঝে এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন।
আরব দেশগুলো বলেছে— তারা কোনো আন্তর্জাতিক বাহিনীতে অংশ নেবে না, যদি না নতুনভাবে গঠিত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে ভবিষ্যতের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
তারা একটি স্পষ্ট রোডম্যাপ চায়— যেখানে বসতি সম্প্রসারণ ও দখল বন্ধ থাকবে, এবং দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান বাস্তবায়নযোগ্য হবে।
যুক্তরাজ্য রবিবার জানিয়েছে, তারা ১৯৪৯ সালের যুদ্ধবিরতির রেখা বা ‘গ্রিন লাইন’-এর ভিত্তিতে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
পশ্চিম তীরে সীমিত শাসন চালানো ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (PA) বলেছে, তারা আন্তর্জাতিক সহায়তা পেলে গাজা ও পশ্চিম তীর পরিচালনায় প্রস্তুত।
নেতানিয়াহু বলেছেন, ইসরায়েলকে অবশ্যই নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে, যদিও এক আরব নেতৃত্বাধীন প্রশাসন রাখা যেতে পারে।
তবে তার জোটের অনেকেই গাজা দখল করতে চায়।
ইসরায়েল ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের অর্থনৈতিক জোগান বন্ধ করে প্রায় দেউলিয়া করে ফেলেছে।
আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী লানা নুসেইবেহ বলেছেন, গাজা দখল করলে তা আব্রাহাম চুক্তির মূল লক্ষ্যকে ধ্বংস করে দেবে।
এই চুক্তি ২০২০ সালে ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় হয়েছিল— ইসরায়েল ও আরব দেশগুলোর সম্পর্ক স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে।
তবে এখন আব্রাহাম চুক্তির ভবিষ্যতও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়েভেট কুপার ইসরায়েলকে সতর্ক করে বলেছেন, ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতির জবাবে যদি তারা পশ্চিম তীর দখল করে, তাহলে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ভবিষ্যতই থাকবে না।
তিনি বলেন, ‘‘যে রকমভাবে সহিংসতা, দুর্ভিক্ষ, জিম্মি নেওয়া, বসতি গড়ে তোলা আর প্রতিহিংসা চলছে— তাতে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানটা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। উভয় চরমপন্থী পক্ষই সেটাই চায়।’’
তিনি বলেন, হামাসের এখন আর ফিলিস্তিনের প্রশাসনে কোনো জায়গা নেই।
ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ-নোয়েল বারো বলেন, এই স্বীকৃতি হামাসের প্রতি অবিশ্বাস প্রকাশ করে। কারণ এই পরিকল্পনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে— গাজার ভবিষ্যতে হামাস থাকবে না।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ইতোমধ্যেই এক ঘোষণায় সাত পৃষ্ঠার একটি প্রস্তাব পাস করেছে— যেখানে বলা হয়েছে, ‘‘দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানে সময়বদ্ধ, স্পষ্ট ও অপরিবর্তনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।’’
জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ওয়াডেফুল বলেন, ‘‘অবৈধ দখলদারি বা ভূমি সংযুক্তিকরণ শান্তিপূর্ণ সমাধানকে আরও জটিল করে তোলে। যতই অসম্ভব মনে হোক, আলোচনার মাধ্যমে দুই রাষ্ট্রই শান্তি ও মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারে। সেই পথই আমাদের অনুসরণ করতে হবে।’’

