ট্রাম্প-শি ফোনালাপে শীতলতা কমেছে, কিন্তু টিকটক নিয়ে চূড়ান্ত কিছু হয়নি
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সপ্তাহের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন চীনের সঙ্গে একটি সম্ভাব্য টিকটক চুক্তি নিয়ে কথা বলে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চুক্তি এখনো চূড়ান্ত হওয়ার অনেক বাকি। যদিও ট্রাম্পের সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ফোনালাপ হয়েছে, উভয় পক্ষ থেকে সেই আলাপের ব্যাখ্যায় দেখা গেছে ভিন্ন ভিন্ন সুর।
গত শুক্রবার দুজনের মধ্যে ফোনে কথা হয়। তিন মাস পর এই প্রথম একে অপরের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ হলো। কিন্তু এতকিছুর পরেও জনপ্রিয় এই ভিডিও অ্যাপটির মালিকানা বদলের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। অথচ যুক্তরাষ্ট্রে টিকটকের ব্যবহারকারী সংখ্যা ১৭ কোটি।
ফোনালাপের পর ট্রাম্প ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ লিখেছেন, ‘এটি খুব ভালো একটি ফোনকল ছিল... টিকটক অনুমোদনের জন্য কৃতজ্ঞ।’ কিন্তু চীনা বার্তা সংস্থা শিনহুয়ার দেওয়া বিবরণে সেই একই বিষয় অনেক বেশি সতর্কভাবে বলা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, ‘টিকটক নিয়ে প্রেসিডেন্ট শি বলেছেন, চীনের অবস্থান পরিষ্কার—চীনা সরকার কোম্পানিগুলোর ইচ্ছাকে সম্মান করে এবং ব্যবসায়িক আলোচনার মাধ্যমে, বাজারভিত্তিক নিয়ম মেনে, এবং চীনের আইন অনুযায়ী সমাধানে পৌঁছাতে আগ্রহী।’
বিশেষজ্ঞরা এতে খুব একটা অবাক হননি।
র্যাচেল জিম্বা, নিউ আমেরিকান সিকিউরিটি সেন্টারের একজন গবেষক বলেন, ট্রাম্প এমন নেতা যিনি প্রায়ই চুক্তির কাঠামো বা সম্ভাব্য বোঝাপড়াকে ‘চুক্তি’ হিসেবে ঘোষণা দেন, যদিও এর অনেক কিছুই তখনো ঠিকঠাক হয়নি। টিকটক ইস্যুতেও হয়তো এমনটাই ঘটছে।
তিনি আরও বলেন, বড় পরিসরে কোনো বাণিজ্যচুক্তি হলে সেটা সম্ভবত এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কো-অপারেশন (এপেক) ফোরামের পাশে ট্রাম্প ও শি যখন দক্ষিণ কোরিয়ায় সাক্ষাৎ করবেন—তখনই হতে পারে, যদি সেই সাক্ষাৎ আদৌ ঘটে।
শুক্রবারের ফোনালাপ থেকে যদিও কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি, তারপরও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুই নেতার মধ্যে আবার যোগাযোগ শুরু হওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর আগে, জেনেভা, লন্ডন, এমনকি মাদ্রিদে একাধিক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে দেখা হলেও শি জিনপিং সরাসরি ফোনে ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি।
মিডলবেরি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ওয়েই লিয়াং বলেন, এতদিন পর হলেও বরফ গলেছে, এটা ইতিবাচক। তারা এখন হয়তো আরও কঠিন ইস্যুগুলোর দিকেও এগিয়ে যাবেন।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ের সম্পর্ককে কেউ কেউ এমনকি স্নায়ুযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ের চেয়েও খারাপ বলেছেন। তখন অন্তত যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে হটলাইন ছিল।
ট্রাম্প এই ফোনালাপের কয়েক দিন আগেই চতুর্থবারের মতো সময়সীমা বাড়িয়েছেন। সেই সময়সীমা অনুযায়ী, চীনের কোম্পানি বাইটড্যান্সকে টিকটকের মালিকানা ছেড়ে দিতে হবে, নাহলে যুক্তরাষ্ট্রে এটি নিষিদ্ধ হবে। এই আইনটি কংগ্রেসে বিপুল ভোটে পাস হয়েছিল এবং পরে সুপ্রিম কোর্টও তা বহাল রেখেছে।
জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রবার্ট রোগোস্কি মনে করেন, পুরো বিষয়টা জটিল। চীন এখনো অ্যাপটির মালিকানা ছাড়তে চায় না। আর ভবিষ্যতে মালিকানা কার হাতে যাবে, কী নিয়মে যাবে—তাও পরিষ্কার নয়।
রোগোস্কি বলেন, টিকটকের সবচেয়ে মূল্যবান দিক হলো এর অ্যালগরিদম। এই অ্যালগরিদম আমাদের কী দেখতে চাই, সেটা নির্বাচন করে দেয়, এবং সেটি অত্যন্ত নিয়ন্ত্রণমূলকভাবে কাজ করে।
তার মতে, আসল সমস্যা নিরাপত্তা নয়, বরং এই অ্যালগরিদমের মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের ওপর প্রভাব বিস্তার করার ক্ষমতা। কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর অধীনে এই অ্যালগরিদম গেলে সেটা বিপজ্জনক হতে পারে।
অধ্যাপক লিয়াং মনে করেন, চীন সম্ভবত অ্যালগরিদম পুরোপুরি ছেড়ে দেবে না। বরং এমন একটি ‘গ্রেসফুল এক্সিট’-এর সম্ভাবনা আছে, যেখানে দুই দেশই কিছুটা মুখ রক্ষা করে বেরিয়ে আসতে পারবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আরও বড় কোনো বাণিজ্যচুক্তি—যেমন বিরল খনিজের ব্যবহার, রাশিয়ার কাছ থেকে চীনের তেল কেনা, বা যুক্তরাষ্ট্রের সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি—এইসব বিষয়ে এখনই চুক্তির আশা করা ঠিক হবে না। সেটি হয়তো তখনই সম্ভব হবে যখন দুই নেতা আবার মুখোমুখি হবেন।
র্যাচেল জিম্বা বলেন, এখন ট্রাম্পের হাতে অতিরিক্ত ট্যারিফ চাপানোর সুযোগ নেই। কারণ চীনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নিয়ন্ত্রণ আছে, যেমন বিরল খনিজ। যুক্তরাষ্ট্রও চীনকে পুরোপুরি পাশ কাটিয়ে যেতে পারছে না।
রোগোস্কিও একমত। তিনি বলেন, চীন এখন আরও আত্মবিশ্বাসী, অনেকটা সাহসী ভূমিকা নিচ্ছে। এর পেছনে বাস্তব কারণও রয়েছে। যেমন চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে মার্কিন চিপ কোম্পানি এনভিডিয়ার চিপ না কিনতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হয়তো চীনের এখন এমন প্রযুক্তি আছে যা এনভিডিয়ার চেয়ে ভালো অথবা সস্তা।
আর যুক্তরাষ্ট্র এখনো অনেকটা চীনের খনিজের ওপর নির্ভরশীল। তাই বেইজিং নিজেদের অবস্থান নিয়ে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী বোধ করছে।

