Logo
Logo
×

আন্তর্জাতিক

ইউরোপে এই গ্রীষ্মে তিনজনের মধ্যে দুইজনের মৃত্যু গরমজনিত কারণে

ডেস্ক রিপোর্ট

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১১:৫৮ এএম

ইউরোপে এই গ্রীষ্মে তিনজনের মধ্যে দুইজনের মৃত্যু গরমজনিত কারণে

এই বছর গ্রীষ্মে ইউরোপ জুড়ে যে প্রচণ্ড গরম পড়েছে, তার অনেকখানি দায় মানুষেরই। বিজ্ঞানীরা বলছেন, সেই উত্তাপে যারা মারা গেছেন, তাদের মধ্যে প্রতি তিনজনের মধ্যে দুইজনের মৃত্যু ঘটেছে মানুষসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে।

৮৫৪টি বড় শহরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়ে ইউরোপে গরমজনিত কারণে ২৪ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ জনের মৃত্যু হয়েছে অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে, যা গ্রিনহাউস গ্যাসের জন্যই হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এই বিশ্লেষণটি এখনও বৈজ্ঞানিক সমালোচনার (পিয়ার রিভিউ) জন্য জমা দেওয়া হয়নি, তবে এটি প্রতিষ্ঠিত গবেষণা পদ্ধতির ভিত্তিতে করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইউরোপের শহরগুলো গড়ে ২.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি গরম ছিল এই গ্রীষ্মে। আর এই অতিরিক্ত উত্তাপ মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।

ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের জলবায়ু বিজ্ঞানী ফ্রিডেরিকে অটো স্পষ্ট করে বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো থেকে শুরু করে মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত এই দায়ের শৃঙ্খল অস্বীকার করার উপায় নেই। তিনি বলেন, “গত কয়েক দশকে যদি আমরা জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো বন্ধ করতাম, তাহলে হয়তো ইউরোপে এই গ্রীষ্মে এত মানুষ মারা যেতেন না।”

তাপমাত্রা ও মৃত্যুর মধ্যে সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, এই গরমে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বয়স্ক মানুষ। মৃতদের মধ্যে ৮৫ শতাংশের বয়স ৬৫ বছরের বেশি এবং ৪১ শতাংশের বয়স ৮৫ বছরের বেশি।

গবেষক গ্যারিফালোস কনস্টানটিনোডিস বলেন, বেশিরভাগ মৃত্যু হয়েছে ঘরবাড়ি কিংবা হাসপাতালের ভেতরে—যেখানে শারীরিকভাবে দুর্বল মানুষ তাপের কাছে হার মানেন। কিন্তু মৃত্যুর কারণ হিসেবে গরমের নাম খুব কমই দেখা যায় মৃত্যুসনদে।

কিছু মৃত্যুর খবর স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। স্পেনের লা রাম্বলার ৭৭ বছর বয়সী সাবেক কাউন্সিলর ম্যানুয়েল আরিজা সেরানো আগস্টে হাঁটার সময় রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে মারা যান। সে সময় কর্দোবা অঞ্চলে তাপমাত্রা উঠেছিল ৪৫ ডিগ্রিতে।

ইতালির উত্তরে চার সন্তানের বাবা ব্রাহিম আইত এল হাজ্জাম একটি স্কুল ভবনের জন্য কংক্রিট ঢালার কাজ করছিলেন। সেদিন ছিল ৩৮ ডিগ্রি তাপমাত্রা। কাজের ফাঁকে মাকে ফোন দিয়ে বলেছিলেন, “আমি দুপুরে বাসায় ফিরেই খাবার রাঁধবো।” এরপর তিনি আর ফিরে আসেননি। মৃত্যুর দুদিন পর থেকেই বাইরের নির্মাণকাজ দুপুরের পর নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।

গ্যারিফালোস বলেন, গরমজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি এখনও অনেকটাই উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। ঝড় বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে কেউ যেমন কাজ করতে যায় না, তেমনি ভয়াবহ গরমেও মানুষের সুরক্ষায় আমাদের আরও সচেতন হওয়া জরুরি।

২০০৩ সালে ইউরোপের ভয়াবহ তাপদাহে মারা গিয়েছিল ৭০ হাজার মানুষ। এরপর থেকে শহরগুলো কিছুটা প্রস্তুত হলেও, দিনের পর দিন তাপমাত্রা বাড়ছে, বাড়ছে ঝুঁকিও। এই বাস্তবতায় জরুরি সেবাগুলো চাপে পড়ছে।

চিকিৎসকরা বলছেন, তাপদাহের সময় স্থানীয় পর্যায়ে প্রস্তুতি থাকা উচিত। শহরে আরও বেশি সবুজ জায়গা তৈরি করা দরকার, কারণ শহরের তাপমাত্রা গ্রামাঞ্চলের চেয়ে অনেক বেশি। আর বৃদ্ধদের মতো ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের জন্য এয়ার কন্ডিশনিংয়ের ব্যবস্থা হওয়া উচিত।

স্বাস্থ্যবিষয়ক অলাভজনক সংস্থা 'ওয়েলকাম'-এর অভিযোজন বিশেষজ্ঞ ম্যাডেলেইন থমসন এই গবেষণায় অংশ না নিলেও বলেন, “এই তথ্যগুলো দেখায়, ইউরোপের কোনো শহরই গরমের মৃত্যুর ঝুঁকি থেকে মুক্ত নয়।”

তিনি আরও বলেন, “যদি এখনই ব্যবস্থা না নিই, তাহলে সামনে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়বে। আমাদের দ্রুত জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে আনতে হবে এবং এমন নীতিমালা তৈরি করতে হবে, যা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের সুরক্ষা দিতে পারবে।”

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন