আলোচনার টেবিলে ফিরছে ভারত: বাণিজ্য আলোচনার আগে শীর্ষ ট্রাম্প উপদেষ্টার মন্তব্য
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য উপদেষ্টা পিটার নাভারো সোমবার জানিয়েছেন, ভারত আবারও আলোচনার টেবিলে ফিরছে। এই মন্তব্য তিনি করেছেন এমন এক সময়ে, যখন দিল্লিতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি উচ্চপর্যায়ের দল আসছে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য আলোচনা চালাতে।
নাভারো সিএনবিসিকে বলেন, “ভারত আলোচনায় আসছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি খুবই ইতিবাচক, সৌজন্যপূর্ণ ও গঠনমূলক একটি টুইট করেছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও তার উত্তরে সদর্থক সাড়া দিয়েছেন। এখন দেখা যাক বিষয়টি কীভাবে এগোয়।”
এর আগেও ট্রাম্প বলেছিলেন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য বাধাগুলো কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্যে আলোচনায় রয়েছে। তিনি ‘ট্রুথ সোশ্যাল’–এ এক বার্তায় লেখেন, “আমি আমার খুব ভালো বন্ধু, প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে আগামী সপ্তাহগুলোতে কথা বলার অপেক্ষায় আছি। আমি নিশ্চিত, এই আলোচনার সফল সমাপ্তি ঘটবে, যেটি আমাদের দুই দেশের জন্যই কল্যাণকর হবে।”
প্রধানমন্ত্রী মোদিও এর উত্তরে আশাবাদ প্রকাশ করে বলেন, “আমি আত্মবিশ্বাসী, আমাদের চলমান বাণিজ্য আলোচনা ভারত-যুক্তরাষ্ট্র অংশীদারত্বের সীমাহীন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে।” তিনি আরও লেখেন, “ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং স্বাভাবিক অংশীদার। আমাদের দুই দেশের টিম দ্রুত এই আলোচনা শেষ করতে কাজ করছে। আমিও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলার অপেক্ষায় আছি। আমরা একসঙ্গে আমাদের মানুষের জন্য একটি উজ্জ্বল ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়তে কাজ করব।”
পিটার নাভারো অতীতে ভারতকে "শুল্কের রাজা" বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। এবারও তিনি বলেন, “ভারতের শুল্ক বিশ্বের অন্য যেকোনো বড় দেশের তুলনায় বেশি।” তাঁর অভিযোগ, ভারতের অশুল্ক বাধাও অনেক বেশি, যা যুক্তরাষ্ট্রকে বিব্রত করছে।
তিনি আরও বলেন, “এই অশুল্ক বাধার বিষয়টি আমাদের মোকাবিলা করতে হচ্ছে, যেমনটা অন্য দেশগুলোর সঙ্গেও করতে হয়েছে।”
নাভারো একই সঙ্গে ভারতের বিরুদ্ধে রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার বিষয়েও সমালোচনা করেন। তাঁর ভাষায়, ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর আগে ভারত কখনো রাশিয়া থেকে তেল কেনেনি। যুদ্ধ শুরুর পরপরই, তিনি বলেন, “ভারতীয় পরিশোধনকারীরা রাশিয়ার সঙ্গে হাত মিলিয়েছে এবং এতে তারা প্রচুর লাভ করছে। এটা একেবারেই অদ্ভুত। কারণ তারা অন্যায়ভাবে আমাদের সঙ্গে বাণিজ্য করে মুনাফা করছে, আর সেই অর্থ দিয়েই রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কিনছে। এরপর রাশিয়া সেই অর্থ ব্যবহার করে অস্ত্র কেনে, আর আমাদের করদাতারা ইউক্রেনকে রক্ষা করতে বাড়তি খরচ বহন করছে।”
নাভারো আরও বলেন, সম্প্রতি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে এক মঞ্চে দাঁড়াতে গিয়ে মোদি "আরামদায়ক বোধ করেননি।" ১ সেপ্টেম্বর, তিয়ানজিনে অনুষ্ঠিত সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) সম্মেলনে তিন নেতার উপস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “চীনের মতো একটি দেশ, যা ভারতের দীর্ঘদিনের অস্তিত্ব সংকটের উৎস, এবং রাশিয়া—এই দুই দেশের নেতার পাশে দাঁড়িয়ে মোদির জন্য সেটি স্বস্তিকর অভিজ্ঞতা ছিল না।”
এই মন্তব্যগুলো করেছেন ঠিক তখনই, যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান বাণিজ্য আলোচক ব্রেন্ডন লিঞ্চ সোমবার দিল্লিতে পৌঁছেছেন একটি দিনব্যাপী আলোচনা অনুষ্ঠানের জন্য। এটি মূলত ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে।
এ পর্যন্ত ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র পাঁচ দফা আলোচনায় বসেছে। ষষ্ঠ দফার আলোচনা ২৫ থেকে ২৯ আগস্ট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও তা স্থগিত করা হয়, কারণ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভারতের পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন, যার মধ্যে রুশ তেল কেনার ওপর ২৫ শতাংশ শুল্কও ছিল।
ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সচিব ও প্রধান আলোচক রাজেশ আগারওয়াল সোমবার বলেন, “আলোচনা এর আগেও চলছিল, তবে এবারের সফরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান আলোচক ভারতে এসেছেন এবং আগামীকাল আলোচনা হবে, যেখানে আমরা চুক্তির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখব। যদিও এটি ষষ্ঠ দফার আনুষ্ঠানিক আলোচনা নয়, তবে এটি সেই দিকেই এগিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি হতে পারে।”
তিনি জানান, ভার্চুয়াল মাধ্যমে সাপ্তাহিক ভিত্তিতে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে পরিবেশ অনুকূলে না থাকায় আলোচনায় খুব বেশি অগ্রগতি হয়নি। এখন কিছুটা সুযোগ দেখা যাচ্ছে, যার সদ্ব্যবহার করার চেষ্টা হচ্ছে।
তবে তিনি স্পষ্ট করেন, মঙ্গলবারের আলোচনা ষষ্ঠ দফার অংশ নয়, বরং সেটি হবে পরবর্তী ধাপের পথরেখা তৈরির একধরনের পূর্বাভাস। তাঁর কথায়, “আগামীকালকের আলোচনা আমাদের ষষ্ঠ দফার পথ খুলে দেবে।”
আলোচনার পথে ফিরছে ভারত। কূটনীতির এই অধ্যায় দুই দেশের সম্পর্ক কতটা এগিয়ে নিতে পারে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

