Logo
Logo
×

আন্তর্জাতিক

নেতানিয়াহুর স্বীকারোক্তি: গাজা যুদ্ধ ঘিরে দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতার মুখে ইসরায়েল

ডেস্ক রিপোর্ট

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১০:৩৮ এএম

নেতানিয়াহুর স্বীকারোক্তি: গাজা যুদ্ধ ঘিরে দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতার মুখে ইসরায়েল

গাজায় প্রায় দুই বছর ধরে চলা যুদ্ধ ঘিরে যখন বিশ্বের নানা প্রান্তে ক্ষোভ জমছে, তখন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সোমবার এক অনুষ্ঠানে বললেন, ইসরায়েল এখন এক ধরনের "বিচ্ছিন্নতার" মুখে, আর এই অবস্থা দীর্ঘদিন চলতে পারে। তাঁর ভাষায়, ইসরায়েলের সামনে এখন একমাত্র পথ—নিজের পায়ে দাঁড়ানো।

তেল আবিবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক সম্মেলনে নেতানিয়াহু বলেন, দেশের অর্থনীতিকে এখন এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে সেটা বাইরের সাহায্য ছাড়াও চলতে পারে। নিজের ভাষায় তিনি এটিকে বললেন “স্বনির্ভরতা”—যদিও এই শব্দটি তাঁর নিজেরই অপছন্দের। কারণ, একসময় তিনিই দেশকে উন্মুক্ত বাজার অর্থনীতির পথে নিয়ে গিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, অস্ত্র বাণিজ্য এখন সবচেয়ে বড় যে সংকটের মুখে পড়েছে, তা হলো বৈশ্বিক বিচ্ছিন্নতা। ইসরায়েলের অস্ত্র আমদানির ওপর নানা দেশের বিধিনিষেধ আসছে। ফলে ভবিষ্যতে দেশকে নিজের অস্ত্র শিল্প আরও শক্তভাবে গড়ে তুলতে হবে। তিনি বললেন, “আমরা হবো একসাথে এথেন্স আর সুপার স্পার্টা। সামনে যে বছরগুলো আসছে, সেখানে এই বিচ্ছিন্নতা মোকাবিলায় আমাদের কোনো বিকল্প নেই।”

নেতানিয়াহুর এই বক্তব্যকে অনেকেই ব্যতিক্রম হিসেবে দেখছেন। কারণ, এই প্রথম তিনি সরাসরি স্বীকার করলেন যে, গাজায় চলমান যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে ইসরায়েল এক গভীর অসন্তোষের মুখে পড়েছে। যদিও জাতিসংঘ এবং বহু আন্তর্জাতিক সংস্থা যখন গাজা শহরের ওপর আসন্ন হামলা ঠেকানোর আহ্বান জানাচ্ছে, তখনও তিনি পিছু হটছেন না। আন্তর্জাতিক মহলে যখন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ জোরালো হচ্ছে, ইসরায়েল তাতে দ্ব্যর্থহীনভাবে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

ইতোমধ্যে ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্য, স্পেন, ইতালিসহ আরও কয়েকটি দেশ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। তবে সবচেয়ে বড় অস্ত্র সরবরাহকারী যুক্তরাষ্ট্র এখনো এমন কোনো নিষেধাজ্ঞা দেয়নি। বরং তারা অন্য দেশগুলোকে এমন কিছু না করার পরামর্শ দিয়েছে। বাইডেন সরকারের সময় যে ২০০০ পাউন্ডের বোমার চালান আটকে ছিল, সেটি ট্রাম্প প্রশাসনের সময়ে আবার চালু করা হয়।

ইসরায়েলের ভেতরেও যুদ্ধ নিয়ে বিরোধ বাড়ছে। সাধারণ মানুষ, জিম্মিদের পরিবার, এমনকি সেনাবাহিনীর কিছু অংশও যুদ্ধ আরও বাড়ানোর বিপক্ষে। তাঁদের আশঙ্কা, এতে জিম্মিদের জীবন হুমকিতে পড়বে, এবং মানবিক বিপর্যয় আরও তীব্র হবে। কিন্তু নেতানিয়াহু এগিয়ে যাওয়ার পক্ষেই থেকেছেন।

গত শনিবার তেল আবিবে একটি প্রতিবাদ সমাবেশে ইসরায়েলিরা জিম্মিদের মুক্তির দাবি তুলেছেন। ছবিতে দেখা গেছে—মানুষের মুখে উদ্বেগ, হাতে পোস্টার, আর চোখে অপেক্ষার অস্থিরতা।

বছরের পর বছর ইসরায়েলকে একটি শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ হিসেবে দেখা হতো, বিশেষ করে এর তথ্যপ্রযুক্তি খাতের জন্য। কিন্তু এই যুদ্ধ এখন দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ এবং ব্যয়বহুল। নেতানিয়াহু বলেন, এই বিচ্ছিন্নতার জন্য শুধু যুদ্ধ নয়, ইউরোপে একটি “চরম ইসলামপন্থী এজেন্ডা” কাজ করছে, যা নাকি ইসরায়েলের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করেছে। কাতারসহ কিছু দেশ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন কথাবার্তা চালাচ্ছে, যা বিশ্বব্যাপী ইসরায়েলকে একঘরে করে দিচ্ছে।

তিনি বললেন, এই পরিস্থিতি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং অস্ত্র ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে বড় রকমের সংকট তৈরি করতে পারে।

ইসরায়েলের বিরোধী নেতা ইয়াইর লাপিদ এই বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করে বলেন, “বিচ্ছিন্নতা কোনো ভাগ্য নয়, এটা নেতানিয়াহুর ভুল এবং ব্যর্থ নীতির ফল।” তাঁর ভাষায়, এমন বক্তব্য “উন্মাদনা” ছাড়া আর কিছু নয়।

সাবেক সেনাপ্রধান এবং রাজনীতিতে আসার পরিকল্পনায় থাকা গাদি আইজেনকট বলেন, নেতানিয়াহু এবং তাঁর মিত্ররা শুধু ইসরায়েলকে বিশ্বের কাছে একঘরে করেননি, বরং জিম্মিদের নিয়েও দায়িত্বহীন আচরণ করেছেন। তাঁর মতে, এই ক্ষতি আর সহজে পুষিয়ে নেওয়া যাবে না।

তবে একই দিনে নেতানিয়াহু আবার বলেন, অর্থনীতি নিয়ে যাঁরা হতাশ, তাঁদের জন্য সুখবর আছে। তাঁর ভাষায়, ইসরায়েলের শেয়ারবাজার এখন বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী বাজার। তিনি বলেন, “ইসরায়েলে বিনিয়োগ করাই এখন বুদ্ধিমানের কাজ।” পশ্চিম ইউরোপের কিছু নেতা “চরম মুসলিম সংখ্যালঘুদের সামনে নতজানু হয়ে পড়েছেন”—এই অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ইসরায়েল নিজের অস্ত্র শিল্পে বিনিয়োগ বাড়াবে, যাতে কারো ওপর নির্ভর করতে না হয়।

অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচও নেতানিয়াহুর সুরে কথা বলেন। তিনি জানান, দেশের শেয়ারবাজার বাড়ছে, মূল্যস্ফীতি কমছে, এবং গাজার যুদ্ধকালেও অর্থনীতি সুচারুভাবে পরিচালিত হচ্ছে।

এর আগে সোমবার, নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে এক মঞ্চে কথা বলেন। রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বন্ধুত্ব বহু ক্ষেত্রেই দৃষ্টান্ত, এবং সেটি শুধু যুদ্ধ ও শান্তি নিয়েই নয়, আরও অনেক ইস্যুতে দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।

তাঁরা একসঙ্গে সমালোচনা করেন কিছু দেশকে, যারা চলতি মাসেই জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের আগেই ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে যাচ্ছে। সেই তালিকায় রয়েছে ফ্রান্স, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও আরও কয়েকটি দেশ।

দক্ষিণপূর্ব ভূমধ্যসাগরের এই উত্তপ্ত অঞ্চলে যুদ্ধ থেমে নেই। কিন্তু নেতাদের কথার ভেতরে লুকিয়ে থাকা উদ্বেগ, অসহায়তা আর প্রতিরোধের কণ্ঠ যেন আজ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

সূত্র: সিএনএন

Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন