Logo
Logo
×

আন্তর্জাতিক

দক্ষিণ চীন সাগরে উত্তেজনার মাঝে চীনের নতুন এলাকা ঘোষণা

ডেস্ক রিপোর্ট

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১০:৪৭ এএম

দক্ষিণ চীন সাগরে উত্তেজনার মাঝে চীনের নতুন এলাকা ঘোষণা

ছবিটি ২০২৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি, দক্ষিণ চীন সাগরে একটি আকাশপথে নজরদারি অভিযানের সময় স্কারবরো শোলের উপর থেকে তোলা হয়। ছবি: জ্যাম স্টা রোজা / এএফপি / গেটি ইমেজেস

দক্ষিণ চীন সাগরের উত্তাল জলরাশির মাঝে, হাজারো বিতর্ক আর উত্তেজনার কেন্দ্রে অবস্থিত একটি ছোট্ট প্রবালপ্রাচীর—স্কারবরো শোল। এই নির্জন অথচ গুরুত্বপূর্ণ শোলকে ঘিরেই সম্প্রতি চীন সরকারের একটি নতুন সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলেছে।

বুধবার চীন ঘোষণা করেছে, এই শোলকে ঘিরে একটি জাতীয় প্রকৃতি সংরক্ষণ এলাকা গড়ে তোলা হবে, যার আয়তন প্রায় ৩,৫০০ হেক্টর। চীনের ভাষায় এটির নাম হুয়াংইয়ান দ্বীপ, আর মূলত এখানকার প্রবালপ্রাচীর এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষাই এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য বলে জানানো হয়েছে।

এই ঘোষণার পরই ফিলিপাইন সরকার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তারা বলেছে, চীনের এই সিদ্ধান্ত অবৈধ এবং এর মাধ্যমে ম্যানিলার সার্বভৌম অধিকার এবং স্বার্থ লঙ্ঘিত হয়েছে। ফিলিপাইন এই শোলকে বলে বাজো দে মাসিনলোক এবং বহু বছর ধরে এটি তাদের অর্থনৈতিক অঞ্চল ও সার্বভৌম ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বৃহস্পতিবার ফিলিপাইন সরকার জানিয়েছে, তারা কূটনৈতিকভাবে চীনের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাবে।

চীন অবশ্য এই অভিযোগ মানেনি। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ফিলিপাইনের সব অভিযোগ ভিত্তিহীন এবং এসব কথিত প্রতিবাদ তারা প্রত্যাখ্যান করে। চীন দাবি করেছে, তারা উসকানি দেয়নি, বরং ফিলিপাইনই অহেতুক উত্তেজনা সৃষ্টি করছে।

স্কারবরো শোলটি ফিলিপাইন উপকূল থেকে মাত্র ২০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এবং এটি বহু বছর ধরেই দুই দেশের মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণ হয়ে আছে। এটি কেবল একটি কৌশলগত অবস্থানের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং এখানে রয়েছে প্রচুর মাছ এবং ঝড়ের সময় আশ্রয়ের জন্য নিরাপদ স্থান হিসেবেও ব্যবহৃত হয় এই এলাকা।

২০১২ সালে এক দীর্ঘ সামুদ্রিক উত্তেজনার পর চীন এই শোলটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। তখন থেকে চীন প্রায় সবসময় তাদের কোস্ট গার্ড বাহিনীকে ওই অঞ্চলে মোতায়েন রেখেছে এবং ফিলিপাইন মৎস্যজীবীদের ঐতিহ্যবাহী মাছ ধরার জায়গায় প্রবেশ করতে বাধা দিয়ে আসছে।

সম্প্রতি উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়, যখন ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে চীনের একটি যুদ্ধজাহাজ নিজেদের কোস্ট গার্ড জাহাজের সঙ্গে ধাক্কা খায়, ফিলিপাইনের একটি টহল জাহাজকে তাড়া করার সময়। এই ঘটনাটি দুই দেশের মাঝে ক্রমবর্ধমান সংঘাতের একটি বড় উদাহরণ হয়ে ওঠে।

চীনের মন্ত্রিপরিষদ বা স্টেট কাউন্সিল বলেছে, প্রকৃতি সংরক্ষণ এলাকা গঠন করা হয়েছে পরিবেশের ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য। তারা জানিয়েছে, “অবৈধ কর্মকাণ্ডের” বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সংরক্ষণের জন্য নির্ধারিত জায়গাটিকে একটি মূল এলাকা এবং দুই পাশের পরীক্ষামূলক এলাকায় ভাগ করা হয়েছে। মূল এলাকায় কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না, তবে পরীক্ষামূলক এলাকায় গবেষণা, শিক্ষা এবং কিছু পর্যটন কার্যক্রমের অনুমতি দেওয়া যেতে পারে।

চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে বলা হয়েছে, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে চীন তাদের আঞ্চলিক অধিকার রক্ষা করছে এবং এটি ভবিষ্যতে দক্ষিণ চীন সাগরের অন্যান্য এলাকাতেও এমন উদ্যোগের পথ খুলে দিতে পারে। তবে এই বক্তব্য ঘিরে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন।

দক্ষিণ চীন সাগরের সামুদ্রিক পরিবেশ রক্ষা নিয়ে চীনের এই নতুন কথার পেছনে নানা সন্দেহ তৈরি হয়েছে। কারণ, গত এক দশকে চীন এই অঞ্চলজুড়ে ব্যাপকভাবে কৃত্রিম দ্বীপ নির্মাণ করেছে। ২০২৩ সালে একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, চীন প্রায় ৪,৬০০ একর প্রবালপ্রাচীর ধ্বংস করে দ্বীপ বানিয়েছে এবং বড় আকারের ক্ল্যাম শেল আহরণের কারণে ১৬,০০০ একরেরও বেশি প্রবালপ্রাচীর নষ্ট হয়েছে।

ফিলিপাইনের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এদুয়ার্দো আনিয়ো বলেন, চীনের এই প্রকৃতি সংরক্ষণের ঘোষণা বাস্তবে পরিবেশ রক্ষা নয়, বরং তাদের সামুদ্রিক দখলদারির যুক্তি প্রতিষ্ঠারই একটি নতুন কৌশল। তিনি বলেন, “২০১৬ সাল থেকে চীনা জেলেদের দ্বারা যে পরিবেশ ধ্বংস হয়েছে, এখন সেটাকেই তারা রক্ষার গল্প বলছে—এটা বড়ই পরিহাসজনক।”

চীনের তৈরি মানচিত্রে দেখা গেছে, পুরো শোলের উত্তর-পূর্ব প্রান্তজুড়ে সংরক্ষিত এলাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এখনো সেখানে কোনো স্থাপনা বানানো হয়নি। অথচ ফিলিপাইন বারবার দাবি করে আসছে, চীন তাদের ছায়াসামরিক বাহিনী ব্যবহার করে প্রবালপ্রাচীর ধ্বংস করছে।

এই এলাকা কেবল ভূরাজনীতির খেলা নয়, এর মধ্যে জড়িয়ে আছে বহু মানুষের জীবিকা, আশ্রয়, ইতিহাস এবং সমুদ্রের জটিল পরিবেশ। তাই এ ধরনের সিদ্ধান্ত যখন একতরফাভাবে নেওয়া হয়, তখন তা কেবল বিতর্ক নয়, বরং দ্বিপাক্ষিক বিশ্বাসের দেয়ালেও চিড় ধরায়।

সূত্র: সিএনএন

Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন