Logo
Logo
×

আন্তর্জাতিক

যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কে বিধ্বস্ত ভারতীয় রপ্তানি, পোশাক-চিংড়ি-শ্রমিক সবাই বিপদে

ডেস্ক রিপোর্ট

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৫, ০২:৩৭ পিএম

যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কে বিধ্বস্ত ভারতীয় রপ্তানি, পোশাক-চিংড়ি-শ্রমিক সবাই বিপদে

নয়ডার একটি পোশাক কারখানায় কাপড় খুঁজছেন এক কর্মী, ৭ আগস্ট ২০২৫। ছবি: আদনান আবিদি/রয়টার্স

ভারতের রাজধানী দিল্লির বিশাল বাজারের এক কোণে চুপচাপ বসে আছেন অনুজ গুপ্তা। তাঁর দোকানে যেন নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা। তিনি পোশাকের বিভিন্ন উপকরণ—ফিতা, বোতাম—সরবরাহ করতেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপিত শাস্তিমূলক শুল্ক তার ব্যবসাকে প্রায় থামিয়ে দিয়েছে।

বুধবার সকালে ভারতজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে খবর—যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা ভারতীয় পণ্যে এখন ৫০ শতাংশ শুল্ক। তার আগ পর্যন্ত যা ছিল ২৫ শতাংশ। কারণ হিসেবে ট্রাম্প প্রশাসন বলেছে, ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে অপরিশোধিত তেল কেনা থামাচ্ছে না। তারা মনে করে, এর ফলে মস্কোর যুদ্ধের খরচ জোগানো হচ্ছে। ভারত বলছে, এই যুক্তি খাটে না, কারণ ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা চীন রাশিয়া থেকে আরও বেশি পণ্য কেনে, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও এখনো কিছু কিছু বাণিজ্য করছে রাশিয়ার সঙ্গে।

অনুজ গুপ্তা বললেন, ফ্যাশনের জগতে সবকিছুই চলে এক বছর আগাম পরিকল্পনায়। এখন ২০২৬ সালের শরতের পোশাক তৈরি হচ্ছে। অথচ মার্কেটের এই অনিশ্চয়তা পুরো ব্যবস্থায় বড় রকমের ধাক্কা দিয়েছে। তাঁর ব্যবসার ৪০ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রমুখী। আগ পর্যন্ত তিনি ভেবেছিলেন, ট্রাম্প হয়তো কেবল চাপ তৈরি করছেন। অথবা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আমেরিকার ভালো সম্পর্ক হয়তো এই সংকট থেকে রক্ষা করবে। কিন্তু বাস্তবে তিনি পেলেন সবচেয়ে খারাপ খবরটিই।

ওয়াশিংটন ও দিল্লির মধ্যে পাঁচ দফা বৈঠক হলেও কোনো চুক্তি হয়নি। এখন রপ্তানিকারকেরা আশঙ্কায় আছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতারা হয়তো ভারতের পণ্য ছেড়ে অন্য দেশের দিকে ঝুঁকবেন।

এই শুল্ক নতুন করে নাড়া দিয়েছে দিল্লির নেতৃত্বাধীন সেই কূটনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ককে, যা দুই দশক ধরে গড়ে উঠেছিল। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ভারতের যে রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতি, বিশেষ করে পোশাক, হীরা-গয়না, কার্পেট, চিংড়ি—এই খাতগুলো তীব্র ধাক্কা খাবে। ঝুঁকিতে পড়বে লাখ লাখ কর্মসংস্থান।

উদাহরণ দিতে গিয়ে চিংড়ি রপ্তানিকারক কেআনন্দ কুমার বলেন, তার কোম্পানি সান্ধ্যা মেরিনসের ৩৫০০ কর্মী, যাঁদের মধ্যে অনেকেই উপকূলের ছোট ছোট গ্রামের চাষি ও খামারি। তিনি বললেন, এই খাতে ২০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত। ট্রাম্পের শুল্কের কারণে অন্তত অর্ধেকের বেশি লোক সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তিনি নিজেই ইতিমধ্যে ছাঁটাই শুরু করেছেন। কারণ কোনো অর্ডার নেই, অথচ বেতন দিতে হচ্ছে। বিশেষ করে যারা হাতে চিংড়ি খোসা ছাড়ায়, তাদের কোনো কাজ নেই এখন।

ভারতের রপ্তানিকারক সমিতির হিসাবে, ট্রাম্পের এই শুল্ক ভারতের ৮৭ বিলিয়ন ডলারের পণ্যের অন্তত ৫৫ শতাংশ রপ্তানিকে প্রভাবিত করবে। এতে লাভবান হবে চীন, বাংলাদেশ কিংবা ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো, যাদের ওপর শুল্ক কম।

মুডিস বলেছে, এই শুল্ক ভারতের অর্থনীতির গতি কমিয়ে দিতে পারে। ২০২৫ সালের পর থেকে ভারতের জন্য রপ্তানি ও শিল্পায়নের যে সম্ভাবনা ছিল, তা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

কুমার বলেন, এটা যেন এক দুঃস্বপ্ন—কোন সকালে উঠে কী শুল্কের মুখে পড়বেন, কেউ জানে না। তিনি বলেন, গত ৩০ বছরের ব্যবসা জীবনে এমন অনিশ্চয়তা আগে আসেনি। যুক্তরাষ্ট্র যা খুশি করছে, আর ভারত শুধু মানিয়ে নিচ্ছে। একেবারে অসহায় মনে হচ্ছে।

এই চাপে তামিল নাড়ুর তিরুপুর শহরেও আতঙ্ক। পোশাক রপ্তানিতে ভারতের শীর্ষ শহর এটি। 'ডলার সিটি' নামে পরিচিত তিরুপুর থেকেই জারা, গ্যাপসহ বিশ্ববিখ্যাত ব্র্যান্ডগুলো পোশাক কেনে। এখানকার একটি কোম্পানি এসএনকিউএস ইন্টারন্যাশনালের কর্তা ভি ইলাঙ্গোভন বলেন, যেসব অর্ডারে লাভ কম, সেসবের উৎপাদন এখন বন্ধ। তাঁর কোম্পানিতে ১৫০০ কর্মী কাজ করেন। তিনি বলেন, তিরুপুরে অন্তত দেড় লাখ কর্মী ছাঁটাইয়ের ঝুঁকিতে আছেন। তিনি বলেন, নতুন ক্রেতা খোঁজা মানে একটা সুইচ টিপে পরিবর্তন নয়। এই অনিশ্চয়তা দীর্ঘ হলে নগদ টান পড়বে, ছাঁটাইও বাড়বে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেছেন, ভারতকে আত্মনির্ভর হতে হবে। সারা বিশ্বে এখন নিজেদের স্বার্থকে বড় করে দেখছে দেশগুলো। এই বাস্তবতায় শুধু অভিযোগ করে বসে থাকলে হবে না। স্বাধীনতা দিবসে দিল্লির লালকেল্লা থেকে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, কৃষকের স্বার্থে কোনো আপস হবে না। যুক্তরাষ্ট্র চায় ভারত তার কৃষি ও দুগ্ধ খাত উন্মুক্ত করুক, সেখানেই দুই দেশের আলোচনায় আটকে আছে সমঝোতা।

কিন্তু ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকার যেন এক চোখ রক্ষা করতে গিয়ে আরেক চোখে ঘুষি খাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। ইলাঙ্গোভন বলেন, ৫০ শতাংশ শুল্ক মানে কার্যত ভারতের পণ্যের ওপর এক ধরনের নিষেধাজ্ঞা।

এই ক্ষতটা এখন ধীরে ধীরে ভারতের মানুষের রোজগারে গিয়ে আঘাত করছে—একদিকে ছাঁটাই, অন্যদিকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়া বাজার। আর তার মাঝখানে অনুজ গুপ্তারা চুপ করে বসে আছেন, কীভাবে ঘুরে দাঁড়াবেন, জানেন না। সূত্র: আল জাজিরা

Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন