যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানাপড়েনের মধ্যে চীন সফরে মোদী, পাশে থাকবেন শি ও পুতিন

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (মাঝে), চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং (বামে) ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন (ডানে) — ২০১৬ সালে ভারতের গোয়ায়। যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্কের চাপের পর পশ্চিমা জোটের বাইরে সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা করছে ভারত। ছবি: মানীশ স্বরূপ/এপি
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই সপ্তাহান্তে প্রথমবারের মতো সাত বছর পর চীনে যাচ্ছেন। তিনি অংশ নিচ্ছেন তিয়ানজিনে অনুষ্ঠিতব্য একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা সম্মেলনে। সেখানে তাঁর সঙ্গে থাকবেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এই সফর এমন এক সময় হচ্ছে, যখন ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক বেশ খারাপ হয়ে পড়েছে।
মাত্র কয়েকদিন আগেই যুক্তরাষ্ট্র ভারতের রপ্তানি পণ্যের ওপর শুল্ক দ্বিগুণ করে ৫০ শতাংশ করেছে। তারা বলছে, দিল্লি রুশ তেল কেনা বন্ধ না করায় এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে ওয়াশিংটন। অনেক বছর ধরে ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যেসব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, এই শুল্ক দ্বন্দ্বে তার অনেকটাই এলোমেলো হয়ে গেছে। প্রযুক্তি ও চীনের প্রভাব ঠেকানোর মতো বিষয়ে যাদের লক্ষ্য ছিল এক, তারাই এখন দূরত্বে। এই অবস্থায় ভারত এখন বাধ্য হচ্ছে বিকল্প বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পথে হাঁটতে।
দক্ষিণ এশিয়া বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, “ভারতের যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা যেন ভেঙে পড়েছে। ওয়াশিংটনে সবাই হয়তো এখনো টের পাননি, কী দ্রুত এই বিশ্বাস নষ্ট হলো।”
চীনের জন্য এই সম্মেলনের সময়টি যেন একেবারে উপযুক্ত। বিশ্লেষক কুগেলম্যান বলছেন, “যখন ভারত-চীন সম্পর্ক একটু স্থিতিশীল হচ্ছে আর ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক নিচে নেমে যাচ্ছে, তখন মোদীর চীন সফর এক বিশেষ বার্তা দিচ্ছে। এটা নিঃসন্দেহে চীনের কাছে এক চমৎকার সুযোগ।”
তাকশশীলা ইনস্টিটিউশনের ইন্দো-প্যাসিফিক বিষয়ক প্রধান মনোজ কেওয়ালরামানি বলেন, “চীনের কেউ কেউ নিশ্চয়ই এখন ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক টানাপড়েনে বেশ আনন্দিত।”
এদিকে, রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনও এই সময়টিকে কাজে লাগাতে চান। বিশ্লেষক কুগেলম্যানের ভাষায়, “পুতিন চাইবেন এই সুযোগে ভারত-রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কটা আবারও জোরালোভাবে তুলে ধরতে। ওয়াশিংটনের দিকে সবাই যেন একসঙ্গে জিহ্বা বের করে বলছে, ‘আমরা তোমাদের চাপে নুইবো না।’”
যুক্তরাষ্ট্র বলছে, রুশ তেল ও সামরিক সরঞ্জাম কিনে ভারত কার্যত ইউক্রেনে রুশ যুদ্ধের জন্য অর্থ যোগান দিচ্ছে। তারা এই কারণেই ভারতের ওপর বাড়তি শুল্ক চাপিয়েছে।
এই সিদ্ধান্ত ভারতের জন্য অর্থনৈতিকভাবে বড় ধাক্কা। যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার, যার পরিমাণ বছরে প্রায় ৮৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। এর দুই-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যের ওপরই এখন অতিরিক্ত শুল্ক বসছে। এতে করে কাপড়, গহনা, হস্তশিল্পসহ শ্রমনির্ভর অনেক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এই টানাপড়েনের মধ্যেই মোদী এখন চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উষ্ণ করতে আগ্রহী হয়েছেন। ২০২০ সালে হিমালয়ের সীমান্তে রক্তাক্ত সংঘর্ষের পর দুই দেশের সম্পর্ক বরফ হয়ে গিয়েছিল। তবে গত বছর রাশিয়ায় ব্রিকস সম্মেলনে মোদী ও শি প্রথমবারের মতো মুখোমুখি হন। এরপর থেকে কিছুটা বরফ গলছে। এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েন যেন সেই প্রক্রিয়াকে আরও জোরালো করেছে।
আশা করা হচ্ছে, এই সম্মেলনের ফাঁকে মোদী ও শি জিনপিং বৈঠকে বসবেন। আলোচনায় প্রধান বিষয় হবে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ। মনোজ কেওয়ালরামানি বলেন, “ভারত ও চীন এখন একটা নতুন ভারসাম্যে পৌঁছাতে চাইছে। বিশ্বরাজনীতির বড় রকম পরিবর্তন হচ্ছে, সেটা দুই দেশই বুঝতে পারছে। অনেক সমস্যা থেকে যাবে, কিন্তু সম্পর্কটাকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা তারা করছে।”
তবে দুই দেশের সীমান্তে বিশ্বাসের অভাব থেকেই যাবে। চীন এখনো বিতর্কিত সীমান্তে রাস্তাঘাট, রেললাইন, বসতি গড়ে চলেছে। কিন্তু কিছুটা স্থিরতা এবং পূর্বাভাসযোগ্যতা তৈরি করা গেলে বাস্তব দিক থেকে দুই দেশেরই লাভ হতে পারে।
এই অবস্থায় রাশিয়াও লাভবান হতে চাইছে। ভারতের দৃষ্টিতে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ এতে ভারসাম্য রক্ষা করা যায়, পশ্চিমা চাপ থেকে কিছুটা রেহাই মেলে, সামরিক সরঞ্জাম কেনা ও জ্বালানির নিরাপত্তাও নিশ্চিত হয়।
একজন অবসরপ্রাপ্ত ভারতীয় কূটনীতিক বলেন, “এই সম্মেলনে মোদীর শি ও পুতিনের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তোলা নিজেই হবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক বার্তা।”
ভারতীয় কর্মকর্তারা বলছেন, দিল্লি এখনো চায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে। তবে একসঙ্গে আরও অনেক অংশীদারের সঙ্গে কাজ করতে হবে। এক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে মাথানত করছে—এমন ছবি এখন ভারতের পক্ষে একেবারেই চলবে না। জনমনে ক্ষোভ প্রবল।”
এই ক্ষোভের প্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার ভারত সরকার প্রথম পাল্টা পদক্ষেপ নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের জবাবে ৪০টি দেশে—যেমন যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ কোরিয়া—রপ্তানি বাড়াতে টেক্সটাইল খাতে বড় একটি প্রচার শুরু করেছে।
চীনের আগে মোদী শুক্রবার জাপান যাবেন ভারত-জাপান বার্ষিক সম্মেলনে যোগ দিতে। শিগেরু ইশিবা’র সঙ্গে তার বৈঠকে প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ নিয়ে কথা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানাপড়েনের এই সময়ে জাপানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা ভারতের কৌশলের অংশ।
জাপানি কোম্পানিগুলো আগামী দশকে ভারতে প্রায় ৬৮ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে বলে জানিয়েছে এনএইচকে। এর মধ্যে সুজুকি মোটর একাই আগামী পাঁচ-ছয় বছরে ৮ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
মোদী এই সপ্তাহেই একটি সুজুকি কারখানা পরিদর্শন করে বলেছেন, “ভারত ও জাপান একে অপরের জন্যই তৈরি।” দুই দেশের নেতারা মাটি ও খনিজ সম্পদ, উন্নত উৎপাদন খাতেও যৌথ কাজ নিয়ে কথা বলবেন।
ভারতে প্রচুর দুষ্প্রাপ্য খনিজ রয়েছে, যেগুলো স্মার্টফোন থেকে শুরু করে সৌরপ্যানেল তৈরিতে লাগে। কিন্তু সেই খনিজ উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রযুক্তি এখনো ভারতের নেই। তাই জাপানের সঙ্গে অংশীদারিত্ব এই মুহূর্তে ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান