Logo
Logo
×

আন্তর্জাতিক

আল জাজিরার মতামত প্রতিবেদন

ইউরোপে আবারও প্রাণঘাতী সীমান্ত নাটক

Icon

মারিয়ানা কারাকুলাকি

প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৫, ১০:৩৮ এএম

ইউরোপে আবারও প্রাণঘাতী সীমান্ত নাটক

ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার (বাঁয়ে) ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ১০ জুলাই ২০২৫, লন্ডনের নর্থউড সামরিক সদর দপ্তরে যৌথ সংবাদ সম্মেলনের শেষে করমর্দন করছেন। \[ছবি: লিয়ন নিল/পুল/রয়টার্স]

গত ১০ জুলাই গ্রিসের অভিবাসনমন্ত্রী থানোস প্লেভরিস ঘোষণা দেন যে, নতুন একটি আইন পাশ হতে যাচ্ছে, যাতে আফ্রিকা থেকে বিপজ্জনক পথে ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে গ্রিসে আসা মানুষেরা আর আশ্রয় চাইতে পারবে না। তিনি বলেন, গ্রিস উত্তর আফ্রিকা থেকে হাজার হাজার অনিয়মিত অভিবাসীর অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ আর সহ্য করবে না। তার এই মন্তব্যের পরই মানবাধিকার সংগঠনগুলো তীব্র প্রতিবাদ জানায়। তারা একে অবৈধ বলে আইনটি বাতিলের দাবি জানায়। গ্রিক আইনজীবী সমিতির সর্বোচ্চ পরিষদ জানায়, আশ্রয়প্রার্থীদের অধিকার কেড়ে নেওয়া আন্তর্জাতিক ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইন লঙ্ঘনের শামিল।

একই দিনে, ইউরোপের অন্যপ্রান্তে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ফ্রান্সের সঙ্গে এক যৌথ চুক্তির ঘোষণা দেন, যা ছোট নৌকা ও পাচারকারী চক্র রোধে কার্যকর হবে বলে তিনি দাবি করেন। তিনি বলেন, এই চুক্তির মাধ্যমে একটি পরিষ্কার বার্তা দেওয়া হবে—এই বিপজ্জনক ভ্রমণগুলো অর্থহীন। কিন্তু ব্রিটেনের রাজনৈতিক মহলের বিভিন্ন শ্রেণি চুক্তিটির সমালোচনা করেছে। চিকিৎসা সহায়তাদানকারী সংগঠন ‘ডাক্তারস উইদাউট বর্ডারস’ একে বেপরোয়া, ভুলপথে নেওয়া এবং বিপজ্জনক আখ্যা দিয়েছে। ‘মাইগ্রেন্টস রাইটস নেটওয়ার্ক’ জানিয়েছে, এই চুক্তি মানুষকে ইউকে-তে আসা থেকে বিরত রাখতে পারবে না।

২০১৫ সালের গ্রীষ্মে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এক অভূতপূর্ব শরণার্থী সংকটে পড়ে। তখন আইএসের উত্থান, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ এবং আফগানিস্তানের অস্থিতিশীলতা হাজারো মানুষকে নিরাপত্তার আশায় ইউরোপের দিকে ঠেলে দেয়। সেই সময়ের ‘দীর্ঘ গ্রীষ্মের অভিবাসন’ ইউরোপে এক শরণার্থী সংকটের সূচনা করে। তখন ‘ইউরোপিয়ান এজেন্ডা ফর মাইগ্রেশন’ নামে একটি পরিকল্পনা নেয়া হলেও, সেটি বাস্তবে পরীক্ষা হয়নি।

আজকের দিনেও সেই ‘সংকটের গল্প’ ইউরোপের নীতিনির্ধারকদের মাথায় গেঁথে আছে। বিশেষ করে গ্রিসে, ২০১৫ সাল থেকে অভিবাসন রোধে কঠোর পদক্ষেপই যেন সরকার পরিচালনার নিয়মে পরিণত হয়েছে। সরকারের দৃষ্টিতে অভিবাসন অর্থনৈতিক সফলতার গল্পে কালো দাগ। আর ব্রিটেনে এই অভিবাসনের বিষয়টি ডানপন্থী রাজনীতির ইন্ধন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। দুই দেশের সরকারই অভিবাসন নীতিকে এমনভাবে গড়ছে, যাতে অভিবাসীরা নিরুৎসাহিত হন এবং দেশের ভেতরের জনমতকে সন্তুষ্ট রাখা যায়।

এই অভিবাসন নীতিগুলোকে আলাদা করে দেখা ঠিক হবে না। ইউরোপজুড়ে ডানপন্থার উত্থান এই নীতিগুলোর পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে। গ্রিসে অভিবাসন মন্ত্রী বারবার আফ্রিকা থেকে একধরনের ‘আগ্রাসন’ বা ‘অভ্যুত্থান’-এর গল্প তুলে ধরছেন। তার মতে, শুধু প্রকৃত শরণার্থীরাই ইউরোপের সুরক্ষার অধিকারী হতে পারে। ব্রিটেনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়েভেট কুপার বলেন, ছোট নৌকাগুলো দেশের সীমান্ত নিরাপত্তা ধ্বংস করতে পারে। তাই এগুলো রুখতে হবে।

গ্রিস, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ব্রিটেনের অভিবাসন পরিকল্পনাগুলো ভিন্ন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তৈরি হলেও, সেগুলোর মূল চিন্তা ও ভাষা এক ধরনের। অভিবাসীকে একটি হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে, আর সীমান্তকে একটি প্রতিরক্ষার জায়গা হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। সেই অভিবাসীকে ‘অবৈধ’ ঘোষণা করে রাষ্ট্র তার অস্তিত্বই অস্বীকার করে। সীমান্তকে রক্ষা করার নামে রাষ্ট্র তৈরি করছে এক বিভাজনের গল্প—‘আমরা বনাম তারা’। সেখানে অভিবাসীরা আর মানুষ হিসেবে পরিচিত নন, তারা শুধু একদল আগন্তুক, যাদের একেকজনের গল্প আর গুরুত্বপূর্ণ নয়। এখন যাদের ‘প্রকৃত শরণার্থী’ মনে হচ্ছে, কেবল তারাই সুরক্ষার যোগ্য। বাকিরা অপ্রয়োজনীয়—তাদের তাড়িয়ে দেওয়া যায়।

২০১৫ সালে ইউরোপীয় সীমান্তে যে ঘটনাগুলো ঘটেছিল, সেটিকে সাধারণত ‘শরণার্থী সংকট’ বলা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এটা ছিল ইউরোপীয় সীমান্তেরই সংকট। সেই সংকট থেকে ইউরোপ আরও কঠোর হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন দেশে কাঁটাতার উঠেছে, নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে, যাদের তারা চায় না—তাদের ঠেকাতে, তাড়াতে। সীমান্তে সহিংসতা, মানবাধিকার লঙ্ঘন আজ স্বাভাবিক।

যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মধ্যে হওয়া সাম্প্রতিক চুক্তিকে অনেকে যুগান্তকারী বললেও, এর আদলে ২০১৬ সালের ইইউ-তুরস্ক চুক্তিই কাজ করছে। সেই চুক্তি সাময়িকভাবে এজিয়ান সাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে আসা মানুষ কমিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু থামাতে পারেনি। শুধু পথ পাল্টেছে, ঝুঁকি বেড়েছে।

এই নীতিগুলোর ব্যর্থতার কারণ সহজ। মানুষকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়া থামানো যায় না। হয়তো বিলম্বিত করা যায়, কিন্তু সম্পূর্ণভাবে থামানো যায় না। এই নীতিগুলোর মূলতত্ত্ব বিভাজন সৃষ্টি করা। উদ্দেশ্য মানুষকে ভাগ করে বলা—কে নিরাপদে বাঁচার যোগ্য আর কে নয়। এগুলো ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যের ঔপনিবেশিক ও পুঁজিবাদী অতীত থেকে উৎসাহিত।

সীমান্তকে একটি মঞ্চ বানিয়ে দেখানো হচ্ছে যেন পুরো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে। কিন্তু বাস্তবে, এই সংকট তৈরি করা হয়েছে, আর সেই সংকট রোধের নাটক চলছে। অভিবাসন রোধের উদ্দেশ্য আসলে সফল হওয়া নয়, বরং নাগরিকদের বোঝানো—এটা করা জরুরি।


মারিয়ানা কারাকুলাকি ইউরোপে অভিবাসন ও উগ্র ডানপন্থী রাজনীতি নিয়ে কাজ করা একজন সাংবাদিক। তিনি বর্তমানে বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে পিএইচডি গবেষক হিসেবে ইউরোপীয় সীমান্তে জীবন ও মৃত্যুর অভিজ্ঞতা নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি E-International Relations-এর একজন পরিচালক এবং Critical Perspectives on Migration in the Twenty-First Century গ্রন্থের সহ-সম্পাদক।

Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন