পোপ গাজার যুদ্ধকে ‘বর্বরতা’ বলে নিন্দা জানালেন, খাবারের জন্য অপেক্ষারত অবস্থায় ইসরায়েলি গুলিতে নিহত ৯৩
ঘটনাস্থল জিকিম এলাকা থেকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ফিলিস্তিনিদের। ছবি: আনাদোলু/গেটি ইমেজেস
পোপ লিও চতুর্দশ গাজায় চলমান যুদ্ধকে “বর্বরতা” বলে অভিহিত করেছেন এবং “বাছবিচারহীন শক্তি প্রয়োগ”-এর নিন্দা জানিয়েছেন। এদিকে গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থা জানিয়েছে, খাবারের জন্য সারিতে দাঁড়ানো অবস্থায় অন্তত ৯৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ইসরায়েল নতুন করে গাজায় উদ্বাস্তুতে পূর্ণ এলাকাগুলো খালি করার নির্দেশ দিয়েছে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি গুলিতে বহু মানুষ নিহত হয়েছেন যাঁরা জিকিম সীমান্ত দিয়ে জাতিসংঘের খাদ্য সহায়তা ট্রাক প্রবেশের আশায় অপেক্ষা করছিলেন। এ ধরনের ঘটনার মধ্যে এটি অন্যতম সবচেয়ে বড় প্রাণহানির ঘটনা।
দক্ষিণের রাফাহ এলাকায় সহায়তা পাওয়ার আশায় ভিড় করা অবস্থায় নয়জন গুলিতে নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। একই সময়ে খান ইউনিস শহরের কাছে আরেকটি সাহায্য কেন্দ্রে চারজন নিহত হন বলে জানিয়েছেন গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থার মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বলেছে, তারা উত্তর গাজায় হাজারো মানুষের জড়ো হওয়ার ঘটনায় গুলি চালিয়েছে, কারণ ওই ভিড় থেকে হুমকি আসতে পারে বলে তারা মনে করেছিল। তারা স্বীকার করেছে কিছু লোক হতাহত হয়েছেন, তবে গাজার কর্মকর্তাদের দেওয়া নিহতের সংখ্যা তাদের প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি। দক্ষিণের ঘটনাগুলোর বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি তারা।
জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি জানায়, তাদের ২৫টি খাদ্য সহায়তা ট্রাকের বহর গাজা শহরের কাছে পৌঁছালে সেখানকার “ক্ষুধার্ত মানুষের বিশাল ভিড়” গুলিবর্ষণের শিকার হয়। সংস্থাটি বলেছে, বেসামরিক মানুষ যারা খাদ্য সহায়তা পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে, তাদের ওপর যেকোনো ধরনের সহিংসতা “পুরোপুরি অগ্রহণযোগ্য”।
আল-শিফা হাসপাতালের পরিচালক মোহাম্মদ আবু সালমিয়া এসোসিয়েটেড প্রেসকে জানান, রবিবার সকালে জিকিম সীমান্ত দিয়ে সহায়তা প্রবেশের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে ৪৮ জন নিহত ও ১৫০ জন আহত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়। তিনি বলেননি এই লোকগুলো ইসরায়েলি বাহিনী, সশস্ত্র গোষ্ঠী নাকি উভয়ের গুলিতে নিহত হয়েছেন।
এই সব ঘটনার আগেই পোপ লিও চতুর্দশ রোমের কাছে ক্যাসতেল গানদোলফোতে অ্যাঞ্জেলাস প্রার্থনার শেষে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানান এবং বলেন, “এই বর্বরতা অবিলম্বে থামাতে হবে, শান্তিপূর্ণ উপায়ে এই সংকটের সমাধান খুঁজতে হবে।”
গত সপ্তাহে গাজার একমাত্র ক্যাথলিক গির্জায় ইসরায়েলি হামলায় তিনজন নিহত ও ১০ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে ছিলেন গির্জার পাদ্রি, যিনি নিয়মিত পোপ ফ্রান্সিসের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। ইসরায়েল এই ঘটনায় “গভীর দুঃখ” প্রকাশ করে তদন্ত শুরু করেছে। গির্জাটিতে প্রায় ৬০০ উদ্বাস্তু মানুষ আশ্রয় নিয়েছিলেন, যাদের অধিকাংশই শিশু এবং অনেকেই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন।
পোপ বলেন, “এই ঘটনা গাজার বেসামরিক জনগণ ও উপাসনালয়গুলোর ওপর চলমান সামরিক আক্রমণের একটি বর্ধিত অংশ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আমি আহ্বান জানাচ্ছি তারা যেন মানবাধিকার আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়, সাধারণ মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করে এবং দলগত শাস্তি, বাছবিচারহীন সহিংসতা ও জোরপূর্বক স্থানান্তর বন্ধ করে।”
রবিবার ইসরায়েল, জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয়ের দপ্তরের ইসরায়েল অফিসের প্রধান জনাথন হুইটলের বাসিন্দা থাকার অনুমতিও বাতিল করে। তিনি গাজার মানবিক পরিস্থিতির সমালোচনা করে একাধিকবার বক্তব্য দিয়েছিলেন। ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সা’র বলেছেন, তিনি “যুদ্ধ নিয়ে মিথ্যা ছড়িয়েছেন, প্রমাণ ছাড়াই”।
একইদিন ইসরায়েল মধ্য গাজার এলাকাগুলো খালি করার নির্দেশ দেয়। এসব এলাকায় বহু উদ্বাস্তু এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। দেইর আল-বালাহ শহরে বিমান হামলায় তিনটি বাড়ি আক্রান্ত হয়। মানুষজন নিজের জিনিসপত্র নিয়ে বাড়ি ছেড়ে পালাতে শুরু করে। একজন বাসিন্দা বলেন, “তারা আমাদের ওপর লিফলেট ফেলেছে, কিন্তু আমরা জানি না কোথায় যাব, আমাদের কোনো আশ্রয় নেই।”
জাতিসংঘের মানবিক সাহায্য সংস্থা ওচা জানায়, “এই নতুন স্থানত্যাগের নির্দেশ গাজা উপত্যকার মানুষের জন্য জীবনরক্ষাকারী যেটুকু ব্যবস্থা আছে, সেটিকেও ধ্বংস করে দিয়েছে।”
জাতিসংঘের সংস্থা অনরওয়া রবিবার জানিয়েছে, ইসরায়েল “গাজার মানুষকে অনাহারে রাখছে,” যাদের মধ্যে ১০ লাখ শিশু রয়েছে। সংস্থাটি বলে, “আমাদের মজুদে রয়েছে তিন মাসের জন্য গাজা উপযোগী খাদ্য। গুদাম মিশরের আরিশ শহরে অবস্থিত। গেট খুলুন, অবরোধ তুলুন, আমাদের সাহায্য করতে দিন।”
অনরওয়া জানায়, শিশুদের মধ্যে মারাত্মক অপুষ্টির কারণে মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। ইসরায়েল অনরওয়ার সঙ্গে সব ধরনের সহযোগিতা বন্ধ করে দিয়েছে এবং তাদের দাবি, এই সংস্থা হামাস দ্বারা প্রভাবিত। যদিও একটি স্বাধীন তদন্তে দেখা গেছে, ইসরায়েল এই দাবি প্রমাণ করতে পারেনি।
অনরওয়া দীর্ঘদিন ধরে গাজায় স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও খাদ্য সহায়তা প্রদানকারী প্রধান সংস্থা ছিল।
গত মে মাস থেকে ত্রাণ বিতরণের দায়িত্ব চলে যায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সমর্থিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশনের হাতে। এতে খাদ্য খুবই অপ্রতুল ও দাম বেড়ে গেছে। কারণ ২ মার্চ থেকে ইসরায়েল গাজায় অবরোধ আরোপ করে।
জাতিসংঘ বলেছে, ১৩ জুলাই পর্যন্ত ৮৭৫ জন মানুষ খাদ্য সংগ্রহের চেষ্টায় নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৬৭৪ জন নিহত হয়েছেন এই নতুন সংস্থার ত্রাণকেন্দ্রগুলোর আশেপাশে। বাকি ২০১ জন নিহত হয়েছেন জাতিসংঘ বা তার অংশীদারদের ত্রাণ বহরের পথে বা তার কাছাকাছি।
অনেক শিশুও পানি সংগ্রহ করতে গিয়ে নিহত হয়েছে।
এই যুদ্ধ শুরু হয় ৭ অক্টোবর ২০২৩ সালে, যখন হামাস দক্ষিণ ইসরায়েলে হামলা চালিয়ে প্রায় ১২০০ জনকে হত্যা করে এবং ২৫১ জনকে অপহরণ করে। এরপর থেকে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৫৮,৮৯৫ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১,৪০,৯৮০ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

