গাজায় চিকিৎসার জন্য লাইনে দাঁড়ানো অবস্থায় ইসরায়েলি হামলায় কমপক্ষে ১০ শিশু নিহত
সামাহ আল-নূরি তার ছেলেকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিচ্ছেন, ইসরায়েলি হামলায় তার মেয়ে সামা নিহত হওয়ার পর। ঘটনাটি ঘটেছে দেইর আল-বালাহর একটি মেডিকেল সেন্টারের সামনে। ছবি: রমজান আবেদ/রয়টার্স
নতুন করে গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের বোমা হামলায় অন্তত ১৫ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ১০ জনই শিশু। তারা সকালের দিকে একটি চিকিৎসা কেন্দ্রের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল, পুষ্টিকর খাবার ও চিকিৎসা নিতে। এই ঘটনা ঘটেছে দেইর আল-বালাহ এলাকায়, যেখানে Project Hope নামে একটি সংস্থা এই সেবা দিয়ে থাকে। এই হামলার পর সংস্থাটি অনির্দিষ্টকালের জন্য তাদের কাজ বন্ধ রেখেছে।
সংস্থার প্রধান রবিহ তোরবাই বলেন, “আজ সকালে নিরীহ পরিবারগুলোকে নির্মমভাবে আঘাত করা হয়েছে। এটা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সরাসরি লঙ্ঘন।”
ইসরায়েলি বাহিনী দাবি করেছে, তারা হামাসের এক সদস্যকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে, যে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামলায় জড়িত ছিল। তারা দুঃখ প্রকাশ করে জানিয়েছে, যারা জড়িত ছিল না তাদের ক্ষতির বিষয়টি তারা খতিয়ে দেখছে।
৩৫ বছর বয়সী মোহাম্মদ আবু ওউদা বলেন, “আমরা কী অপরাধ করেছি? শিশুরা কী অপরাধ করেছে? আমি এক মাকে তার সন্তানের দেহ জড়িয়ে পড়ে থাকতে দেখেছি—তাদের সঙ্গে সঙ্গে মেরে ফেলা হয়েছে।”
গত ২৪ ঘণ্টায় গাজা উপত্যকার বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলি হামলায় আরও অন্তত ৬৭ জন মারা গেছে। শুধু গাজা সিটিতেই আলাদা পাঁচটি হামলায় নিহত হয়েছে ১৫ জন।
হামাস জানিয়েছে, তারা ১০ জন বন্দি মুক্তি দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। এর বদলে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, এই সপ্তাহ বা আগামী সপ্তাহে চুক্তি হওয়ার “ভালো সম্ভাবনা” আছে।
তবে কাতার, যারা যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতা করছে, জানিয়েছে চুক্তি হতে সময় লাগবে। ইসরায়েল চায় যুদ্ধবিরতির পরও তারা গাজায় সামরিক অভিযান চালাতে পারবে। আর হামাস চায় নিশ্চয়তা যে, যুদ্ধবিরতির পর নতুন করে হামলা হবে না।
ওয়াশিংটনে বৃহস্পতিবার বিকেলে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতিতে একমত হলে স্থায়ী যুদ্ধবিরতির আলোচনায় যাবে তারা। তবে তারা চায় হামাসকে নিরস্ত্র করতে হবে এবং তারা যেন গাজার শাসন না করে।
গত মার্চে যুদ্ধবিরতির একটি আগের চুক্তি ভেঙে যায়, কারণ ইসরায়েল চুক্তির দ্বিতীয় ধাপে না গিয়ে আবার হামলা শুরু করে। তাদের দাবি, হামাসকে পুরোপুরি গাজা থেকে সরিয়ে দিতে হবে।
এদিকে বৃহস্পতিবার খান ইউনিসের দক্ষিণ-পশ্চিমে ইসরায়েলি ট্যাংক ও বুলডোজার শরণার্থী শিবিরের দিকে এগিয়ে যায়। গুলি ও টিয়ার গ্যাস ছোড়া হয়। মানুষ শিবির ছেড়ে পালাতে শুরু করে, কারও হাতে তোশক, কারও হাতে হাঁড়ি-পাত্র—চরম গরমের মধ্যে।
খান ইউনিসের নাসের হাসপাতাল, দক্ষিণ গাজার শেষ কয়েকটি কার্যকর হাসপাতালের একটি, জানিয়েছে গত ২৪ ঘণ্টায় অনেক আহত মানুষ এসেছে। একজন চিকিৎসাকর্মী একটি ভিডিও পাঠিয়েছেন, যেখানে দেখা যায় আইসিইউ’র জানালায় ঢুকে যাওয়া গরম গুলির টুকরো।
গত মঙ্গলবার হামাস পাঁচজন ইসরায়েলি সেনাকে মেরে ফেলে, যা এই যুদ্ধে এক ব্যতিক্রমী ঘটনা।
গাজার যুদ্ধ শুরু হয় ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর, হামাস নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী ইসরায়েলে হামলা চালিয়ে ১২০০ জনকে হত্যা করলে। এরপর থেকে ইসরায়েলি হামলায় গাজায় ৫৭ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছে। সেখানে এখন দুর্ভিক্ষের মতো অবস্থা তৈরি হয়েছে, কারণ মানবিক সাহায্য আটকে রাখা হয়েছে।
এখন পর্যন্ত ৫০০-র বেশি ফিলিস্তিনিকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে, যখন তারা খাদ্যসামগ্রীর লাইনে ছিল। এই বিতরণ পরিচালনা করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সমর্থিত Gaza Humanitarian Foundation।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই ফাউন্ডেশনের সমালোচনা করেছে। তারা বলেছে, এই সংস্থাটি যুদ্ধাপরাধে অংশগ্রহণ করছে এবং মানবিক নীতিমালার পরিপন্থী কাজ করছে। সংস্থাটি দাবি করেছে, তারা ৬ কোটি ৯০ লাখ খাবার বিতরণ করেছে এবং অন্য সংস্থাগুলো কেবল দাঁড়িয়ে ছিল যখন তাদের ত্রাণ লুট হয়ে গেছে।
রাফাহতে খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রের কাছে পৌঁছাতে গিয়ে ইসরায়েলি গুলিতে আরও অন্তত তিনজন মারা গেছে, জানিয়েছে এক সিভিল ডিফেন্স কর্মকর্তা।
এটাই গাজার বাস্তবতা। শিশুরা ক্ষুধায় কাঁপে, মানুষ মরছে খাবারের লাইনে। কিন্তু যুদ্ধ থামছে না। শান্তির কথা এখনো কেবল আলোচনায় সীমাবদ্ধ।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

