গাজার খাদ্য সহায়তা কেন্দ্রে যেতে ‘স্কুইড গেম’-এর মতো লড়াই
আহমেদ ড্রেমলি ও ইউসুফ আল-আজউরি
প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৫, ১১:৩৯ এএম
ফিলিস্তিনিরা ৮ জুন ২০২৫ তারিখে গাজার মধ্যাঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত গাজা হিউম্যানিটেরিয়ান ফাউন্ডেশন (GHF) থেকে ত্রাণ সামগ্রী বহন করছে। ছবি: এএফপি/ইয়াদ বাবা
আমার নাম ইউসুফ আল-আজউরি। বয়স ৪০ বছর। আমি গাজার আল-সরায়া এলাকায় একটি তাঁবুতে থাকি। স্ত্রী, সাত সন্তান, মা-বাবাকে নিয়ে একসঙ্গে এই তাঁবুতে থাকি। আমাদের আসল বাড়ি ছিল জাবালিয়ার শরণার্থী ক্যাম্পে। ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় ২০২৩ সালের অক্টোবরে সেই ঘর ধ্বংস হয়ে গেছে।
আমার আগে ট্যাক্সিচালকের কাজ ছিল। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর জ্বালানির সংকট এবং অবরোধের কারণে চালানো বন্ধ হয়ে যায়। ঘরে খাবার ফুরিয়ে গেছে। এখন শুধু লেন্টিল স্যুপ দিয়ে চ্যারিটি কিচেনের খাবার চলে। এটা শিশুদের ক্ষুধা মেটাতে যথেষ্ট নয়।
দীর্ঘদিন সাহায্য আনতে যাইনি। কিন্তু এবার ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে না পেরে সিদ্ধান্ত নিলাম — যেভাবেই হোক খাদ্য সহায়তা আনতে হবে।
১৮ জুন রাত ৯টার দিকে পাশের তাঁবুর পুরুষরা সহায়তা কেন্দ্রে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। আমি আমার প্রতিবেশী খালিল হাল্লাসকে (৩৫) বললাম, আমি যাব। তিনি বললেন, ঢিলে কাপড় পরো, যাতে দৌড়াতে পারো। একটা বস্তা নিয়েও যেতে বললেন, যাতে ক্যানজাত খাবার ভরা যায়। আসলে অত ভিড়ে কারও পক্ষে বড় বাক্স বহন করা সম্ভব নয়।
স্ত্রী আসমা (৩৬) আর মেয়ে দুআ (১৩) বলল, তারাও যেতে চায়। আমি বললাম, মেয়েদের জন্য এই পথ আরও বিপদজনক।
আমি, খালিল এবং আরও চারজন একসঙ্গে রওনা হলাম। কারও কেউ শিক্ষক, কেউ প্রকৌশলী। প্রথমবার যাওয়া লোকও ছিল আমাদের দলে। আমরা একটি টুকটুকে করে যাই — গাজার দক্ষিণে এটিই প্রধান যানবাহন। মোট ১৭ জন ছিল। শিশুও ছিল, ১০ ও ১২ বছরের।
একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি বললেন, সরকারি নির্ধারিত রুট ব্যবহার না করতে। সেখানে ভিড় বেশি, সহায়তা মেলে না। আমরা বিকল্প পথে হেঁটে সালাহউদ্দিন রোডের দিকে যাই। রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে আমাদের প্রায় এক কিলোমিটার যেতে হয়। পুরোটা পথে অন্ধকার। আলো ব্যবহার করিনি, স্নাইপারের নজর পড়ার ভয়ে।
আমরা মাটিতে হামাগুড়ি দিয়ে খোলা অংশ পার হই। আশেপাশে অনেক নারী, বৃদ্ধও আমাদের মতোই ঝুঁকিপূর্ণ পথে হাঁটছিলেন।
একপর্যায়ে চারদিকে গুলি চলতে থাকে। আমরা ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি ভবনের আড়ালে লুকাই। একজন তরুণ মোবাইলে আলো জ্বালিয়ে পথ দেখাচ্ছিল। সবাই চিৎকার করে বন্ধ করতে বলল। সে শোনেনি। কিছু সেকেন্ড পরেই তাকে গুলি করা হয়। সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। আমরা কেউ তাকে সাহায্য করতে পারিনি।
রাত প্রায় ২টা বাজে। তখনই সহায়তা কেন্দ্রে প্রবেশ করার অনুমতি দেওয়া হয়। দূর থেকে সবুজ আলো জ্বলে উঠল। সবাই দৌড়াতে শুরু করল। কিন্তু সামনে গিয়ে দেখি, আমার আগেই হাজারো লোক হাজির। ভেতরে প্রবেশ অসম্ভব। আমি জুতা খুলে ব্যাগে রাখি এবং ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করি।
এক পর্যায়ে দেখি একজন মেয়ে মানুষের পায়ে পিষ্ট হয়ে শ্বাসরোধ হচ্ছে। আমি তার হাত ধরে টেনে তুলি। পরে একটা চালের বস্তা ধরতে চাইলাম, সঙ্গে সঙ্গে কেউ ছিনিয়ে নেয়। কেউ কেউ বলছিল, ভাগ করে খেতে—but কেউ কাউকে কিছু দেয়নি।
বেশিরভাগ লোকই কিছু পায়নি। আমি কোনো রকমে চার ক্যান বিনস, এক কেজি বুলগুর আর আধা কেজি পাস্তা পাই।
দূরে দেখি, ১০-২০ মিটার দূরে ইসরায়েলি সৈন্যরা দাঁড়িয়ে। কেউ ফোনে ছবি তুলছে, কেউ বন্দুক তাক করে আছে। মনে হলো, তারা আমাদের এই লড়াই-হত্যা দেখে মজা পাচ্ছে। এটা যেন টিভি সিরিজ স্কুইড গেম এর মতো। যেখানে মানুষের মৃত্যু এক খেলা।
যখন সব বক্স খালি হয়ে গেল, লাল ধোঁয়া ছোড়া হয়। বুঝতে পারি, এখন এলাকা ছাড়তে হবে। এর পরপরই গুলি শুরু হয়।
আমরা নুসেইরাতের আল-আওদা হাসপাতালে যাই। আমাদের এক বন্ধু ওয়ায়েলের হাতে আঘাত লেগেছিল। হাসপাতালে গিয়ে দেখি, অন্তত ৩৫ জনের মরদেহ মেঝেতে পড়ে আছে। সবাই গুলিবিদ্ধ, কেউ মাথায়, কেউ বুকে।
ওরা সবাই খাবারের জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছিল। কেউ ফিরে যায়নি—খালি পেটে অপেক্ষা করা মানুষগুলো এখন মৃতদেহ।
আমি বাড়ি ফিরি সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে। স্ত্রী-সন্তান অপেক্ষা করছিল। হাতে খাবার খুব কম। তাদের চোখে হতাশা। তারা না খেয়ে ছিল।
এটা আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন দিন। এত অপমান, এত ভয় আমি আগে কখনও পাইনি। এখন মনে করি, যুদ্ধ চলুক, তাও যেন খাদ্য নিরাপদে পৌঁছায়।
আমার ছেলে ইউসুফ তিন বছর বয়সী। সে ক্ষুধায় কাঁদে, খেতে চায়। কিছু না পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে চুপ হয়ে যায়। আমি একবেলা খাই, অনেক দিন খাই না, যাতে ওরা খেতে পারে। এটা কোনো জীবন নয়—এটা ধীরে ধীরে মরে যাওয়ার নাম।
[মিডল ইস্ট আই ডটনেট থেকে অনুবাদ]
আহমেদ ড্রেমলি: গাজার সাংবাদিক। তাঁর লেখালেখি ফিলিস্তিনি জনগণের জীবন, সংগ্রাম ও বাস্তবতা কেন্দ্রিক। তিনি দীর্ঘদিন ধরে গাজার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরছেন।
