চীন-বাংলাদেশ যৌথ সামরিক মহড়ায় পাল্টে যাবে ভূ-রাজনৈতিক চিত্র
বাংলাদেশ ও চীনের পতাকা। ছবি: সংগৃহীত
খুব শিগগিরই প্রথমবারের মতো চীন-বাংলাদেশ যৌথ সামরিক মহড়া অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। চলতি মে মাসেই এই মহড়া হবে বলে চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। সংবাদমাধ্যম দ্য ডিপ্লোমেটের এক প্রতিবেদনে এই মহড়াকে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক চিত্র পাল্টে যাওয়ার ইঙ্গিত বলে উল্লেখ করেছে।
গত ২৪ এপ্রিল চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জ্যেষ্ঠ কর্নেল ও কিয়ান বেইজিংয়ে ‘চায়না-বাংলাদেশ গোল্ডেন ফ্রেন্ডশিপ-২০২৪’ শীর্ষক এই যৌথ মহড়ার ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান’ এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশে এই যৌথ মহড়া অনুষ্ঠিত হবে। মহড়ায় দুই পক্ষ বাস থেকে জিম্মিদের উদ্ধার এবং সন্ত্রাসীদের আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়া অনুশীলন করবে।
বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের গভীর অর্থনৈকি সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রকল্পে ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করেছে বেইজিং। যা পাকিস্তানের পর দক্ষিণ এশিয়ায় দেশটির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিনিয়োগ।
বাংলাদেশে সেতু, সড়ক, রেল লাইন, বিমানবন্দর ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো অবকাঠামোগত নির্মাণে দেশটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ২০০৯-১০ সালে ৩ দশমিক ৩ বিলয়ন ডলার ছিল। ২০২১-২২ সালে তা বেড়ে ২০ বিলয়ন ডলারে বেশি হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, চীনে বিভিন্ন ধরনের পণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশ শুল্ক মুক্ত সুবিধা পায়।
এ ছাড়াও বাংলাদেশের খুব গুরুত্বপূর্ণ সামরিক মিত্র হয়ে উঠেছে চীন। ২০১৬ সালে চীন সংস্কার করা দুটি সাবমেরিন ছাড়মূল্যে ২০৫ মিলিয়ন ডলারে বাংলাদেশকে দিয়েছে।
এদিকে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত বছর বঙ্গোপসাগরের কক্সবাজার উপকূলে ১ দশমিক ২১ বিলয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত চীন ভিত্তিক একটি সাবমেরিন ঘাঁটি উদ্বোধন করেন। এই ঘাঁটিতে একসঙ্গে ছয়টি সাবমেরিন ও আটটি যুদ্ধ জাহাজ রাখা যাবে।
বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বেশ জোরদার করেছে চীন। বিশেষ করে ২০০২ সালের সামরিক সহযোহিতা চুক্তির আওতায় নৌ সহযোগিতা, সামরিক প্রশিক্ষণ ও প্রতিরক্ষা সরবরাহ করছে দেশটি।
আসন্ন যৌথ সামরিক মহড়া ওই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও জোরদার করবে। চীনের সামরিক কৌশলে আন্তর্জাতিক যৌথ সামরিক মহড়ায় অংশগ্রহণকে বিদেশে সামরিক শক্তি ব্যবহারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বিবেচনা করা হয়। সামরিক কৌশলবিদরা একে ‘যুদ্ধবহির্ভূত সামরিক অভিযান’ তকমা দিয়ে থাকেন।
অন্যদিকে, প্রতিবেশী দেশ ভারত বলছে চীন-বাংলাদেশের এই যৌথ সামরিক মহড়া দেশটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। এক সংবাদ সম্মেলনে অনুষ্ঠিতব্য সিনো-বাংলাদেশি যৌথ সামরিক এ মহড়ার ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, আমাদের আশপাশে এবং বাইরের যেসব ঘটনা আমাদের স্বার্থ, অর্থনীতি এবং নিরাপত্তা স্বার্থকে প্রভাবিত করে সেগুলোতে আমরা গভীর নজর রাখি এবং সেই অনুযায়ী উপযুক্ত পদক্ষেপ নিই।
যদিও ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ১১টি যৌথ সামরিক মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে। তারপরও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে এই সিনো-বাংলাদেশি মহড়ার প্রভাব নিয়ে বেশ উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তবে কি বাংলাদেশ ধীরে ধীরে ভারত থেকে সরে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়তে চাইছে? সিনো-ইন্ডিয়ান উত্তেজনার শিকার কি বাংলাদেশ হবে?
দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার ইতিহাস ও রাজনীতিক নিয়ে গবেষণা করা আলতাফ পারভেজ দ্য ডিপ্লোমেটকে বলেন, এই মহড়ার মাধ্যমে চীন-ভারতের স্নায়ু যুদ্ধে বাংলাদেশকে টানা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ভারত সরকার দীর্ঘ দিন ধরে পাকিস্তানকে শত্রু হিসেবে দেখছে। চীনকে তারা এখন একই চোখে দেখছে। দক্ষিণ এশিয়ায় চীন সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর চেষ্টা করছে উল্লেখ করে আলতাফ পারভেজ বলেন, এতে বাংলাদেশের ওপর আরও নজর দিতে ভারতকে চাপ দেবে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র ওই শক্রতাভাবাপন্নতায় হাওয়া দিচ্ছে।
তার মত, উন্নয়নশীল ছোট দেশ হিসেবে বাংলাদেশের এই সামরিক মহড়ায় অংশ নেওয়া উচিত নয় এবং এই ধরনের সামরিকীকরণও প্রয়োজন নেই। এটি সব পক্ষকেই বিপদে ফেলবে।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের গভীর সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। যদিও কিছু বিষয় নিয়ে দেশ দুটির মধ্যে বিবাদও রয়েছে। এর মধ্যে সমচেয়ে পুরাতন হলো পানি বণ্টন নিয়ে দ্বন্দ্ব। এছাড়াও দেশ দুটির মধ্যকার বাণিজ্যও ভারসাম্যহীন। মূলত বাণিজ্যে ভারতই সুবিধা পাচ্ছে। এর মাধ্যমে রুপিকে বৈশ্বিক করে তোলার ভারতের দীর্ঘদিনের স্বপ্নকে এগিয়ে নিতে চায় দেশটি। কিন্তু বাংলাদেশ এই বাণিজ্য থেকে তেমন কিছু পায় না।
এছাড়া সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীর (বিএসএফ) হাতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি নিহতের ঘটনা নিয়েও প্রশ্ন আছে। সীমান্তের এই হত্যা ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তকে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সীমান্তের উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষীরা ভারতীয় নাগরিক হত্যা করেছে এমন কোনো খবর চোখে পড়ে না। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক যখন ক্রমশ মজবুত হচ্ছে, তখন বাংলাদেশে ভারতের ভূমিকা নিয়ে প্রায়শই সমালোচনা হচ্ছে।
বাংলাদেশ জুড়ে চীনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। চীন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং অবকাঠামোগত প্রকল্পে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। অন্যদিকে ভারত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যথেষ্ট প্রভাব ফেলছে। আর এই প্রভাবই বাংলাদেশে নীরবে ‘বয়কট ইন্ডিয়া’ আন্দোলন ছড়িয়ে দিচ্ছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে সমর্থন দেওয়ায় ভারতকে অভিযুক্ত করছে বাংলাদেশের প্রধান বিরোধীদল বিএনপি। চলতি বছরের ৭ জানুয়ারির বিতর্কিত সাধারণ নির্বাচনের পর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত ওই নির্বাচনকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে। এমনকি দেশটি আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য পশ্চিমা শক্তির সঙ্গে চুক্তিও করেছে। এই নির্বাচেনে বিএনপিসহ বেশকয়েকটি বিরোধী রাজনৈতিক দল অংশ নেয়নি।
এদিকে, ২০১৭ সালের পর থেকে মিয়ানমারের প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা জীবন বাঁচাতে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। তাদেরকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে চীন সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। যদিও বিষয়টি এখনো সুরাহা হয়নি। বাংলাদেশ হয়তো এই যৌথ মহড়ায় অংশগ্রহণ করে বিষয়টি চীনের সঙ্গে আলোচনা করতে চায়।
যদিও বাংলাদেশকে দেওয়া চীনের সাবমেরিন ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম তাৎক্ষণিকভাবে ভারতের নিরাপত্তার জন্য কোনো হুমকি তৈরি করে না, কিন্তু এটি বাংলাদেশের ওপর চীনের প্রভাবকে শক্তিশালী করে এবং খুব সম্ভবত ভারতের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলেও প্রভাব ফেলে।
কলিঙ্গা ইনস্টিটিউট অব ইন্দো-প্যাসিফিক স্টাডিজের (কেআইআইপিএস) সম্মানিত পরিচালক মনীশ তোরাংবামের মতে, বঙ্গোপসাগর ঘিরে যে ভূ-রাজনীতি দাঁড়াচ্ছে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশে আছে বাংলাদেশ। এটি কেবল ভারত-চীন শক্তি দেখানোর জায়গায়ই না, বরং বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে মার্কিন-চীন প্রতিযোগিতার মঞ্চও।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, কথিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বিরোধী এই চীন-বাংলাদেশ যৌথ সামরিক মহড়া তাৎক্ষণিকভাবে হয়তো নয়াদিল্লিকে বিচলিত করবে না। তবে বহুমুখী দক্ষিণ এশিয়া নির্মাণে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে এবং দেশটি এই অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের মধ্যেই প্রতিবেশীর সঙ্গে পরামর্শমূলক অংশীদারিত্বে বিশ্বাস করে।
তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের দেশ বাংলাদেশেরও স্পষ্টতই উন্নয়ন এবং অবকাঠামোগত সহায়তা প্রয়োজন। দেশটিতে চীনের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা সাধারণ বাস্তবতা যা ভারতের মাথায় রাখা উচিত।
চীন-বাংলাদেশ যৌথ সামরিক মহড়ার এ ঘোষণা আঞ্চলিক রাজনীতিতে বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশে চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পৃক্ততায় ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে এর প্রভাব কতটুকু তা নিয়ে প্রশ্ন উঠে। একইভাবে তা এই অঞ্চলের বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতির ওপর কতটুকু প্রভাব ফেলবে সে প্রশ্নও উঠে।
যদিও বাংলাদেশে ভারতের বড় ধরনের প্রভাব আছে। তারপরও বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও অবকাঠামোতে চীনের ক্রমবর্ধমান সম্পৃক্ততা এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতির চিত্র যে বদলে যাচ্ছে তারই ইঙ্গিত বহন করে। চীন ও ভারত নিজেদের মধ্যে এই প্রভাব বিস্তার নিয়ে লড়াই করছে। এই ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মাঝে বাংলাদেশ আটকে যেতে পারে।

