Logo
Logo
×

রাজনীতি

আল–জাজিরার প্রতিবেদন

কর্মসংস্থান, নগদ সহায়তা ও ঋণের প্রতিশ্রুতি: দলগুলো কি পূরণ করতে পারবে

Icon

প্রকাশ: ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৫:০৮ পিএম

কর্মসংস্থান, নগদ সহায়তা ও ঋণের প্রতিশ্রুতি: দলগুলো কি পূরণ করতে পারবে

মোহাইমিনুল রাফি (২৭) বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।  তাঁর ভাষায়, ‘নিরাপদ জীবনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পথ’ হলো প্রথম শ্রেণির সরকারি চাকরি। দেশজুড়ে যখন নির্বাচনী প্রচার তুঙ্গে, তখন রাফির মতো তরুণদের লক্ষ্য করেই রাজনৈতিক দলগুলো দিচ্ছে নানা প্রতিশ্রুতি—বেকারদের জন্য নগদ সহায়তা, সুদমুক্ত ঋণ এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির ঘোষণা।

বেকার স্নাতকদের জন্য নগদ সহায়তা বা সুদমুক্ত ঋণের প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে রাফি হেসে বলেন, ‘অবশ্যই এতে উপকার হবে।’ তবে একটু থেমে যোগ করেন, ‘কিন্তু সত্যি বলতে কি, সবচেয়ে দরকার সুস্থ চাকরিবাজার আর মেধাভিত্তিক নিয়োগ।’

রাফি ছিলেন ২০২৪ সালে সরকারি চাকরির কোটাব্যবস্থাকে অন্যায্য মনে করে শুরু হওয়া আন্দোলনের একজন সক্রিয় অংশগ্রহণকারী। সেই আন্দোলনই পরে দেশব্যাপী গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয় এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে। এই প্রেক্ষাপটে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

আওয়ামী লীগ বাইরে, লড়াই বিএনপি–জামায়াত জোটে

নির্বাচনে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ অংশ নিতে না পারায় মূল লড়াই হবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে। জামায়াতের জোটে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান থেকে জন্ম নেওয়া জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) তুলনামূলক কিছু উদার রাজনৈতিক শক্তিও যুক্ত হয়েছে।

উভয় জোটের শীর্ষ নেতারা সভা-সমাবেশ, গণসংযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সব জায়গায় একই সুরে কথা বলছেন: চাকরি, দ্রব্যমূল্যের চাপ কমানো, করছাড়, দুর্নীতি ও বৈষম্যের অবসান।

তবে বিশ্লেষক ও ভোটারদের মতে, মানুষের গভীর উদ্বেগের জায়গায় এসব প্রতিশ্রুতি আঘাত করলেও বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় যেকোনো সরকারের পক্ষেই সেগুলোর বড় অংশ বাস্তবায়ন করা কঠিন।

রাফি বলেন, ‘সবাই এমনভাবে চাকরি আর সামাজিক নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, যেন এক রাতেই সুইচ টিপে চালু করা যাবে।’

চাপে অর্থনীতি, কঠিন বাস্তবতা

এই প্রতিশ্রুতিগুলো আসছে এমন এক সময়ে, যখন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪ থেকে ৫ শতাংশে। অথচ করোনা মহামারির আগে ২০১৯ সালে প্রবৃদ্ধি ছিল ৮ শতাংশের বেশি।

একই সঙ্গে খাদ্য ও সার্বিক মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ একক অঙ্কে রয়ে গেছে। ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে, বাড়ছে জীবনযাত্রার ব্যয়।

বেসরকারি বিনিয়োগ দীর্ঘদিন ধরে জিডিপির ২২–২৩ শতাংশে স্থবির। কর–জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে, যেখানে ভারতে প্রায় ১২ শতাংশ এবং পাকিস্তানে ১০ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, মৌলিক সেবা টেকসই রাখতে এই অনুপাত অন্তত ১৫ শতাংশ হওয়া প্রয়োজন।

ঢাকাভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ও অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, শেখ হাসিনার পতনের পর নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ‘সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকে কিছুটা তাৎক্ষণিক স্থিতিশীলতা’ আনতে পেরেছে।

তবে তাঁর মতে, সরকার ‘পরিবার পর্যায়ের অর্থনৈতিক দুরবস্থা এবং অর্থনীতিকে চাঙা করতে ব্যবসায়ী সমাজের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ গড়ে তুলতে ভয়াবহভাবে উদাসীন থেকেছে।’

হোসেন জিল্লুর বলেন, ‘বর্তমান বাস্তবতা চিহ্নিত হচ্ছে স্থায়ী মূল্যস্ফীতি, নতুন করে দারিদ্র্যে পতন, কর্মসংস্থানের সংকট ও স্থবির মজুরিতে। সরকার ব্যবসায়িক আস্থা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে—এ কারণেই বিনিয়োগ স্থবির।’

তিনি আরও বলেন, নির্বাচন অনিশ্চয়তা কমাতে পারে, তবে ‘নির্বাচন কোনো নাটকীয় উন্নতি আনবে—এমন আশা বাস্তবসম্মত নয়।’

বিএনপির ‘ফ্যামিলি কার্ড’

এই বাস্তবতায় বিএনপি ও জামায়াত—উভয় দলই সামাজিক সুরক্ষা ও কর্মসংস্থানের নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। যদিও আনুষ্ঠানিক ইশতেহার প্রকাশ হয়নি, ঢাকায় সাম্প্রতিক বড় সমাবেশে ঘোষিত নীতিগুলোই প্রচারের ভিত্তি।

বিএনপির প্রধান প্রতিশ্রুতি হলো ‘ফ্যামিলি কার্ড’। প্রতিটি পরিবারের একজন নারীর নামে এই কার্ড দেওয়া হবে। প্রাথমিকভাবে ৪০ লাখ পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হচ্ছে। এর মাধ্যমে মাসে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা নগদ অর্থ অথবা চাল, ডাল, তেল, লবণসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সমমূল্যের প্যাকেজ দেওয়া হবে।

বিএনপির নেতা ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে মানুষের ওপর বিনিয়োগ করবে। পাশাপাশি কারিগর, তাঁতি ও ক্ষুদ্র শিল্পকে ঋণ সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশে সহযোগিতা দেওয়া হবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সমস্যাটি মূলত পরিসর ও বাস্তবায়নে। বাংলাদেশ বর্তমানে সামাজিক সুরক্ষায় বছরে প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে, যা জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ। বিএনপির ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি সারা দেশে বাস্তবায়ন করতে বছরে আনুমানিক ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন—অর্থাৎ ব্যয় কার্যত দ্বিগুণ হবে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘জিডিপির মাত্র ২ শতাংশ দিয়ে মানসম্মত সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।’

হোসেন জিল্লুর রহমানের মতে, সামাজিক সুরক্ষা প্রতিশ্রুতিই দলগুলোর জন্য ‘অগ্নিপরীক্ষা’। শুধু বাজেট বাড়ালেই হবে না, লিকেজ রোধ ও সঠিক মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছানোই বড় চ্যালেঞ্জ।

জামায়াতের ‘স্মার্ট সামাজিক নিরাপত্তা কার্ড’

জামায়াতের মূল প্রস্তাব হলো ‘স্মার্ট সামাজিক নিরাপত্তা কার্ড’। এর মাধ্যমে জাতীয় পরিচয়পত্র, স্বাস্থ্যসেবা, কর এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলো একীভূত করা হবে।

এই পরিকল্পনায় যুক্ত সোয়ানজি ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মোকররম হোসেন বলেন, জামায়াতের লক্ষ্য ‘সুশাসন এবং দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিতে শূন্য সহনশীলতা’। তাঁর মতে, এটি নগদ টোকেন নয়; বরং সুবিধা বণ্টনের ঝক্কি কমানোর একটি সমন্বিত পদ্ধতি।

সিপিডির তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, রাজস্ব আদায় না বাড়লে এসব দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হবে। দলগুলোকে অর্থায়ন, সময়সীমা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিয়ে স্পষ্ট হতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বিগড গবেষক আসিফ শাহান বলেন, এসব প্রতিশ্রুতি জনপ্রিয় হওয়ার কারণ হলো—মানুষ জটিল বার্তা পছন্দ করে না। ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বা ‘সামাজিক নিরাপত্তা কার্ড’ সহজ ও স্মরণযোগ্য। তবে ভোটাররা দেখছেন, সুবিধা সবার জন্য নাকি দলীয় অনুসারীদের জন্য।

তরুণ ভোটার, চাকরি ও শিক্ষা

বাংলাদেশের ১২ কোটি ৭০ লাখ ভোটারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তরুণ। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে কলেজ-শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্ব ছিল ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ—প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার স্নাতক কর্মহীন। সামগ্রিক বেকারত্ব ৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ।

বিএনপি ১৮ মাসে ১ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ‘শিক্ষিত বেকারদের’ চাকরি না পাওয়া পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা ও মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগের অঙ্গীকার করেছে। ডিজিটাল অর্থনীতিতে ৮ লাখ আইটি চাকরি এবং পেপ্যালসহ আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ে চালুর কথাও বলছে দলটি।

অন্যদিকে জামায়াত পাঁচ বছরে এক কোটি তরুণকে প্রশিক্ষণ, প্রতিটি উপজেলায় ‘ইয়ুথ টেক ল্যাব’, জেলা পর্যায়ে ‘জব ব্যাংক’, ৫০ লাখ চাকরি সংযোগ, ৫ লাখ উদ্যোক্তা ও ১৫ লাখ ফ্রিল্যান্সার তৈরির ঘোষণা দিয়েছে। বেকার স্নাতকদের জন্য সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত মাসে ১০ হাজার টাকা সুদমুক্ত ঋণের প্রস্তাবও রয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব লক্ষ্য অর্জনে ৮–১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ও ব্যাপক বিনিয়োগ প্রয়োজন। হোসেন জিল্লুর বলেন, সুদমুক্ত ঋণ জনপ্রিয়তাবাদী হলেও কার্যকর সমাধান নয়—মূল বিষয় দক্ষতা ও বাস্তব চাকরি সৃষ্টি।

করছাড়, কৃষি ও স্বাস্থ্য

জামায়াত করপোরেট কর ১৯ শতাংশ ও ভ্যাট ১০ শতাংশে নামানোর প্রস্তাব দিয়েছে।  বিএনপি নির্দিষ্ট হার না জানালেও ব্যবসাবান্ধব সংস্কারের কথা বলছে।

জামায়াত শিল্প খাতে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির দাম তিন বছর স্থির রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে—যাকে হোসেন জিল্লুর সবচেয়ে বাস্তবসম্মত প্রস্তাবগুলোর একটি বলে মনে করেন।

কৃষিতে বিএনপি ‘ফার্মার কার্ড’ এবং জামায়াত সুদমুক্ত ঋণের কথা বলছে। স্বাস্থ্য খাতে বিএনপি ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। জামায়াত বলছে, প্রবীণ ও শিশুদের জন্য বিনা খরচে চিকিৎসা এবং ৬৪ জেলায় বিশেষায়িত হাসপাতাল গড়া হবে।

সব মিলিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—নতুন সরকার কতটা চাপ না বাড়িয়ে এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে পারবে।

চাকরিপ্রার্থী রাফির কথায়, ‘প্রতিশ্রুতি দেওয়া সহজ। কিন্তু ব্যবসায় চাঁদাবাজি আর চাকরিতে ঘুষের সংস্কৃতি না বদলালে আমরা আবার আগের জায়গাতেই ফিরে যাব।’

Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন