গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন
ভারতে বসে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফেরার ছক কষছেন আ.লীগের নেতারা
প্রকাশ: ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:০১ পিএম
বাংলাদেশে তাঁরা অপরাধী ও পলাতক হিসেবে বিবেচিত। মানবতাবিরোধী অপরাধ, হত্যা, রাষ্ট্রদ্রোহ ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে অনেকের বিরুদ্ধে মামলা চলছে। অথচ ভারতের কলকাতার শপিং মলের জনাকীর্ণ ফুড কোর্টে বসে ব্ল্যাক কফি আর ভারতীয় ফাস্ট ফুড খেতে খেতে আওয়ামী লীগের নির্বাসিত নেতারা রাজনীতিতে ফেরার ছক কষছেন।
১৬ মাসের বেশি সময় আগে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এক অভ্যুত্থান তাঁকে নাটকীয়ভাবে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে। ক্ষুব্ধ বিক্ষোভকারীদের স্রোত তাঁর বাসভবনের দিকে এগিয়ে আসার সময় তিনি হেলিকপ্টারে করে ভারতের উদ্দেশে রওনা হন। পেছনে ফেলে যাওয়া রাজধানীর রাস্তাগুলো তখন রক্তে রঞ্জিত ছিল।
জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে বিক্ষোভকারীদের ওপর শেখ হাসিনার সরকারের দমন-পীড়নে আনুমানিক ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হন। এ ঘটনার পর আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতা-কর্মী দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। শেখ হাসিনার শাসনামলে সংঘটিত অপরাধ ও ‘মব ভায়োলেন্সে’ জড়িত থাকার অভিযোগে তাঁদের বিরুদ্ধে ক্রমেই বাড়ছে ফৌজদারি মামলা।
আওয়ামী লীগের ছয় শতাধিক নেতা-কর্মী বর্তমানে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী ভারতের শহর কলকাতায় আশ্রয় নিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে আত্মগোপনে থাকা এসব নেতা-কর্মীর কাছে দলীয় কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার জন্য ভারতই হয়ে উঠেছে প্রধান অবলম্বন।
গত বছরের মে মাসে জনমতের চাপে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করে। নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন স্থগিত করে। একই সঙ্গে হত্যা, দুর্নীতি ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচার শুরু হয়। হাসিনার পতনের পর প্রথমবারের মতো আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনেও দলটির প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
গত বছরের শেষের দিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে তাঁর শাসনামলের শেষ পর্যায়ে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেন। তবে এই রায়কে ‘মিথ্যা’ আখ্যা দিয়ে শেখ হাসিনা তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং ভারত থেকে প্রত্যাবর্তনের পরিকল্পনা করছেন বলে দাবি করেন। এমনকি আসন্ন নির্বাচন ব্যাহত করতে হাজার হাজার সমর্থক সংগঠিত করার কথাও উঠে এসেছে।
ভারতের রাজধানী দিল্লির এক সুরক্ষিত ও গোপন আস্তানা থেকে শেখ হাসিনা নিয়মিত বাংলাদেশে থাকা নেতা-কর্মীদের সঙ্গে ফোনালাপ ও দলীয় সভা করছেন। তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ভারত সরকারের সতর্ক নজরদারির মধ্যেই পরিচালিত হচ্ছে বলে জানা গেছে। ক্ষমতায় থাকাকালে ভারত ছিল শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ মিত্র। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তাঁকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানানো হলেও ভারত তা উপেক্ষা করেছে।
গত এক বছরে সাবেক সংসদ সদস্য, মন্ত্রিসভার সদস্যসহ দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের দলীয় কৌশল নির্ধারণে কলকাতা থেকে দিল্লিতে ডেকে পাঠানো হয়েছে নিয়মিত। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন নিষিদ্ধ সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন।
সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা নিয়মিত আমাদের কর্মী-সমর্থক, তৃণমূল নেতা ও পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। ভবিষ্যতের সংগ্রামের জন্য তিনি দলকে প্রস্তুত করছেন।’
অন্তর্বর্তী সরকার ছাত্রলীগকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের একাধিক অভিযোগ রয়েছে, যা তিনি অস্বীকার করেছেন। তাঁর ভাষ্য, ‘তিনি (শেখ হাসিনা) কখনো কখনো দিনে ১৫–১৬ ঘণ্টা ফোন কল ও বৈঠকে ব্যস্ত থাকেন। তিনি খুবই আশাবাদী। আমরা বিশ্বাস করি, শেখ হাসিনা বীরের বেশে ফিরবেন।’
শেখ হাসিনার শাসনামলে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ দুটি নির্বাচন ব্যাপক ভোট কারচুপির অভিযোগে বিতর্কিত ছিল। শান্তিতে নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার বলছে, ফেব্রুয়ারির নির্বাচন হবে এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে প্রথম অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন।
তবে আওয়ামী লীগের দাবি, তাদের নির্বাচনে অংশ নিতে না দেওয়া গণতান্ত্রিক বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। দলটির অভিযোগ, শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে অধ্যাপক ইউনূস প্রতিহিংসাপরায়ণ ভূমিকা নিচ্ছেন। ইউনূস এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
শেখ হাসিনার সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, যাঁর বিরুদ্ধেও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ রয়েছে, তিরি বলেন, ‘আমরা আমাদের কর্মীদের নির্বাচন বর্জন করতে বলছি এবং এই প্রহসনের অংশ না হতে নির্দেশ দিচ্ছি।’
মানবাধিকার সংস্থা ও জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার সরকার বিরোধী মত দমনে নিয়মিত গুম, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। সংবাদমাধ্যম ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব করা হয় এবং নির্বাচনগুলোকে সাজানো প্রহসনে পরিণত করা হয়েছিল।
অন্যদিকে, অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধেও সাংবাদিক নিপীড়ন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ব্যর্থতা এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতির অভিযোগ উঠেছে। শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া ট্রাইব্যুনাল আন্তর্জাতিক মান না মানার অভিযোগেও সমালোচিত হয়েছে।
হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশজুড়ে ‘মব ভায়োলেন্স’ ছড়িয়ে পড়ে, যাকে অনেক ক্ষেত্রে প্রতিশোধ হিসেবে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। আওয়ামী লীগের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তাদের শত শত কর্মীকে হত্যা, হামলা বা বিনা বিচারে কারাগারে পাঠিয়েছে।
সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘আমরা ভয়ে কলকাতায় নেই। দেশে ফিরলে আমাদের হত্যা করা হবে।’
কলকাতা ও দিল্লিতে আওয়ামী লীগের সক্রিয় উপস্থিতি ভারতের জন্য নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। ভারতের মাটিতে একটি নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড ও বাংলাদেশের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ পলাতকদের আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টি কূটনৈতিক অস্বস্তি বাড়াচ্ছে।
সম্প্রতি দিল্লিতে শেখ হাসিনার প্রকাশ্য ভাষণ এবং গোপন আবাসন থেকে প্রচারিত অডিও বার্তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একে ‘বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারের প্রতি অবমাননা’ বলে উল্লেখ করে। ভারত সরকার এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
কলকাতায় অবস্থানরত আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে অনুশোচনা খুব কমই দেখা গেছে। অনেকেই গণ-অভ্যুত্থানকে জনগণের বিদ্রোহ না বলে ‘রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র’ হিসেবে বর্ণনা করছেন।
দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, ‘ওটা কোনো স্বতঃস্ফূর্ত বিপ্লব ছিল না, এটি ছিল সন্ত্রাসীদের ক্ষমতা দখল।’
২০২৪ সালের আগস্ট থেকে কলকাতায় থাকা সাবেক সংসদ সদস্য তানভীর শাকিল জয় কিছুটা ভিন্ন সুরে বলেন, আমরা সাধু ছিলাম না, কর্তৃত্ববাদী ছিলাম। ২০১৮ সালের নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি—এটা দুর্ভাগ্যজনক।
তিনি দুর্নীতির কথাও স্বীকার করেন, তবে ২০০ বিলিয়ন ডলার পাচারের অভিযোগ অস্বীকার করেন।
সব মিলিয়ে নির্বাসিত আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রত্যাবর্তনের আশা এখন নির্ভর করছে আসন্ন নির্বাচনের ব্যর্থতার ওপর। তাঁদের বিশ্বাস—বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হবে না, এবং একসময় আবার বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রে ফিরবে আওয়ামী লীগ।
