দ্য স্ক্রলের প্রতিবেদন
কলকাতা থেকে আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে ফেরার পরিকল্পনা করছে যেভাবে
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে পতন হয় আওয়ামী লীগ সরকারের। সেদিনই পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন শেখ হাসিনা। তবে দীর্ঘদিন দেশে লুকিয়ে থাকার পর ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে পালিয়ে ভারতে যান সিরাজগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য হাবিবে মিল্লাত। বর্তমানে আওয়ামী নেতারা কলকাতার ক্যাফেতে ঘন ঘন একে অপরের সাথে দেখা করেছেন। তারা নিয়মিত বাংলাদেশে থাকা দলীয় কর্মীদের সাথে ভার্চুয়াল আলোচনা করেছেনও। নানাভাবে করছেন দেশে ফেরার পরিকল্পনা। ভারতের অনলাইন স্ক্রল এ নিয়ে একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ছাত্র বিপ্লব ঢাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার পর কীভাবে ২০২৪ সালের অক্টোবরে পালিয়ে যেতে হয়েছিল সে কথা স্মরণ হাবিবে মিল্লাত মাথা ঝাঁকিয়ে বিরক্তির সঙ্গে হাত মুখে তোলেন। আওয়ামী লীগের ৫৯ বছর বয়সী সাবেক এই এমপি বলেন, ‘ঢাকায় লুকিয়ে থাকার সময় আমি সাত সপ্তাহ সূর্যের আলো দেখিনি’। শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন দলটি টানা ১৫ বছর বাংলাদেশ শাসন করার পর জনপ্রিয় অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়।
শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দিল্লি চলে যান। কিন্তু হাবিবে মিল্লাত পালাতে পারেন কয়েক সপ্তাহ পর। গাড়ি, মোটরসাইকেল আর পায়ে হেঁটে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে তার কলকাতায় পৌঁছতে লেগেছিল ২২ ঘণ্টা।
২০০৭ সালে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ হাবিবে মিল্লাত স্কটল্যান্ডের চিকিৎসা পেশা ছেড়ে আওয়ামী লীগে যোগ দিতে দেশে ফেরেন। ২০২৪ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে সংসদ সদস্য ছিলেন। তিনি বলেন, এখানে এসে আমাকে চার রাত মাটিতে শুয়ে থাকতে হয়েছিল। কারণ আমার কাছে কোনো টাকা ছিল না।
এখন নির্বাসনে কলকাতায় তিনি স্ত্রীসহ ভাড়া নেওয়া এক অ্যাপার্টমেন্টে থাকেন। সেখানেই তিনি স্ক্রলকে বলেন, নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু তারা কীভাবে সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন তা জানালেন হাবিবে মিল্লাত। তিনি বলেন, গত এক বছরে আমরা অন্তত ৬৩৭টি ঘটনায় আওয়ামী লীগ কর্মীদের জনতার হাতে ‘লিঞ্চড’ (প্রহৃত বা অপদস্ত) হওয়ার তথ্য রেকর্ড করেছি। মোট ১১৬ জন সাবেক এমপি জেলে আছেন।
হাবিবে মিল্লাত এমন অভিযোগ নথিভুক্ত করেন কানাডাভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক গভর্নেন্সের জন্য। উদ্দেশ্য হলো আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করা। হাবিবে মিল্লাতের হিসেব মতে, প্রায় এক হাজার আওয়ামী লীগ নেতা ভারতে অবস্থান করছেন। তার বেশিরভাগই কলকাতায়।
গত মাসে বিবিসির একটি প্রতিবেদনে বলা হয় আওয়ামী লীগ কলকাতায় অফিস খুলেছে। তাতে ঢাকায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একে দেশের বিরুদ্ধে ‘স্পষ্ট অবমাননা’ বলে অভিহিত করে। দিল্লি পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় জানায় প্রতিক্রিয়াটি ‘ভুল ব্যাখ্যা করা হয়েছে।’
কলকাতায় থাকা আওয়ামী লীগ নেতারা জোর দিয়ে প্রতিবেদনটি অস্বীকার করেন। হাবিবে মিল্লাত বলেন, আমরা সামাজিক প্রাণী। পাঁচজন একসঙ্গে আড্ডা দিলে তাকে অফিস বলা যায় না।
অফিস থাক বা না থাক, কলকাতার ক্যাফেতে প্রায়ই তারা দেখা করেন, আবার ভার্চুয়াল বৈঠকে সীমান্তপারের কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। কেউ কেউ দিল্লি গিয়ে হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎও করছেন। তারা ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগেই দেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন।
নির্বাসনে রাজনীতি:
হাবিবে মিল্লাত স্মরণ করিয়ে দেন, কলকাতা ও ভারত বহুদিন ধরে আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় ঘর। মুক্তিযুদ্ধের সময় দলটি এখান থেকেই অস্থায়ী সরকার পরিচালনা করে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে ভারতের প্রতি জনমত পরিবর্তন হয়েছে। ফলে আওয়ামী লীগের এখান থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হয়ে উঠেছে। তিনি স্বীকার করে বলেন, অনেক মানুষ মনে করে ভারত আমাদের নিজেদের একটি রাজ্য মনে করে। তাই খুব সাবধানে খেলতে হয়। দলের সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেলও তা মেনে নেন। কলকাতার এক মলে কফি খেতে খেতে তিনি বলেন, ‘যেটাকে অফিস বলা হয়েছে, সেটি আসলে একজন ব্যবসায়ীর জায়গা। তিনি আমাদের পরিচিত। মাঝে মাঝে সেখানে বসা হয়।’
সাম্প্রতিক অতীতে নাদেল ছিলেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক। এখন কলকাতায় সাধারণ জীবন কাটাচ্ছেন। ব্যাংকে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। রিকশাওয়ালার সঙ্গে ৩০ টাকার জন্য দর কষাকষি করছেন। তবে দলের প্রতি আনুগত্য কমেনি। তিনি বলেন, যদি সত্যিই অফিস থাকে, তবে কলকাতায় আমাদের পাঁচ-ছয়টি অফিস আছে বলা যেতে পারে। অন্যদিকে, সাবেক এমপি এস এম কামাল হোসেন সরাসরি কলকাতায় থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেন। তবে তিনি ভারতীয় ফোন নম্বর থেকে কথা বলেন। অন্যদিকে ছাত্রনেতা সাদ্দাম হোসেন খোলাখুলি কথা বলেন। ঢাকায় হত্যা প্রচেষ্টা মামলার আসামি তিনি নিউ টাউনে ঘাঁটি গেড়েছেন। সেখান থেকে প্রতিদিন বাংলাদেশের কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সাদ্দাম হোসেন দাবি করেন, মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। প্রতিদিনের আন্দোলনের মাধ্যমে ইউনূস সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে আওয়ামী লীগ।
সম্প্রতি হাসিনার সঙ্গে দেখা হওয়া কয়েকজনের মধ্যে তিনি একজন। সাক্ষাতের অভিজ্ঞতাকে তিনি বলেন ‘হৃদয়গ্রাহী’ ও ‘অনুপ্রেরণাদায়ক।’
মিল্লাতও আত্মবিশ্বাসী যে, যদি আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া হয়, তবে তাদের সাংগঠনিক শক্তি কাজে লাগিয়ে উল্লেখযোগ্য ভোট পাবে।
প্রতিদ্বন্দ্বীদের অবস্থান:
কিন্তু আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো একেবারেই চায় না দলটি আবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করুক। জাতীয় নাগরিক পার্টি এবং বিএনপি উভয়েই আওয়ামী লীগকে ‘ফ্যাসিস্ট’ আখ্যা দিয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির সারোয়ার তুষার বলেন, আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। অন্যদিকে বিএনপির রুহুল কবির রিজভী আওয়ামী লীগের অতীত শাসনকে তুলোধোনা করে এর নেতাদের ‘দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি’ দাবি করেন।
ভারতের দ্বিধা:
বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে ভারতের অভিজ্ঞতা সুখকর ছিল না। তারা ভারতের উত্তর-পূর্বে বিদ্রোহ উসকে দিয়েছিল বলে অভিযোগ আছে। এ কারণে ভারত প্রায়ই আওয়ামী লীগের দিকে ঝুঁকেছে।
অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিক বীণা শিকরির মতে, ভারতের স্বার্থে বাংলাদেশের নির্বাচন অবশ্যই ‘মুক্ত, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক’ হওয়া উচিত। অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের আদিত্য গোদারা শিবমূর্তি বলছেন, ভারতের জন্য হাসিনাকে ফেরানো বা দলকে নিষিদ্ধ করা সম্ভব নয়। কারণ এতে অন্যান্য ইন্ডিয়াপন্থি নেতাদের কাছে ভুল বার্তা যাবে।
তিনি বলেন, ভারতকে এই বোঝা বহন করতে হবে। তবে তিনি স্বীকার করলেন, আওয়ামী লীগের ফেরাটা যদি হয়ও, অনেক বছর সময় লাগবে। ‘ভারতের এখন বাস্তবতা হলো, পরবর্তী নির্বাচনে যে-ই ক্ষমতায় আসুক, তাদের সঙ্গেই কাজ করতে হবে।’

