দ্য ডিপ্লোম্যাটের নিবন্ধ
জামায়াতে ইসলামীর পুনরুত্থান ডানপন্থার দিকে ঠেলছে বাংলাদেশের রাজনীতিকে
মুবাশ্বর হাসান
প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৫, ১১:৫০ এএম
বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সরকার ২০২৪ সালের আগস্টে পতনের পর বাংলাদেশের সবচেয়ে সংগঠিত ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর প্রভাব বিস্তার দৃশ্যমানভাবে বেড়েছে।
শেখ হাসিনার শাসনামলে জামায়াত চরম দমন-পীড়নের শিকার হয়েছিল। সেই সময় তাদের বহু নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হন, কেউ কেউ বিনা বিচারে নিহত হন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে গোলাম আজম, মতিউর রহমান নিজামী, দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী, মোহাম্মদ কামারুজ্জামান প্রমুখ নেতার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় বা তারা কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন। যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে এসব বিচার হলেও, বহু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এই ট্রাইব্যুনালের প্রক্রিয়াগত ত্রুটি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিল।
দীর্ঘ দমন নীতির পর, হঠাৎ এক রাজনৈতিক পালাবদলে জামায়াত আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। স্থানীয় সাংবাদিকদের মতে, এখন তারা দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে নিজেদের লোক বসাতে সক্ষম হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার থাকার সময় অনেক জামায়াত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিজেদের পরিচয় গোপন করে ছাত্রলীগ ও সরকারি দপ্তরে ঢুকে পড়েছিলেন। এখন তারা প্রকাশ্যে এসেছেন।
জামায়াত তাদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র বিএনপি থেকে সরে এসে নবগঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি বা এনসিপির সঙ্গে জোট করেছে। এনসিপির নেতৃত্বে থাকা ছাত্রনেতারা শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে সামনের সারিতে ছিলেন। এই জোট এখন বিএনপির থেকে ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করছে। মে মাসে তারা রাস্তায় নেমে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করতে। ইউনূস পরে সেই দাবি মেনে নিয়ে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম স্থগিত করেন।
অনেকেই এখন প্রশ্ন করছেন, জামায়াত আবার কেন এতটা শক্তিশালী হয়ে উঠছে, আর এর তাৎপর্য কী?
জামায়াত একদিকে ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্রের ধারণা সামনে রেখে সামাজিক ও দাতব্য কার্যক্রম চালিয়ে আসছে, আবার অন্যদিকে নারীবিরোধী ও সংখ্যালঘুবিরোধী মানসিকতা পোষণ করার অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে। যদিও সম্প্রতি তারা নারী ও সংখ্যালঘুবান্ধব কিছু বক্তব্য দিয়েছে, সমালোচকেরা একে কৌশলগত মুখোশ বলেই মনে করছেন।
তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির একসময় সহিংসতার জন্য আলোচিত ছিল। ২০২০ সালে এক আওয়ামী লীগ কর্মীর শিরায় কাটার ঘটনার দায় তাদের উপর উঠেছিল। নির্বাচনকে ইসলামী রাষ্ট্র গঠনের মাধ্যম বলেও অনেক সমালোচনা রয়েছে। তবে দলটির ভেতরের লোকজন এসব অভিযোগ উড়িয়ে দেন।
জামায়াতের দলীয় সংবিধানে বলা আছে, তারা আল্লাহ ও মহানবীর আদেশ-নির্দেশ অনুসারে নীতি নির্ধারণ করবে। দলটির ওয়েবসাইট ও পাঠ্যসূচিতে প্রতিষ্ঠাতা মওদুদীর লেখা বই রয়েছে। মওদুদী ছিলেন এক প্রভাবশালী ইসলামি চিন্তাবিদ, যাঁকে অনেকেই চরমপন্থার প্রবর্তক বলেন। তবে কেউ কেউ বলেন, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক নির্যাতনের প্রেক্ষিতে তাঁর চিন্তাকে বিচার করতে হবে।
মওদুদী বলতেন, নামাজ ও রোজা শুধুই উপাসনা নয়, বরং ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য প্রস্তুতির মাধ্যম। তাঁর মতে, যেমন রাষ্ট্র তার সেনা-পুলিশকে প্রশিক্ষণ দেয়, তেমনি ইসলামও আল্লাহর সেবার জন্য স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে জিহাদে নিয়োজিত করে।
১৯৫১ সালে ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দের শীর্ষ ওলামারা মওদুদীর কিছু মতবাদকে ভ্রান্ত বলে অভিহিত করেন। কিন্তু মওদুদী মনে করতেন, ইসলামের ব্যাখ্যা ও শরিয়া প্রয়োগের দায়িত্ব কেবল ঐতিহ্যগত আলেমদের উপর ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়।
এখন বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় জামায়াতের অনলাইন কর্মীরা সোচ্চার। তারা বিএনপি-বিদ্বেষী অনেক আলোচনাকে মূলধারায় আনতে সক্ষম হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গোপনে নিজেদের কার্যক্রম চালিয়ে এক সম্মেলনের আয়োজনও করে, যেখানে বিদেশি অতিথিরা এসেছিলেন। কেউ জানতেন না যে, এটি জামায়াত-সংশ্লিষ্টদের আয়োজিত অনুষ্ঠান।
জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবির ও এনসিপি একযোগে কাজ করছে, ফলে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের প্রভাব কমেছে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহযোগিতার দায় জামায়াত বহুদিন বয়ে বেড়িয়েছে। কিন্তু ‘৭১ বনাম ‘৭১ বিরোধী রাজনীতির নামে আওয়ামী লীগ যে একতরফাভাবে অতীতকে ব্যবহার করেছে, তা জনমনে ধীরে ধীরে আগ্রহ হারিয়েছে।
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, যিনি অন্তর্বর্তী সরকারে উপদেষ্টা ছিলেন, সম্প্রতি বলেছেন—‘৭১ পক্ষ-বিপক্ষ রাজনীতি দেশকে পুরনো ছকে ফিরিয়ে নিতে চায়। এই বক্তব্য অনেকেই জামায়াতপন্থী বলে ব্যাখ্যা করেছেন।
জামায়াত এখন খেলাফত মজলিস, ইসলামী আন্দোলন, ও হেফাজতে ইসলামের মতো ইসলামপন্থী দল ও সংগঠনের সঙ্গে বৃহত্তর জোট গঠনের চেষ্টা করছে। এতে মূলধারার রাজনীতি ডানদিকে ঝুঁকে পড়বে। ফলে বিএনপি, যেটি ঐতিহ্যগতভাবে মধ্য-ডানপন্থী দল ছিল, এখন কেন্দ্রভিত্তিক অবস্থান নিচ্ছে।
জামায়াতের নিজস্ব ভোটে জেতার সম্ভাবনা কম। তাই তারা এনসিপির সঙ্গে আছে। দুই দলই নির্বাচনে এককভাবে বড় সাফল্যের আশায় নেই।
তবে তারা বর্তমান একক বিজয় ভিত্তিক নির্বাচন পদ্ধতির বদলে অনুপাতে আসন বণ্টনের পদ্ধতি চালুর দাবি তুলেছে। এতে ছোট দলগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়বে। বিএনপি এই পরিবর্তনের বিপক্ষে, কারণ এতে তাদের অংশীদারিত্ব কমে যেতে পারে।
জামায়াতের এই পুনরুত্থান শুধু বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য নয়, বরং বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক ইসলাম আন্দোলনের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, তুরস্ক, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার বাইরে ইসলামপন্থীরা অনেক দেশে সরকারি চাপে রয়েছে।
তুরস্কের এরদোয়ান সরকারের আর্থিক, কৌশলগত ও মতাদর্শিক প্রভাব বাংলাদেশের রক্ষণশীল রাজনীতিতে বাড়ছে। এতে করে ভারতের প্রভাব আরও হ্রাস পাচ্ছে।
