ড. ইউনূস ও তারেক রহমানের সংলাপকে স্বাগত জানাল নাগরিক কোয়ালিশন
সংবিধান সংস্কার ও নির্বাচনী তারিখ নিয়ে ঐক্যমত্যের আহ্বান
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৫, ০৩:৫০ পিএম
ড. ইউনূস ও তারেক রহমানের সংলাপকে স্বাগত জানিয়েছে নাগরিক সমাজের কিছু সংগঠন ও ব্যক্তির সমন্বয়ে গঠিত ‘নাগরিক কোয়ালিশন’। তারা সংবিধান সংস্কার ও নির্বাচনী তারিখ নিয়ে ঐক্যমত্যের আহ্বান জানিয়েছে। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তারা এই আহ্বান জানায়।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতনের পর আমরা একটি বিরল মুহূর্তে উপনীত হয়েছি, যেখানে সামাজিক ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে একটি নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের সুযোগ আমাদের সামনে উপস্থিত। কিন্তু নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে আমরা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন যে- অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তরফ থেকে সংস্কার ও নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা না করার ফলে সৃষ্ট জটিলতা, সংস্কারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নীতিগতভাবে গ্রহণযোগ্য অবস্থান নিতে রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির অনীহা, এবং ঘোষিত বাজেটে কাঠামোগত সংস্কারের কোনো পরিকল্পনা ও বরাদ্দ না থাকার ফলে হাসিনা সরকারের পতনের পর রাষ্ট্র কাঠামোর মৌলিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ক্রমেই ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে যাচ্ছে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, এই অবস্থায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধান প্রফেসর ইউনুস ২০২৬ এর এপ্রিলের প্রথমার্ধে নির্বাচনের একটি সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা করার মাধ্যমে নির্বাচন প্রশ্নে সরকারের প্রতি অনাস্থা দূর করতে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিলেও, এপ্রিল মাসের নির্বাচনের বিভিন্ন বাস্তব-ভিত্তিক সমস্যা এবং এই সময়ের মধ্যে সংস্কার ও নির্বাচনের প্রধান ধাপগুলো কীভাবে বাস্তবায়িত হবে তার স্বচ্ছতার অভাব দেশের মানুষকে নিঃশঙ্ক অবস্থায় পৌঁছাতে দিচ্ছে না।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, একই সাথে, এপ্রিল মাসের নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান করে ডিসেম্বরে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে বিএনপিসহ বেশ কিছু রাজনৈতিক দল অনড় অবস্থানের কারণে একটি রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হচ্ছে, যা ঈদের ছুটির পর গভীরতর হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে দেশে ও বিদেশে অনেক ষড়যন্ত্র এখন গোপনে এবং প্রকাশ্যে দুইভাবেই ঘটে চলেছে বলে প্রতীয়মান।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, এই অবস্থায় আগামী ১৩ জুন লন্ডনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধান প্রফেসর ইউনুসের সঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বৈঠক বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সংকটের মুখে একটি অত্যন্ত আশাপ্রদ ঘটনা।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, নাগরিক কোয়ালিশন এই বৈঠককে স্বাগত জানাচ্ছে এবং আশা পোষণ করছে যে সাংবিধানিক স্বৈরাচার ঠেকাতে এবং নিরপেক্ষ নিয়োগ ও ক্ষমতার প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নাগরিক কোয়ালিশনের প্রস্তাবিত '৭/২' সংবিধান সংস্কার প্রস্তাব গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হবে। উল্লেখ্য যে আমাদের ৭ দফা সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে-
জুলাই চার্টারকে রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তি হিসেবে নেয়া, উচ্চকক্ষে আনুপাতিক ভোটের অনুপাতে আসন বণ্টন, সাংবিধানিক নিয়োগে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পুনঃস্থাপন, সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নারী আসনে নির্বাচন, ইত্যাদি
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, অন্তর্বর্তীকালীন সংস্কার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে নির্বাচন ও সংস্কারের প্রধান ধাপ গুলোকে আমলে নিয়ে, নাগরিক কোয়ালিশন ২০২৬ এর ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে নির্বাচন অনুষ্ঠান করার লক্ষ্যে একটি রোডম্যাপ তৈরি করেছে, যা আমরা অন্তর্বর্তীকালীন। সরকারপ্রধান কর্তৃক এপ্রিলে ইলেকশান ঘোষণার করার পূর্বেই সরকার ও রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের পাঠিয়েছি।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, আমাদের এই প্রস্তাবে ৩০ আগস্টের মধ্যে জুলাই চার্টার ও সংস্কারের ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য রেখে ২০২৬ এর প্রথম সপ্তাহে নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়েছে। একই সাথে ২০২৫ সালে (৩০ অক্টোবর পর্যন্ত) ১৮ বছর হওয়া নাগরিকদের বিশেষ অর্ডিন্যান্স জারির মাধ্যমে ফেব্রুয়ারির ভোটার লিস্টে অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়াও প্রস্তাব করা হয়েছে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, নাগরিক কোয়ালিশন মনে করে- ২০২৫ এর ডিসেম্বর বা ২০২৬ এর এপ্রিল, এর কোনোটিই নির্বাচনের জন্য কার্যকর সময় নয়। ডিসেম্বরের মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা ও তার জন্য বিভিন্ন আইনি পরিবর্তন এবং নির্বাচনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা যেমন দুঃসাধ্য তেমনি এপ্রিল মাসের নির্বাচন অসহনীয় গরমে অসুস্থ ও বৃদ্ধ নারী-পুরুষদের ভোট দিতে নিরুৎসাহিত করবে, রমজান মাসের মধ্যে ও তীব্র গরমে নির্বাচনের জন্য দেশব্যাপী ব্যাপক সরকারি কর্মযজ্ঞ ও রাজনৈতিক দলের ক্যাম্পেইন ও প্রস্তুতির দুরূহ করে তুলবে ও এপ্রিল মাসে এসএসসি-এইচএসসি পরীক্ষা সহ বিভিন্ন বাস্তব সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, এছাড়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৫-২৬ সালের বাজেটে সরকার কাঠামোগত সংস্কারের জন্য কোনো বরাদ্দ না রাখার ফলে সংস্কার প্রক্রিয়াতে ঐক্যমতে পৌঁছানো কাঠামোগত সংস্কারের বিষয়গুলোকে নিয়ে বিভিন্ন প্রকল্পের পরিকল্পনা, প্রকল্প গ্রহণ ও তার অনুমোদন পরবর্তী নির্বাচিত সরকারকেই করতে হবে। কিন্তু এপ্রিল মাসে নির্বাচিত কোনো সরকারের পক্ষে ২০২৭ অর্থবছরের বাজেটে কাঠামোগত সংস্কারের নতুন প্রকল্প গ্রহণ করা অসম্ভব, যা ফেব্রুয়ারি মাসের নির্বাচিত সরকারের পক্ষে সম্ভব হতে পারে। ফলে এপ্রিলের নির্বাচন কাঠামোগত সংস্কারগুলোকে আরও এক বছর পিছিয়ে দেবে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, তাছাড়া, বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা ও চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও এপ্রিলেই কেন নির্বাচনের সময় প্রস্তাব করা হয়েছে তার কোনো ব্যাখ্যা সরকারের তরফ থেকে আমরা এখনো পাইনি। লক্ষণীয় যে, এপ্রিলের প্রথম দুই সপ্তাহে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করলেও, সংস্কার ও নির্বাচনের প্রধান বাগগুলো কবে কীভাবে অনুষ্ঠিত হবে, তার কোনো পরিকল্পনা বা লক্ষ্য সরকার এখনো ঘোষণা করেনি। এই ধাপ গুলো যে কোন একটি বাস্তবায়নের শিথিলতা এপ্রিল মাসের ইলেকশানকেও পিছিয়ে দিতে পারে, এই আশঙ্কা মোটেও অমূলক নয়।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, এই অবস্থায় নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে নাগরিক কোয়ালিশন যে ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে নির্বাচনের লক্ষ্যে রোডম্যাপটি প্রস্তাব করছে, তা আমরা মনে করি, বিদ্যমান সংকট নিরসনে এবং সংস্কার প্রক্রিয়া সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক গাইডলাইন হতে পারে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, এই রোডম্যাপটি আমরা নির্বাচন অনুষ্ঠানের উপলক্ষে ভোটার তালিকা হালনাগাদ, ২০২৫-এর অক্টোবর পর্যন্ত ১৮ বছর হওয়া নাগরিকদের ভোটার লিস্টে অন্তর্ভুক্তকরণ, ঐক্যমতে পৌঁছানোর পর যে ড্রাফট বিল পাস করতে হবে তার সময়সীমা এবং জুলাই চার্টার ও সাংবিধানিক পরিবর্তনের সময়সীমা সহ সকল গুরুত্বপূর্ণ ধাপ নির্বাচন কমিশন পরিচালনায় অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের মতামতের ভিত্তিতে তৈরি করেছি।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, এই অবস্থায় নাগরিক কোয়ালিশন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধান প্রফেসর ইউনুস ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব তারেক রহমানের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি যাতে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ নির্বাচন তারিখ ভিত্তিক রোডম্যাপটিকে (নাগরিক কোয়ালিশনের প্রস্তাবিত ৩০ আগস্টে জুলাই চার্টার ও সংস্কারের বিষয়ে ঐকমত্য গড়ার শেষ দিন ধরে) আগামী ১৩ জুন সংলাপের এজেন্ডায় অন্তর্ভুক্ত করে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে আহ্বান জানায়।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, একই সাথে আমরা বিএনপি সহ সকল রাজনৈতিক দলকে নাগরিক কোয়ালিশনের প্রস্তাবিত ৭/২ প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত-জুলাই চার্টারকে রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তি হিসেবে নেওয়া, উচ্চকক্ষে আনুপাতিক ভোটের অনুপাতে আসন বণ্টন, সাংবিধানিক নিয়োগ নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা, সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নারী আসনে নির্বাচন সহ ইত্যাদি প্রশ্নে নাগরিক কোয়ালিশনের অবস্থানকে গ্রহণ করতে আহ্বান জানাই।
