আল জাজিরার মতামত প্রতিবেদন
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান টানাপোড়েনের মাঝে শান্তির বার্তাবাহক কাতার
ড. সুলতান আল-খুলাইফি
প্রকাশ: ২৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০৩:৪৪ পিএম
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান (বামে) এবং কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি একসঙ্গে হাঁটছেন। ছবিটি তেহরানে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে আয়োজিত আনুষ্ঠানিক স্বাগত অনুষ্ঠানের সময় তোলা হয়েছে, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫। [ছবি: ইরানি প্রেসিডেন্সি / এএফপি]
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্পর্কের উত্তেজনা এখন নতুন এক মাত্রায় পৌঁছেছে। দুই পক্ষের সরাসরি সামরিক হামলা, উত্তপ্ত বক্তব্য, আর দীর্ঘদিনের সংযম ভেঙে পড়ার ফলে পরিস্থিতি হয়ে উঠেছে আরো অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক।
এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েছে উপসাগরীয় দেশগুলো, যাদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এই সংঘাতের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।
এই বাস্তবতায় কাতারের কূটনৈতিক তৎপরতা বুঝতে হবে একটি নিরপেক্ষ ভূমিকা নয়, বরং একটি হিসেবি প্রয়াস হিসেবে—যা বড় সংঘাতের ঝুঁকি কমিয়ে আনার উদ্দেশ্যে পরিচালিত।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার উত্তেজনার সময় সাধারণত এর প্রভাব শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এই ধরনের পরিস্থিতি পুরো অঞ্চল জুড়েই ছড়িয়ে পড়ে।
বিশেষ করে ইরানে যখন গণআন্দোলনের জেরে সহস্রাধিক মানুষের মৃত্যুর খবর ছড়ায়, তখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেই আন্দোলনে হস্তক্ষেপের হুমকি দেন।
এই প্রেক্ষাপটে উপসাগরীয় অঞ্চলে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আরও জরুরি হয়ে ওঠে। কারণ এই অঞ্চলের ভৌগোলিক বাস্তবতা, জ্বালানি অবকাঠামো এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাগুলো একে অন্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
এই অবস্থায় কাতার বরাবরই এক শান্তিপূর্ণ অবস্থান নিয়েছে—দুই পক্ষের সঙ্গে কথা বলার পথ খোলা রাখা, উত্তেজনা কমানো, এবং প্রয়োজন হলে মধ্যস্থতা করা।
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কাতার এই ভূমিকার সবচেয়ে স্পষ্ট দৃষ্টান্ত রাখে।
তখন তারা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি বন্দি বিনিময় কার্যক্রমে সহায়তা করে এবং ইরানের জন্য মানবিক সহায়তার অংশ হিসেবে বরফজমা তহবিল ছাড়ের পথ তৈরি করে।
এই প্রক্রিয়াটি ছিল দীর্ঘ, জটিল এবং ধাপে ধাপে বিনিময় ও আস্থা তৈরির ফলাফল।
যদিও এটি দুই দেশের মধ্যে বড় কোনো সম্পর্কোন্নয়নের ইঙ্গিত দেয়নি, তবে এটি প্রমাণ করেছে—যোগ্য মধ্যস্থতাকারী থাকলে কূটনীতির পথ এখনো বন্ধ হয়নি।
কাতারের কাছে এই মধ্যস্থতা কোনো রাজনৈতিক ‘তামাশা’ নয়।
তারা বিশ্বাস করে, ইরানের পারমাণবিক ইস্যু কিংবা সামগ্রিক উত্তেজনা সামাল দেওয়ার একমাত্র দীর্ঘস্থায়ী উপায় হচ্ছে সংলাপ।
তারা জোর করে কিছু চাপিয়ে দেওয়ার পক্ষে নয়, কারণ সেটি অনিশ্চয়তা তৈরি করে, যার খেসারত দিতে হয় পুরো অঞ্চলকে।
২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়, তার প্রতিক্রিয়ায় ইরান কাতারের আল-উদেইদ ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে।
এই ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা অবস্থান করে।
তবে এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে কাতার এক মুহূর্ত দেরি না করে উভয় পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে।
এর ফলেই গড়ে ওঠে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি, যা আজও মোটামুটি টিকে আছে।
ইরানের ভেতরে যদি বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হয়—ধরে নেওয়া যায় রাষ্ট্র ভেঙে পড়া, কর্তৃত্বের বিলুপ্তি কিংবা জাতিগত বিভাজন—তবে তার প্রভাব শুধু ইরানেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।
প্রতিবেশী দেশগুলোতে উদ্বাস্তু প্রবাহ, জ্বালানি সরবরাহে বিশৃঙ্খলা, এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিপন্ন হওয়া—এই সবই বাস্তব ঝুঁকি।
এই কারণেই উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে সংঘাত নয়, স্থিতিশীলতাই সবচেয়ে জরুরি।
এই কৌশল কেবল কাতারের একার নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরব ও ওমানও একই পথে হাঁটছে।
তারা তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টা করেছে সংলাপ ও আস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে।
এমনকি তারা ট্রাম্প প্রশাসনকে সামরিক উত্তেজনার বিপদ সম্পর্কে বারবার সতর্ক করেছে।
এই প্রয়াসের একটি বড় মূল্য রয়েছে।
এগুলি বড় কোনো চুক্তিতে পৌঁছায় না, সংবাদ শিরোনামেও আসে না। কিন্তু এগুলোর অনুপস্থিতিতেই সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে।
এই সময়ে, যখন অঞ্চলটি দিন দিন আরও বিভক্ত হয়ে পড়ছে, তখন শান্তির গুরুত্ব আমাদের চোখ এড়িয়ে যেতে পারে।
তবে কাতারের মতো দেশ দেখিয়ে দিচ্ছে—যথাযথ উদ্যোগ, দৃঢ়তা এবং সংলাপের পথ খোলা রাখার মধ্যেই লুকিয়ে আছে বড় সংকট এড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
এই ভূখণ্ডে যুদ্ধের খেসারত শুধু রণক্ষেত্রে নয়, ঘরে ঘরেই গুনতে হয়। সেজন্যই শান্তির খাতিরে কূটনীতি এখনও সবচেয়ে বড় ভরসা।
