আল জাজিরার মতামত প্রতিবেদন
এআই-এর জলপিপাসা, বাড়তি পানির চাহিদা এখন জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি
ওমর শাবানা
প্রকাশ: ২৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০৩:০৩ পিএম
‘এআই’ মানেই এখন শুধু প্রযুক্তি আর সম্ভাবনার গল্প নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে গভীর উদ্বেগ। শুধু মাত্র দূষণ নয়, এআই চালাতে যেভাবে বিশুদ্ধ পানির প্রয়োজন হয়, তাতে ঝুঁকিতে পড়ছে বহু মানুষের স্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা।
জেনারেটিভ এআই এখন গোটা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু চ্যাটজিপিটিই প্রতিদিন প্রায় একশ কোটি প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে। এভাবে প্রতিটি ক্লিকের পেছনে আছে বিপুল শক্তি খরচ।
একটি সাধারণ সার্চের তুলনায় এআই চালিত একটি গুগল সার্চে খরচ হয় প্রায় ৩০ গুণ বেশি বিদ্যুৎ। এই বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সার্ভার ঠান্ডা রাখতে লাগে লক্ষ লক্ষ লিটার বিশুদ্ধ পানি।
একটি চিপই ব্যবহার করে প্রায় ৭০০ ওয়াট বিদ্যুৎ। সার্ভারগুলোতে একসঙ্গে হাজার হাজার চিপ কাজ করে। কেবল ফ্যান দিয়ে এগুলো ঠান্ডা রাখা যায় না, তাই বিশুদ্ধ পানি পাম্প করে বা চিপের আশপাশে ঘোরানো হয় ঠান্ডার জন্য।
যুক্তরাজ্যের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৭ সালের মধ্যে এআই-এর কারণে বিশ্বজুড়ে পানি ব্যবহারের পরিমাণ ১.১ বিলিয়ন কিউবিক মিটার থেকে বেড়ে দাঁড়াতে পারে ৬.৬ বিলিয়ন কিউবিক মিটারে।
২০২৩ সালে মাইক্রোসফট জানিয়েছে, তাদের ৪১ শতাংশ পানি এসেছে এমন অঞ্চল থেকে, যেখানে পানি সংকট রয়েছে। গুগলের ক্ষেত্রে এই হার ১৫ শতাংশ।
পানি সংকট মানেই শুধু খরার ভয় নয়—এর সঙ্গে যুক্ত আছে অপুষ্টি, সংক্রমণ এবং জীবাণুবাহিত রোগের ঝুঁকি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন না থাকলে কলেরা, ডায়রিয়া ও আরও অনেক রোগ সহজেই ছড়িয়ে পড়ে।
বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এসব রোগ প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। ডায়রিয়াজনিত রোগের ৮৪ শতাংশ বোঝা পড়ে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ওপর। এতে শুধু শারীরিক ক্ষতি নয়, ভবিষ্যতের মানসিক বিকাশও বাধাগ্রস্ত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ার নিউটন কাউন্টিতে মেটার একটি ডেটা সেন্টার রয়েছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, তাদের কল থেকে আসছে ঘোলা ও পলি-মিশ্রিত পানি। অনুরূপ অভিযোগ পাওয়া গেছে ক্যালিফোর্নিয়ার বে ভিউ-হান্টার্স পয়েন্ট থেকেও। এসব অঞ্চলে মূলত কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর বসবাস—এটি পরিবেশগত ন্যায়বিচারের বিষয়কেও সামনে এনে দিয়েছে।
অনেকে বলছেন, এসব কেন্দ্রে সমুদ্রের পানি ব্যবহার কিংবা ‘বদ্ধ চক্রের’ পানি পুনর্ব্যবহার সম্ভব। তবে এসব প্রযুক্তি এখনও ব্যয়বহুল এবং সীমিত কার্যকর।
বিশ্বের নানা দেশে—বিশেষ করে আফ্রিকার নাইজেরিয়া, মিসর, দক্ষিণ আফ্রিকার মতো জায়গায়—নতুন ডেটা সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনা আছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—এই প্রকল্পগুলোতে পরিবেশ রক্ষায় কি যথেষ্ট নজর দেওয়া হচ্ছে?
বেশিরভাগ কোম্পানি টেকসই পানি ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি দিলেও, সেই পানি যদি ফেরত না আসে স্থানীয় মানুষের জীবনে—তাহলে লাভ কাদের? হিসাবের কাগজে সবুজ সূচক এলেও বাস্তবে দেখা যায়, একপাশে পানি কমে যায়, অন্যপাশে মুনাফা বাড়ে।
এই পরিস্থিতিতে সরকারের দায়িত্ব এখন আর পেছনে পড়ে থাকার নয়। সময় এসেছে কঠোর নীতিমালা করার, যাতে কোম্পানিগুলো খোলাখুলি জানায় তারা কোথায়, কতখানি পানি ব্যবহার করছে।
স্বাস্থ্যবান মানুষই দেশের উন্নয়নের ভিত্তি। আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ জলবায়ু নিশ্চিত করতে হলে প্রযুক্তির দৌড়ের সঙ্গে তাল মেলাতে হবে ন্যায়ের হাত ধরেই।
আর নয় শুধু উন্নয়ন, চাই ভারসাম্য। চাই মানুষ, প্রকৃতি ও প্রযুক্তির সহাবস্থান।
