ছবি: সংগৃহীত
ন্যু-ইয়র্ক প্রবাসী সাংবাদিক ও লেখক নুরুজ্জামান লাবু লিখলেন, ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শাহরিয়ার কবিরকে শোন অ্যারেস্ট দেখানো অত্যন্ত দুঃখজনক ও অস্বাভাবিক’। ভালো কথা। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়াকে যখন অনিয়মের অভিযোগে, নোট রাখেন, অনিয়মের অভিযোগে টাকা আত্মসাতের অভিযোগে নয়, সর্বোচ্চ সাজা দেওয়া হল, তখন কোথায় ছিলেন নুরুজ্জামান লাবু এবং তাদের ভাই-বন্ধুরা? সিলেক্টিভ প্রতিবাদ, অন্যায়কে সমর্থন করারই অন্যরূপ।
বাংলাদেশে বিচারিক হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে বিগত রেজিমে। তেমন কোনো প্রত্যক্ষ সাক্ষী, প্রমাণ ছাড়াই বিচারকাজ সম্পন্ন হয়েছে, কিন্তু কেউ কথা বলেননি। অথচ যখন হাতের কাছে দৃশ্যমান অসংখ্য প্রমাণ তখন কথা বলছেন, তুলছেন ন্যায়বিচারের কথা। জাস্টিস ডিলেইড মানে জাস্টিস ডিনাইড। অর্থাৎ বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা অবিচারের সামিল। কিন্তু যখন বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত হয়, তখন আমরা প্রশ্ন তুলি। চোখের সমুখে অসংখ্য হত্যাকাণ্ডের ভিডিও চিত্র, ফরেনসিকে প্রমাণিত অডিও দলিল, প্রত্যক্ষ সাক্ষী এসব সত্ত্বেও কেউ কেউ প্রশ্ন তুলতে চান ন্যায়বিচার নিয়ে। জানি না, তারা ন্যায়বিচারের সংজ্ঞাটা সঠিকভাবে জানেন কিনা। নাকি তারা বিচারের দীর্ঘসূত্রিতার আড়ালে প্রমাণ লোপাটের সুযোগ খুঁজছিলেন। যেমন প্রমাণ লোপাট হয়েছে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের, ফাগুন রেজা হত্যাকাণ্ডের। আজও সাগর-রুনি হত্যার তদন্ত শেষ হয়নি, হবে কিনা তারও নিশ্চয়তা নেই। যারা দ্রুত বিচারের প্রশ্নে আপত্তি জানাচ্ছেন তারাও কি চাচ্ছিলেন সাগর-রুনি, ফাগুন রেজাসহ অসংখ্য হত্যাকাণ্ডের মতন দুই হাজার মানুষের হত্যার প্রমাণও হাওয়া করে দিতে?
শাহরিয়ার কবিরের অপরাধের নজির চারিদিকে ছড়ানো। তার সবচেয়ে বড় অপরাধ ইতিহাসের নামে ভুল এবং বিকৃত তথ্য চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা। শাহরিয়ার কবিরকে মানবাধিকার কর্মী বলা হলে মানবাধিকার শব্দটিকেই ধর্ষণ করা হয়। সারাবিশ্বে মৃত্যুদণ্ড তুলে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড বিষয়ে যে কথা উঠেছে তা সে ধারণা থেকেই। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন থেকে শুরু করে অ্যামনেস্টিসহ যত মানবাধিকার সংগঠন রয়েছে, তারা জানিয়েছে, শেখ হাসিনার অপরাধ নিয়ে তাদের সংশয় নেই। তারা শুধু সকল প্রশ্নে, সবার প্রশ্নে মৃত্যুদণ্ডবিরোধী। এমন কথাকেই আমাদের সোকল্ড বুদ্ধিজীবীদের অনেকেই টুইস্ট করে ব্যববহার করার চেষ্টা করেছেন। যেমন স্বাধীনতা-সংস্কৃতির প্রশ্নে করেছেন শাহরিয়ার কবির। তার অপরাধ আকাশ সমান। তিনি একটা জাতিকে বিভ্রান্ত করতে চেষ্টা করেছেন, তাদের ইতিহাস আর সংস্কৃতির প্রশ্নে। তিনি ভারতীয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের জবাবে নিজ দেশের সংস্কৃতিকে তুলে ধরার বদলে, আধিপত্যবাদী সংস্কৃতিকেই বহাল করার চেষ্টা করেছেন। বিশ্বের মানবাধিকার বিষয়ক সকল লিডিং অর্গানাইজেশন যে মৃত্যুদণ্ডের বিপক্ষে কথা বলছে, শাহরিয়ার কবির সেই মৃত্যুদণ্ডের পক্ষেই গলাবাজি করেছেন এক সময়। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের ফাঁসির দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন। বিচারকে প্রভাবিত করেছেন, বিচারিক হত্যাকাণ্ডকে উৎসাহিত করেছেন। একটা ফ্যাসিস্ট রেজিমকে দীর্ঘায়িত করতে তার ভূমিকাকে আড়াল করা যাবে না। যে ফ্যাসিস্ট রেজিমের কারণে হাজারও ছাত্র-জনতা প্রাণ দিয়েছে, ত্রিশ হাজারের মানুষ আহত হয়েছে, পঙ্গু হয়েছে। সুতরাং তার প্রতি সমর্থন জানিয়ে বিচারকে প্রভাবিত করার যে চেষ্টা তাও অপরাধ। আদালত অবমাননা। জ্বি, যে আদালত অবমাননার ফর্মটি দারুণ ভাবে চালু ছিল বিগত ফ্যাসিস্ট রেজিমে। যারফলে বিচারিক হত্যাকাণ্ড জানা সত্ত্বেও মানুষ ভয়ে কথা বলতে এমনকি আমরা লিখতেও সাহস পেতাম না। কিন্তু লাবু সাহেবের মতন অনেক সাহেবরাই এখন লিখতে পারছেন এবং আদালত অবমাননার ভয় না করেই।
শাহরিয়ার কবির ও মুক্তিযুদ্ধ এই দুই বিষয়ে নিয়ে আলাপ করতে গেলে মহান মুক্তিযুদ্ধকেই ছোট করা হবে। একাত্তরে তার ভূমিকার বিষয়ে নানান কথা চালু রয়েছে। সেগুলো নিয়ে আলাপ করতে চাই না। মুক্তিযুদ্ধকে যারা ‘ট্যাবু’ বানিয়ে মুক্তিযুদ্ধের মর্যাদা ও ইতিহাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন, তাদের অন্যতম শাহরিয়ার কবির। লাবু ট্রাইবুনালকে বায়াসড বলছেন, তাকে যদি প্রশ্ন করা যায়, বায়াসড হয়েই তো বিগত ফ্যাসিস্ট রেজিম এই ট্রাইব্যুনালের সৃষ্টি করেছিলেন। আজকে ট্রাইব্যুনাল সেই বায়াসড অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে তাদের পাপমোচন করতে চাইছে। তাদের অতীত অন্যায়ের প্রায়শ্চিত্ত করতে চাইছে। সেই প্রায়শ্চিত্তের প্রক্রিয়াকে অনেকেই মানতে চাইছেন না। কেন চাইছেন না তা সবাই জানে। মানুষ জানে তাদের দিল্লির সাউথব্লকমুখী উদ্দেশ্য ও আদর্শ। সুতরাং এসব বলে মূলত কোনো লাভ নেই । জুলাই রেভ্যুলেশন পরবর্তী সময়ে মানুষকে ভুজুংভাজুং দিয়ে বোঝানো যাবে না। সেই বোঝানোর দিন মূলত শেষ।

