আল জাজিরার মতামত প্রতিবেদন
সুদানে যুদ্ধাপরাধ ধামাচাপায় যুক্তরাষ্ট্রের ‘ব্লব’ সক্রিয় সহায়তাকারী
আমগাদ ফারেইদ এলতায়েব
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৫, ০১:০৮ পিএম
বারাক ওবামার আমলে যুক্তরাষ্ট্রের ডেপুটি ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার ছিলেন বেন রোডস। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির স্থায়ী ক্ষমতাকাঠামোকে কটাক্ষ করে একবার বলেছিলেন ‘দ্য ব্লব’। এই ‘ব্লব’ বলতে তিনি বোঝান সেই জটিল ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীটিকে, যেখানে চিন্তাভাবনার প্রতিষ্ঠান, প্রাক্তন কর্মকর্তারা, সাংবাদিক এবং অর্থায়নকারী একত্রে একটি সংকীর্ণ ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গিকে ধরে রেখেছে।
এই গোষ্ঠী শুধু এক ধরনের রক্ষণশীল নীতিকেই টিকিয়ে রাখে না, বরং ঠিক করে দেয় কোন কোন নীতিকে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচনা করা হবে। সুদানের প্রায় আড়াই বছরের গৃহযুদ্ধে এই সীমাবদ্ধতাগুলো প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে।
‘ব্লব’-এর একটি বিশেষ ক্ষতিকর প্রবণতা হলো, নীতিগত ভারসাম্যের নামে নৈতিকভাবে দুই পক্ষকে এক কাতারে ফেলা। উদাহরণস্বরূপ, সুদানের র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস এবং সুদানি সেনাবাহিনীকে সমমানের প্রতিপক্ষ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। এই তথাকথিত ‘নিরপেক্ষ’ অবস্থানটি আসলে একটি রাজনৈতিক কৌশল, যেখানে অপরাধে লিপ্ত, বাইরের পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত একটি মিলিশিয়াকে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের জাতীয় সেনাবাহিনীর সমান করে দেখানো হয়।
এর ফলে র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস-এর সংগঠিত জাতিগত নিধন, শহর ঘেরাও এবং সন্ত্রাসকে যুদ্ধ পরিস্থিতির অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয় — পরিকল্পিত অপরাধ নয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, জাতিসংঘের তদন্ত মিশন ও অন্যান্য সংস্থা বারবার জানিয়েছে — পশ্চিম দারফুরে জাতিগত নিধন, খার্তুম ও গেজিরায় ধর্ষণ ও বেআইনি আটক — সবকিছুর জন্য র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস দায়ী। ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বেসামরিক জনগণের ওপর সংঘটিত সহিংসতার ৭৭ শতাংশ ঘটিয়েছে RSF।
তারপরও ‘ব্লব’-এর কথাবার্তায় এই বৈষম্য প্রায়ই আড়াল হয়ে যায়।
গৃহযুদ্ধের শুরুর দিকে খার্তুমে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত জন গডফ্রে একটি টুইটে RSF-এর যৌন সহিংসতা নিয়ে কথা বললেও, দোষীদের পরিচয় দেননি। তিনি লিখেছিলেন, অপরাধ করেছে ‘সশস্ত্র গোষ্ঠী’। কিন্তু ব্যাপক প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও এই ভাষায় অপরাধের দায় ছড়িয়ে যায় দুই পক্ষের ওপর — আর তা দায়মুক্তির সংস্কৃতি আরও পুষ্ট করে। RSF আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বর্বরতা চালিয়ে যায়, কারণ তারা জানে, দায় কেউ ঠিকমতো নেবে না।
কেন এই সমতা টানা হয়? কারণ ‘ব্লব’ সত্যের চেয়ে কূটনৈতিক যোগাযোগের সুযোগকে বেশি গুরুত্ব দেয়। দ্বন্দ্বকে সমানভাবে উপস্থাপন করলে, বিশেষত সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা সহজ হয়, যারা RSF-এর প্রধান পৃষ্ঠপোষক।
কিন্তু অপরাধ ও বৈষম্যমূলক সহিংসতার মাঝে ‘নিরপেক্ষতা’ আসলে নিরপেক্ষতা নয় — সেটা হলো মৌন সমর্থন। র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস যে শহর অবরোধ করে, ক্ষুধা ব্যবহার করে, ধর্ষণকে যুদ্ধাস্ত্র বানায়, মসজিদ ও বাজারে ড্রোন হামলা চালায়, গণহত্যা করে — এসব তথ্য প্রমাণিত। অথচ ‘দুই পক্ষের সংঘাত’ বলে সেগুলোকে ঢেকে ফেলা হয়।
আরও খারাপ হলো, ‘ব্লব’ র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস-এর প্রচারণাকেও নিজের ব্যাখ্যার অংশ বানিয়ে নিয়েছে। র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস নিজেদেরকে ‘ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে শক্তি’ হিসেবে তুলে ধরছে — অথচ তাদের ইতিহাসে আছে অপরাধ, বিদেশি পৃষ্ঠপোষকতা ও অবৈধ সম্পদ আহরণ। তারা ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন জানায়, এমনকি গাজা থেকে উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের প্রস্তাব দেয়, যেন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
এই ভাষা ব্যবহার করে তারা ‘ব্লব’-এর কাছে নিজেদের পরিচিত করে তুলছে। এর ফলে কিছু কূটনীতিক ও বিশ্লেষক র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসকে ‘ইসলামপন্থা প্রতিরোধে’ একটি কার্যকর শক্তি হিসেবে দেখাতে শুরু করেছে। কিন্তু এই ব্যাখা RSF-এর অপরাধগুলোকে ধামাচাপা দেয় এবং সাধারণ সুদানিদের বাস্তবতা থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেয়।
সুদানি সেনাবাহিনীকে ঘিরে একধরনের ভিন্ন দাবি শোনা যায় — তাদেরকে সাহায্য করছে মিশর, তুরস্ক, সৌদি আরব ও ইরান। কিন্তু এই চারটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক আদর্শ একেবারে ভিন্ন। মিশর ধর্মনিরপেক্ষ, তুরস্ক ইসলামপন্থী, সৌদি সুন্নি, আর ইরান শিয়া — তাদের একসঙ্গে সুদানি সেনাবাহিনীকে সহায়তা করার কথা তেমন বাস্তবসম্মত নয়।
উল্লেখযোগ্যভাবে, সুদানি সেনাবাহিনীর প্রতি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সহযোগিতা মূলত সরাসরি অস্ত্র বিক্রির মধ্যেই সীমিত থাকে, যা পোর্ট সুদান-ভিত্তিক সরকারকে দেওয়া হয়। অথচ র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস-এর পেছনে অনিয়ন্ত্রিত সাহায্য ও অস্ত্রপ্রাপ্তি চলে, যেটি যুক্তরাষ্ট্র নিজেই ‘গণহত্যাকারী’ মিলিশিয়া হিসেবে চিহ্নিত করেছে। দুই অবস্থাকে এক করে দেখা — একেবারেই বিভ্রান্তিকর।
‘ব্লব’ এমনকি র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস-এর ঘনিষ্ঠ কিছু সংগঠন ও নেতাকে ‘সুশীল সমাজের প্রতিনিধি’ হিসেবে পরিচয় দিচ্ছে। যেমন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী আবদাল্লা হামদক, যিনি এখন সংযুক্ত আরব আমিরাত-সমর্থিত এক ব্যবসা উন্নয়ন কেন্দ্রের নেতৃত্বে আছেন। এমন নকল প্রতিনিধিদের ‘মধ্যপন্থী’ হিসেবে তুলে ধরা হয়, অথচ যারা বাস্তবে সুদানে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে — তাদেরকে অগ্রাহ্য করা হয়।
এভাবে আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণ এক ধরনের নাট্য মঞ্চে পরিণত হয়, যেখানে আসল মানুষদের বাদ দিয়ে, পৃষ্ঠপোষকদের সুবিধাভোগীদের প্রধান চরিত্র বানিয়ে তোলা হয়।
এই ভুল কেবল চিন্তার বিষয় নয়, এর বাস্তব পরিণতি ভয়াবহ। র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস-কে স্বীকৃতি দেওয়ার অর্থ — আইনি ও রাজনৈতিকভাবে সঠিক পথে প্রতিক্রিয়ার জায়গা সংকুচিত হয়ে যাওয়া। তখন বেছে নেওয়া হয় শুধু যুদ্ধবিরতির মতো লোক দেখানো সিদ্ধান্ত, যেগুলো আসলে যুদ্ধের অর্থনীতি ও অস্ত্র প্রবাহ টিকিয়ে রাখে। বিচার-প্রক্রিয়ার সুযোগ বিলম্বিত হয়, আর অপরাধীরা শক্তি পায়।
RSF এবং তাদের মিত্ররা এই স্বীকৃতিকে কাজে লাগিয়ে ‘তাআসিস’ নামে পশ্চিম সুদানে এক বিকল্প সরকার গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। তারা এমনও বলেছে, দেশের বিভাজনের পথেও যেতে পারে — যদিও আন্তর্জাতিকভাবে এমন উদ্যোগকে কোনো স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দরকার একটি ভিন্ন পথ — একটি ন্যায্য ও সত্যনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গি।
নীতিনির্ধারকদের দরকার যুদ্ধ আর গণহত্যাকে আলাদা করে দেখা। সত্যিকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্যের ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে হবে — সাধারণ ‘দুই পক্ষ’ বলে দায় ঝেড়ে ফেলা যাবে না।
RSF-এর প্রচার চালানো কথাবার্তা পরিত্যাগ করতে হবে। ‘ইসলামপন্থা বিরোধী’ বললেই কেউ বৈধ হয়ে যায় না। যুক্তরাষ্ট্রের উচিত হবে — সত্যিকারের নাগরিক সমাজের সাক্ষ্যকে গুরুত্ব দেওয়া, আর কৃত্রিম প্রোক্সি প্রতিনিধিদের দূরে রাখা।
সুদানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার একমাত্র সুদানিদের — যারা ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে ওমর আল বাশিরের ইসলামপন্থী শাসনকে সরিয়ে দিয়েছিল — বিদেশি হস্তক্ষেপ ছাড়াই।
এই প্রক্রিয়ায় নকল প্রতিনিধিদের কোনো জায়গা দেওয়া যাবে না। মধ্যস্থতা কেবল সেই সংগঠনগুলোর হাতেই থাকা উচিত, যাদের শেকড় বাস্তব সমাজে প্রোথিত।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো — অপরাধে সহায়তাকারীদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা। শুধু নীতিগত বা ভাষাগত অবস্থান যথেষ্ট নয়, তার বাস্তব প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে। না হলে ‘বিচার’ শুধুই একটি সান্ত্বনা হয়ে থাকবে — পরিবর্তনের উপায় নয়।
যদি ‘ব্লব’ পরিবর্তনে অনাগ্রহী হয়, তবে বিকল্প শক্তিকে এগিয়ে আসতে হবে। সুদানি নাগরিক সমাজ, প্রবাসী কর্মীরা, স্বাধীন সংবাদমাধ্যম ও নৈতিক বিশ্লেষকদের একত্রে চাপে ফেলতে হবে — যাতে আন্তর্জাতিক নীতি বাস্তবভিত্তিক হয়।
যে কূটনীতি নিরপেক্ষতার নামে অপরাধ আড়াল করে, তা শুধু সহিংসতাকেই টিকিয়ে রাখে। একমাত্র উপায় হলো — সুদানি মানুষের ক্ষমতায়ন, সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং অপরাধের দায় ঠিকভাবে নির্ধারণ। তবেই শান্তির পথ খোলা হতে পারে।
সুদানিরা করুণা চায় না। তারা চায়, প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলো যেন হামলাকারীদের রক্ষক না বানায়, প্রোপাগান্ডাকে সত্য না বানায়, আর মাটি থেকে গড়ে ওঠা বাস্তবতাকে ধামাচাপা না দেয়।
যদি যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাকেন্দ্রিক গোষ্ঠী সত্যিকার অর্থে সুদানিদের ‘নাগরিক’ হিসেবে দেখে — যারা ন্যায্যতা দাবি করতে পারে — তাহলেই এই সহিংসতার চক্রে ছেদ পড়তে পারে।
