Logo
Logo
×

অভিমত

নিরাপত্তার পাত্তা নেই মেট্রোরেলে

ড. মো. আদনান আরিফ সালিম

ড. মো. আদনান আরিফ সালিম

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৫, ০২:৪৭ পিএম

নিরাপত্তার পাত্তা নেই মেট্রোরেলে

যদি এক লাইনে বলা হয়, তবে যে কেউ স্বীকার করবেন ঢাকার আকাশরেখা বদলে দিয়েছে মেট্রোরেল। আমাদের প্রতিদিনের যে রুটিন সেখানে চাঁদ কিংবা সূর্যের দেখা মেলা কঠিন। আর তার সিংহভাগ আলো-উত্তাপ শুষে নেয় ফ্লাইওভার এবং মেট্রোরেলই। এটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের কথিত উন্নয়নের মাইলফলক, কারও হিসেবে এক স্বপ্নপূরণের নাম। কিন্তু সেই স্বপ্নের আড়ালে যদি থেকে যায় অবহেলা, অদক্ষতা ও নিরাপত্তাহীনতার ছায়া, তবে সেই স্বপ্ন ধীরে ধীরে দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। 

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর দিকে তাকালে, বিশেষত বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ার ঘটনায়, এমন এক দুঃস্বপ্নের ইঙ্গিতই যেন ফুটে উঠছে। গতি যতই দ্রুত হোক, নিরাপত্তা ও মাননিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে আমরা অবশ্যই পিছিয়ে পড়েছি। রবিবার দুপুরে ফার্মগেটে মেট্রোরেলের ৪৩৩ নম্বর পিয়ার থেকে বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ে। আর সেটাই পথচারী আবুল কালাম আজাদের মৃত্যুর কারণ হয়। সেইসঙ্গে আহত হন আরও দুজন। ঘটনাটি ঘটেছে সেই জায়গা থেকে মাত্র দুটি পিয়ার দূরে, যেখানে গত বছরের সেপ্টেম্বরে একই ধরনের আরেকটি প্যাড পড়েছিল। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে একই স্থানে একই বিপর্যয়। এটি নিঃসন্দেহে নিছক কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং ব্যর্থ তদারকির প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করার মতো অঘটন।

ঘটনার পরপরই নিরাপত্তার জন্য মেট্রোরেল সেবা বন্ধ করে দেয়া হয়। তারপর শহরজুড়ে সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট। উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেলের পূর্ণ রুট সচল হতে লেগেছে ২৩ ঘণ্টা। কিন্তু এই সাময়িক বন্ধের চেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ জন্ম নিয়েছে মানুষের মনে। যে যাত্রীরা এতদিন মেট্রোরেলে নির্ভর করে নির্ভার ভ্রমণ করতেন, তাদের মনে জন্মেছে ভয়। তারা সবাই ভাবতে শুরু করেছেন এই রেলপথ কি সত্যিই নিরাপদ? কেউ কেউ ভাবছেন যেই মেট্রোরেলের বিয়ারিং খুলে মানুষ মরে, সেই মেট্রোরেল হুড়মুড়িয়ে ভেঙ্গে পড়াও কী অসম্ভব কিছু হবে? নাকি সেটাই অনেক সহজ এবং সম্ভব একটি বিষয় হতে পারে। 

মেট্রোরেলের বিয়ারিং পড়ে মারা পড়া আবুল কালাম আজাদ ছিলেন এক সাধারণ মানুষ, প্রতিদিন নারায়ণগঞ্জ থেকে উত্তরা যেতেন অফিসের কাজে। তার মৃত্যু কেবল একটি প্রাণহানি নয়, এটি সেই ব্যর্থতার প্রতীক, যেখানে উন্নয়নের স্লোগান মানুষের জীবনের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে। প্রত্যক্ষদর্শী একজন বলেছেন, “প্রথমে বিকট শব্দ, তারপরই লোকটা পড়ে গেলেন।” এই কয়েক সেকেন্ডেই ঢাকা শহর বুঝে গেছে এক অশনিসংকেত। তারা বুঝতে পারছে কথিত উন্নয়নের প্রতীক ফ্যাস্টিস্টের কুম্ভীরাশ্রুতে অভিষিক্ত এই মেট্রোরেলের ছায়াতেই লেখা আছে অনেকের করুণ কাল, ভয়ানক মৃত্যুরেখা। 

খোঁজ নিয়ে জানা গিয়েছে, মেট্রোরেল প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিল সাতটি প্রতিষ্ঠান, আর তদারকিতেও ছিল একই দেশের কয়েকটি সংস্থা। এর ফলেই ঘটেছে সেই অদ্ভুত বিরোধ। যেখানে পরীক্ষার্থী নিজেই নিজের উত্তরপত্র মূল্যায়ন করছে। তদারকির স্বচ্ছতা ও স্বাধীনতা যখন প্রশ্নবিদ্ধ, তখন গুণগত মানের নিশ্চয়তা পাওয়া যায় কীভাবে? নিরাপত্তা অডিটের অভাব, ঝুঁকি-মূল্যায়নের অনুপস্থিতি, এসবই যেন ইঙ্গিত দেয়, আমরা প্রকল্পটি সম্পন্ন করার তাড়ায় সবচেয়ে মৌলিক বিষয়টিই ভুলে গিয়েছি: মানুষের জীবন সবার আগে। আর তাই নিরাপত্তার বিষয়টি পাত্তাও পায়নি অনেক জায়গায়। 

প্রকল্পের ব্যয় শুরুতে ছিল ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা। শেষ পর্যন্ত তা দাঁড়ায় ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকায়। এই বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও যদি নকশাগত ত্রুটি, তদারকির ঘাটতি, কিংবা নিরাপত্তা সংক্রান্ত অবহেলার কারণে প্রাণহানি ঘটে, তবে সেই উন্নয়ন কতটা ন্যায্য বা টেকসই? নাকি সেটা ছিল শুধুই লুটপাট করে খাওয়ার পথ? এই প্রশ্ন এখন জনগণের।

জাপানের মতো প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত দেশের পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আমাদের আস্থা দীর্ঘদিনের। কিন্তু নিপ্পন কোইয়ের নেতৃত্বে গঠিত এনকেডিএম অ্যাসোসিয়েশন, যারা মেট্রোরেলের নকশা, তদারকি এবং পরামর্শক কার্যক্রমের দায়িত্বে ছিল, তারা সেই আস্থার প্রতিদান দিতে পেরেছে কি? নির্মাণকাজে বারবার দেখা দেওয়া ত্রুটি, বিশেষ করে বাঁক এলাকায় বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ার মতো বিপজ্জনক ঘটনা, ইঙ্গিত দিচ্ছে তদারকির দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজের মধ্যে এক ধরনের আত্মতুষ্টি ও অবহেলা ছিল।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) এবং প্রকল্প পরিচালকদের দুজনেরই কারিগরি পটভূমি ছিল না। এমন এক জটিল ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রকল্পে নেতৃত্ব যখন অকারিগরি অদক্ষ ও রাজনৈতিকভাবে পদপ্রাপ্ত ইতরবিশেষের হাতে, তখন ভুল সিদ্ধান্তের আশঙ্কা অনিবার্য। উপরন্তু, নির্বাচনের আগে প্রকল্প উদ্বোধনের তাড়ায় অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তাড়াহুড়ো করে। সেখানে কাজের গুরুত্ব না দিয়ে যেন ‘সময়মতো’ কাজ শেষ করার নামেই মান নিয়ন্ত্রণকে দ্বিতীয় সারিতে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। আজ তার খেসারত দিলেন আবুল কালাম আজাদ। 

বুয়েটের অধ্যাপক শামসুল হক যথার্থই বলেছেন, একটি বিয়ারিং প্যাডের খুলে পড়া কোনো স্বাভাবিক ক্ষয় নয়; এটি নকশা ও বাস্তবায়নের মৌলিক ত্রুটির ফল। এমন ত্রুটি কেবল প্রকৌশলগত নয়, এটি প্রশাসনিক ও নীতিগতও। কারণ, যেখানে ঝুঁকি মূল্যায়ন ও নিরাপত্তা নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত, সেখানে তৃতীয় পক্ষের নিরীক্ষা ছাড়াই মেট্রোরেল চালু করা হয়েছে। এই দায়ভার কি শুধু ঠিকাদার বা পরামর্শকের? নাকি রাষ্ট্র ও প্রকল্প পরিচালকেরও নৈতিক দায় আছে?

আরও বিস্ময়ের বিষয়, শুধু মেট্রোরেল নয়, দেশের অন্য মেগা প্রকল্পগুলোতেও একই চিত্র। সেখানে তৃতীয় পক্ষের নিরাপত্তা অডিট অনুপস্থিত। অথচ উন্নত বিশ্বে প্রতিটি বড় অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য এটি বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশে এখন উন্নয়নের পরিমাণ বাড়ছে, কিন্তু সেই উন্নয়নের গুণগত মানের নিশ্চয়তা কোথায়? আমরা যেন প্রকল্প শেষ করার প্রতিযোগিতায় এতটাই মগ্ন যে, টেকসইতা ও নিরাপত্তার মূল দর্শনটাই হারিয়ে ফেলেছি।

অন্যদিকে, জাপানের মতো বন্ধুরাষ্ট্রের সহায়তা ও ঋণ দিয়ে সম্পন্ন এই প্রকল্পের আর্থিক দিকও প্রশ্নের মুখে। প্রতি কিলোমিটার মেট্রোরেল নির্মাণে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে, যা প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। এ ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিশ্চিত করা, কিংবা পরামর্শক সংস্থার কার্যকারিতা পর্যালোচনা করা এখন সময়ের দাবি।

প্রশ্ন উঠেছে, এখানে ত্রুটি না তদারকির ব্যর্থতা—কোনটা মূল ভূমিকা রেখেছে? কারণ, বিয়ারিং প্যাড মেট্রোরেল কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যা ভায়াডাক্ট ও পিয়ারের মধ্যে স্থাপন করা হয়, কম্পন নিয়ন্ত্রণ করে এবং পুরো কাঠামোর ভার সুষমভাবে বণ্টন করে। প্রতিটি পিয়ারে থাকে চারটি প্যাড। এগুলো বোঝার জন্যই, অবিলম্বে পুরো রুটে স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের নিরাপত্তা অডিট শুরু করতে হবে। পাশাপাশি তদন্ত কমিটিকে পুনর্গঠন করে এর নেতৃত্ব দিতে হবে প্রকৌশল ও ঝুঁকি বিশ্লেষণ বিষয়ে স্বনামধন্য স্বতন্ত্র বিশেষজ্ঞদের। অন্যদিকে ভবিষ্যতের সব মেগা প্রকল্পে “নিরাপত্তা-প্রথম” নীতি বাধ্যতামূলক করতে হবে। না হলে মেট্রোরেলের মতো অন্য মেগাপ্রকল্পগুলোকে সামনে রেখেও লাশের সারি দীর্ঘায়িত হবে। 

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়। 


Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন