জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়ার আলাপ
রিফর্ম-ফার্স্ট’ বয়ান ও গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেটের সংকট
আসিফ বিন আলী
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৫, ০৪:০৫ পিএম
জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া তাঁর ফেসবুকে একটা ধারাবাহিক লেখা লিখছেন, শিরোনাম "আগামী পাঁচ বছরে আমরা কোথায় যাচ্ছি? পঞ্চম অংশের মূল আলোচ্য বিষয় বিএনপি ক্ষমতায় এলে--সম্ভাব্য চিত্র। তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৪তম সেনাপ্রধান ছিলেন ও তাঁর লেখা বিস্তারিত আলোচনার দাবি রাখে।
আমি লেখাটা পড়ে যে জিনিসটা দেখেছি, তা হলো, এখানে নির্বাচিত রাজনীতিকদের “সমস্যা” এবং অ-নির্বাচিত এলিট/উপদেষ্টা/সমঝোতা-সরকারকে “সমাধান” হিসেবে দেখানো হয়েছে। এই ফ্রেমিংটা আমাকে অস্বস্তিতে ফেলে, কেননা এই ফ্রেমিং গণতন্ত্র বিরোধী। এতে প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নটা পাশ কাটিয়ে “কার্যকারিতা”কে একমাত্র গুণ বানানো হয়, যেন ভোট পরে, বাছাই আগে। আমার কাছে এটা বিপজ্জনক স্লিপারি-স্লোপ বলেই মনে হয় যেখানে লেখক জনগণের ম্যান্ডেট আর নিয়মিত নির্বাচনের জায়গায় “গার্ডিয়ানশিপ” বা অভিভাবক-শাসন কে বৈধতা দিচ্ছেন।
জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া তাঁর পুরো লেখায় ভয়কে রাজনৈতিক মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার করেছেন; ভারতের চাপ, অর্থনীতির সংকট, পুলিশ অকার্যকর, রাস্তার সহিংসতা ইত্যাদি। তারপর বলেছেন, তাই হয়তো অন্তর্বর্তী সরকারকে সময় বাড়াতে হবে, হয়তো “বিশেষ ব্যবস্থা” দরকার। এই ভয় + অনিবার্যতার বয়ান জনমনে এমন ধারণা বসায় যে নির্বাচন ঝুঁকিপূর্ণ, নির্বাচন না হওয়া বা দেরিতে হওয়াই নিরাপদ ও সমাধান। আমি এটাকে “ইলেকশন-অপশনাল” মানসিকতা তৈরির কৌশল হিসেবে দেখি, যেখানে ব্যালটের ঘড়ি থামিয়ে রাখার বয়ান তৈরি করা হয়।
জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া যখন লেখেন “রিফর্ম আগে, নির্বাচন পরে” তা আসলে একধরনের উল্টো সিকোয়েন্স। তিনি এই বিষয়কে স্বাভাবিক করছেন মাত্র। আমার কাছে এর অর্থ দাঁড়ায়: ম্যান্ডেটহীন শক্তির হাতে বড় সংস্কার তুলে দেওয়া। টেকসই গণতন্ত্রে তো উল্টোটাঃ নির্বাচন থেকে ম্যান্ডেট সেখান থেকে সংস্কার। “রিফর্ম-ফার্স্ট” খুব তাড়াতাড়ি “পোলস-লেটার” হয়ে যায়, আর পিছিয়ে পড়া ভোটটা ফিরতেই চায় না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অন্তত তাই দেখি আমরা।
জেনারেল ভূঁইয়া লেখায় নিরাপত্তা কাঠামোকে এক ধরনের “নিরপেক্ষ ম্যানেজার” হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, পুলিশকে “অলস ঘোড়া” বলেছেন, সেনাকে মাঠে রাখার প্রশ্নকে কেবল ম্যানেজমেন্ট-ইস্যু হিসেবে দেখেছেন। এতে বেসামরিক জবাবদিহি আড়াল হয়, আর নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ডি-ফ্যাক্টো রাজনৈতিক রেফারি হয়ে ওঠে। আমার ভয়, জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া মতন ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা যখন এরকম বয়ানের “নরমালাইজেশন” করতে থাকেন তা আসলে দীর্ঘমেয়াদে নির্বাচনী রাজনীতির প্রাণশক্তি ধ্বংস করে দিতে পারে।
জেনারেল ভূঁইয়া সম্ভাব্য বিএনপি সরকারকে আগেভাগেই “সমস্যাজনক” ধরে নিয়েছেন, এরা দুর্নীতি করবে, ভারত সামলাতে পারবে না, রাস্তায় সহিংসতা হবে, এসব পূর্বাভাস দিয়েছেন, যা আসলে আগাম অবমূল্যায়ন। এতে একটা বার্তা যায়: “ভুল” দল জিতলে সেটিকে “ম্যানেজ” করা ন্যায্য। জেনারেল ভূঁইয়া এখানে বিএনপিকে ভুল দল হিসেবেই দেখছেন, ও নির্বাচনী গণতন্ত্রের মূল শর্ত শান্তিপূর্ণ ক্ষমতার পালাবদল কে শর্তাধীন করে ফেলছেন।
জেনারেল ভূঁইয়ার বয়ানে নাগরিকেরা নায়ক নয়, বরং “ঝুঁকি”। সমাধান সব এলিট-ঘরের সমঝোতা: উপদেষ্টা, “যোগ্য” নির্দলীয়, ঐকমত্যের সরকার। এটি ক্লাসিক এলিট-সাবস্টিটিউশন, জনসম্মতিকে সরিয়ে পেছনের দরজার চুক্তি সামনে আনা। এতে দল-ভোটার-নীতির স্বাভাবিক সংযোগ ঢিলে হয়; আস্থা কমে, অংশগ্রহণও কমে। আরেকটা বিষয় হলো “বহির্দেশের ভেটো”, বিশেষ করে ভারতের কার্ড। তাঁর লেখায় এমন ইঙ্গিত আছে যে নীতি-প্রসঙ্গগুলোতে বাইরের “রেড লাইন” চূড়ান্ত। আমি একে সার্বভৌম ভোটের খণ্ডন বলেই দেখি, যেখানে জনমত আগে থেকেই সংকুচিত বৃত্তে বন্দি করে দেখান ক্ষমতাবান এলিটরা।
জেনারেল ভূঁইয়া এর লেখা পড়ে মনে হয়েছে তিনি তাঁর লেখায় ভয়-নির্ভরতা, “রিফর্ম-ফার্স্ট” সিকোয়েন্স, এলিট/টেকনোক্র্যাটিক সমাধান, আর নিরাপত্তা-ম্যানেজমেন্টের স্বাভাবিকীকরণ এর বৈধতা দিতে চেয়েছেন। তিনি আমাদের কমন-সেন্সকে ব্যালট থেকে সরিয়ে “গার্ডিয়ানশিপ”-এ ঠেলে দিচ্ছেন। এটা যতই “প্রাগম্যাটিক” শোনাক, বাস্তবে এই ধরনের বয়ান নির্বাচনী গণতন্ত্রকে নানাভাবে হুমকিতে ফেলে। একটি প্রজাতন্ত্র স্থিতি পায় ব্যালটের ঘড়িতে। যে ঘড়ি কারও ইচ্ছেমতো থামানো যায় না। জেনারেল ভূঁইয়া “দক্ষ ব্যবস্থাপনা”র নামে যদি সেই ঘড়ির কাঁটা পিছিয়ে দিতে বলেন, তবে তা বাস্তবে স্থবিরতাই জন্ম দেয়। আমাদের চেষ্টা করা উচিত ভোটারকেই ক্ষমতার কেন্দ্রে রাখা, এবং সব রাজনৈতিক শক্তিকে সেই নির্বাচনী ঘড়ির অধীন নিয়ে আসা। ঐটাই আমাদের জন্য জন্য মুক্তির পথ।
আসিফ বিন আলী বর্তমানে কাজ করছেন আমেরিকার জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটিতে। তিনি পেশায় শিক্ষক, গবেষক ও স্বাধীন সাংবাদিক।
