Logo
Logo
×

অভিমত

সাউথ ব্লকের রাজনীতি এবং তার ধারকেরা

কাকন রেজা

কাকন রেজা

প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৭:৪৪ পিএম

সাউথ ব্লকের রাজনীতি এবং তার ধারকেরা

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে একজন জটবাঁধা চুলের মানুষ, যিনি নিজেকে ফকির দাবি করেন, তার চুলকাটা নিয়ে শোরগোল শুরু হয়েছে। বিশেষ করে প্রগতির দাবিদার অনেকে এটা নিয়ে তুলকালাম বাঁধিয়ে ফেলেছে। এই তুলকালামে রাজনীতিও আছে। 

কেন বলছি উদ্দেশ্যমূলক, ইউটিউবে দেখবেন এমন চুল-দাড়ি কাটা নিয়ে অনেক ভিডিও রয়েছে। রাস্তার ভ্যাগাবন্ডদের ধরে তাদের সভ্য বানানো হচ্ছে, পাগলকে ধরে জটবাঁধা চুল কেটে, দাড়ি কেটে তাকে স্যুটকোট পরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আর এসব ভিডিও থেকে শুধু সামাজিক কার্যক্রমে উৎসাহিত করা নয়, আয়ও হচ্ছে বেশ। বলতে পারেন, এক ঢিলে দুই পাখি। সামাজিক কাজও হচ্ছে, সাথে পকেটও ভরছে। সুতরাং এসব বিদেশি ভিডিও দেখে দেশি কারো উৎসাহিত হওয়া অমূলক কিছু নয়। এরমধ্যে উদ্দেশ্য খোঁজাটাই উল্টো প্রশ্নের সৃষ্টি করে। আর সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে পেছনের রাজনীতিটা পরিষ্কার হয়ে যায়। 

কী সে রাজনীতি? সে রাজনীতিটা হলো, পতিত ফ্যাসিস্টদের প্রত্যাবর্তনের পথটা সুগম করা। কারণ ভারতীয় সাউথ ব্লক ভাবে যে শুধুমাত্র ইসলামফোব তৈরির মধ্যে দিয়েই তাদের মিত্রদের বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসীন করা সম্ভব। গত দেড় দশক ঠিক এভাবেই বাংলাদেশে তাদের মিত্র তথা ফ্যাসিস্ট রেজিমকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়েছিল। এখন তারা মরিয়া আবার সেই অস্ত্র প্রয়োগে। জাতিসংঘে গিয়ে এবার প্রধান উপদেষ্টা বলতে গেলে, সে কথাটিই উচ্চারণ করেছেন। প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, ভারত ছাত্রদের এই বিপ্লব মেনে নিতে পারেনি। পারেনি এদেশের ভারতের অংশীজনেরাও। কারণ জুলাই বিপ্লব সেই ইসলাম বিদ্বেষের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছে। জুলাই বিপ্লব ইনক্লুসিভ সমাজ-রাজনীতির কথা বলেছে। যে সমাজ-রাজনীতিতে সবাই সমান অংশীজন। অথচ দিল্লির সাউথ ব্লক চায়, মুসলমানদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক বানাতে। তাদের জঙ্গি প্রমাণ করে, তাদের নিপীড়নের মধ্যে রাখা। কিন্তু জুলাই বিপ্লবের পর যেহেতু জিয়াউল, মনিরুল, বেনজীর, মামুন, হারুনরা নেই, তাই জঙ্গি নাটক সাজানো অনেকটাই দূরূহ। সে কারণেই ইসলামিস্টদের বোকা অংশটাকে উসকে দিয়ে মাজার-খানকা ভাঙার অপকর্মগুলো ঘটানো হচ্ছে। খোদ কোরআন যেখানে বলছে, যার যার ধর্ম তার, সেখানে কথিত তৌহিদি জানতার নামে এসব ঘটানো হচ্ছে দেশটাতে ইসলামিস্টদের উত্থান প্রমাণের জন্য। সেই কৌশলের অংশ হলো এই চুলকাটার ঘটনা ফাঁপিয়ে প্রচার করা। 

দেখবেন, একশ্রেণির বুদ্ধিজীবীর যেন পুচ্ছে আগুন ধরে গেছে ফ্যাসিস্ট পতনের পর। তাদের ক্ষোভ কেন তাদের তাড়ানো হলো। তারা তো এই দেশেরই মানুষ, তাদের কেন রাজনীতিতে অংশ নিতে দেওয়া হবে না। এদের আসলে জার্মান পাঠিয়ে দেওয়া দরকার। তাদের জানা দরকার নাৎসিদের কিছুটা জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও কেন তাদের নিষিদ্ধ করা হয়েছিল এবং তারা নিষিদ্ধ রয়েছে। বাংলাদেশের গণতন্ত্র নিশ্চয়ই জার্মান গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার চেয়ে উন্নত নয়। সেখানে ভোট চুরির প্রশ্ন নেই, দিনের ভোট রাতে হয় না। সুতরাং সেখানে কেন নাৎসিরা নিষিদ্ধ তা বাংলাদেশের কথিত বুদ্ধিভ্রষ্ট বুদ্ধিজীবীদের বোঝা উচিত। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার তো যেনতেন কারণে মানুষকে বিদেশে পাঠাতেন। পাঠাতেন, জালবোনা শিখতে, ঘাসচাষ শিখতে, পুকুর পরিষ্কার করা শিখতে। বর্তমান সরকার অন্তত গণতন্ত্রের শিক্ষাটা নেওয়ার জন্য এসব বুদ্ধিভ্রষ্ট বুদ্ধিজীবীদের জার্মান পাঠাতে পারেন। সাথে কিছু বুদ্ধিভ্রষ্ট রাজনীতিককেও পাঠানো যেতে পারে। 

এই বুদ্ধিজীবী এবং রাজনীতিকরা এসব বলতেন না, যদি তাতের পিতা বা ভাই বা সন্তান জুলাই আন্দোলনে শহীদ হতেন। কিংবা গত সতেরো বছরের আন্দোলনে ক্রসফায়ার বা গুম-খুনের শিকার হতেন। দেখেন যারা বলেন নাৎসি পুনর্বাসনের কথা, তাদের কারোরই পরিবারে এমন ট্র্যাজেডি নেই। তাদের প্রায় সবার সন্তান বিদেশে পড়াশোনা করে। রয়েছে নিরাপদ জীবন। আমাদের সন্তানেরা হয় আন্দোলনে গুলির মুখোমুখি কিংবা গুম-খুনের শিকার। সুতরাং আমাদের চিন্তা, দুঃখবোধ, ক্ষোভ এসব বুদ্ধিভ্রষ্ট বুদ্ধিজীবী আর পরান্নভোজী রাজনীতিকদের সঙ্গে মিলবে না। তাদের চিন্তা মিলেমিশে ভাগ করে খাওয়ার। যাতে তাদের সন্তানরা শুধু থাকে দুধে-ভাতে, আর আমাদের সন্তানরা গুলির মুখে। নাৎসিদের মতন এদেরও নিষিদ্ধ করা উচিত। এদের দায়ও কম নয় দীর্ঘ দেড় দশকের গুম-খুন এবং জুলাই বিপ্লবের অকাতর হত্যায়। এরাও খুনের আসামি হতে পারে, আইন একে প্ররোচনা হিসেবেও ধরতে পারে। যে প্ররোচনা আগামীর আরেকটি গণহত্যার। 

শুরু করেছিলাম জটবাঁধা চুলকাটা নিয়ে। দেখলাম, কাগজে লিখা হচ্ছে, যার চুল কাটা হচ্ছে সে আল্লাহর কাছে বিচার দিচ্ছে, ‘আল্লাহ তুই দেখিস’ বলে। এই কথায় এসব কাগজের আফসোসের সীমা নেই। আমাদের কিছু কথিত বিজ্ঞানমনষ্ক রয়েছেন, যারা নিজেদের রীতিমত মাইক মেরে অসাম্প্রদায়িক ও বিজ্ঞানমনষ্ক প্রচার করেন, তাদের অনেকেই অ্যালকোহল ও গাঁজায় আসক্ত। তারা এমনি বিজ্ঞানমনষ্ক যে, বিজ্ঞান নিষেধ করলেও তাদের কাছে নেশা জায়েজ কর্ম। এদের কথিত অসাম্প্রদায়িকতা ও বিজ্ঞানমনষ্কতাও রাজনৈতিক এবং সে রাজনীতি দিল্লির সাউথ ব্লকের। 

নোট: এই লেখা আবার স্বঘোষিত ইসলামিস্টরা লুফে নিয়েন না। আপনাদের জন্যই, আপনাদের মুর্খতার জন্যই ইসলাম কলঙ্কিত হয়েছে বারবার। ইসলাম দাওয়াতের কথা বলেছে, অর্থাৎ আহ্বানের কথা বলেছে, জবরদস্তির কথা বলেনি। ইসলাম যদি জবরদস্তির কথা বলতো তবে রাসুল (সা.) এর মক্কা বিজয়ের পর একজনও বিধর্মী থাকতে পারতো না, সবাইকে জবরদস্তি করে মুসলমান বানানো হতো। কিন্তু রাসুল (সা.) তা করেননি। কারণ, ইসলাম জবরদস্তিকে নিরুৎসাহিত করে, ইসলাম জবরদস্তিকে অনুমোদন দেয় না। সুতরাং এই যে নানান জবরদস্তি, তা মূলত দিল্লির সাউথ ব্লকের চাল, কৌশল। আর এটা না বুঝতে পারাটাই মুর্খতা, গাধামি। 

Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন