বৃদ্ধ বনাম তরুণ চিন্তা, চিন্তার ম্যাচিউরিটি এবং জুলাই বিপ্লবের পরিবর্তিত পরিস্থিতি
আমি যখন লিখছি তখন বাংলাদেশ কম্যুনিস্ট পার্টি তথা সিপিবি’র ত্রয়োদশ সম্মেলন শুরু হয়েছে। চারদিনব্যাপী সম্মেলন। প্রথম দিনেই সিপিবি বলছে, ‘যারা নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক করছে, তারা গণতন্ত্রের শত্রু’।
হ্যাঁ, প্রথম আলো’র খবরের শিরোনাম ঠিক এমনটাই। সিপিবি যখন গণতন্ত্রের পক্ষে বলে, তখন শঙ্কা জাগে। কম্যুনিজম, সাম্যবাদের সাথে গণতন্ত্রের একটা কন্ট্রাস্ট রয়েছে এবং এর ব্যাখ্যা কম্যুনিজমেই দেয়া আছে। কেন কন্ট্রাস্ট তাও বলা আছে লাল বইয়ের কালো অক্ষরে। না, আমি কম্যুনিজম আর ডেমোক্র্যাসির পার্থক্য করতে বসিনি। বলতে পারেন, তবে কেন সিপিবি নিয়ে কথা বলছি।
এই প্রশ্নের আগে ইঁদুর বিষয়ক একটা প্রচলিত কথায় আসি। জাহাজ যখন ডুবতে শুরু করে, তখন নাকি সবার আগে টের পায় ইঁদুর। বাঁচার জন্য জাহাজ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সিপিবি অনেকটা তেমনি আওয়ামী ফ্যাসিজমের জাহাজটি ডোবার খবর আগাম জেনেছিল। জেনেছিল এ কারণে যে, অন্যান্য দেশের কম্যুনিস্ট পার্টির সাথে তাদের ভালো যোগাযোগ রয়েছে।
সিপিবি’র সম্মেলন বিষয়ক প্রথম আলো’র খবরটি পুরো পড়লেই তার প্রমাণ পাওয়া যাবে। দেখা যাবে বিভিন্ন দেশের কম্যুনিস্ট পার্টি সিপিবিকে শুভেচ্ছা জানিয়েছে এবং তারমধ্যে পাকিস্তান ও তুরস্কের কম্যুনিস্ট পার্টিও রয়েছে। সুতরাং বলতে দ্বিধা নেই, অন্যান্য সোকল্ড মধ্যপন্থীদের, কম্যুনিস্টদের ভাষায় পেটি বুর্জোয়া দলগুলোর চেয়ে সিপিবি’র গ্লোবাল নেটওয়ার্ক ভালো এবং কার্যক্ষম। একারণেই গ্লোবাল পলিটিক্স বিষয়ে তাদের জানাশোনা বেশি। সঙ্গতই সিপিবি আওয়ামী জাহাজ ডোবার খবর আগেই পেয়ে গিয়েছিল। সুতরাং তারা ভেবেচিন্তেই দীর্ঘদিনের পথসঙ্গীকে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সিপিবি নিয়ে আলাপ সে কারণেই।
কিন্তু ছেড়ে তারা কী করবে? সংখ্যার অল্পতা নিয়ে তো তাদের টিকে থাকা সম্ভব নয়, অন্তত আওয়ামী ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠা মানুষের বিপক্ষে দাঁড়ানোর সাধ্য ও সক্ষমতা তাদের নেই। তাই হয়তো তারা যোগ দিয়েছিল জুলাই বিপ্লবীদের সাথে। বিশেষ করে ছাত্র ইউনিয়ন জুড়ে গিয়েছিল জুলাই বিপ্লবের সাথে। কিন্তু সত্যিকার অর্থেই কি তারা জুলাইয়ের চিন্তাকে ধারণ করতে পেরেছিল? তাদের সাম্প্রতিক কথাবার্তায় এ বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। আমি তো শুধু সন্দেহের অবকাশ-এর কথা বলছি, কেউ কেউ তো প্রকাশ্যেই বলছেন, তাদের কার্যকলাপ মূলত জুলাই বিপ্লবকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে। ছাত্র ইউনিয়নের একজন মেঘমল্লার বসু সেই প্রশ্নবিদ্ধতাকে সামাল দেয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।
মেঘমল্লার বসুকে টেনে আনলাম কেন, এটাও একটা প্রশ্ন। টেনে আনলাম এ কারণে যে, রাজনীতিতে বয়স্কদের ব্যর্থতা দেখতে দেখতে এদেশের মানুষ ক্লান্ত। জুলাই বিপ্লবের পর সব দলেরই অনেক বৃদ্ধ, যারা নিজেদের ঝানু রাজনীতিবিদ হিসেবে জাহির করেন, তাদের কার্যকলাপ আর কথাবার্তায় মানুষ বিরক্ত। বিপরীতে তরুণরা অনেক ম্যাচিউর। মুশকিল হলো বৃদ্ধরা তরুণদের এই ম্যাচিউরিটিকে মানতে চাচ্ছেন না। গ্রামের খাটাশ মোড়লদের মতন গ্রামীণ রাজনীতি শুরু করেছেন তরুণদের বিরুদ্ধে। মানুষ এটাও ভালো ভাবে নেয়নি। ঢাকসু আর জাকসু তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। বলতে পারেন, এখানে তো জামায়াতের ছাত্র সংগঠন জিতেছে। এই বলাটাও ব্যর্থ বৃদ্ধদের বয়ান। এখানে জিতেছে মূলত তরুণরা। জামায়াতের ভেতর থেকে গড়ে উঠা তরুণ ও আধুনিক চিন্তা জিতেছে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে। আপনারা ভেতরে খবর নিয়ে দেখেন, জামায়াতের কথিত ঝানু ও বৃদ্ধদের অনেকেই সাদিক কায়েমের কাজকারবার পছন্দ করছেন না। কিন্তু তরুণ তুর্কিদের সামনে বলতেও পারছে না। একই অবস্থা বিএনপিরও। অবশ্য জামায়াতের বুড়োদের চেয়ে বিএনপির বুড়োরা কর্তৃত্বপরায়ণতায় এগিয়ে আছেন। যার ফলেই ছাত্রসংসদে বিএনপির ছাত্র সংগঠনের ভরাডুবি। আবিদের মতন একটা ছেলে, যে কিনা জুলাই বিপ্লবের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তাকেও পরাজিত হতে হয়েছে।
ম্যাচিউরিটি’র কথা বলছিলাম। যারা এখনো ভাবেন ম্যাচিউরিটি শুধু বয়স নির্ভর, তারা মূর্খের স্বর্গে বাস করছেন। ডাকসু’র কথা আবার বলি, এখানেও বৃদ্ধ চিন্তার ছাত্রনেতৃত্ব ছিল। না হলে হল কমিটি ঘোষণার মতন ভুলটা করতো না ছাত্রদল। এখানেই ম্যাচিউরিটি’র আলাপ এবং ম্যাচিউরিটি যে বয়সভিত্তিক কোনো প্রকল্প নয়, তার প্রমাণ। সিপিবি’র ত্রয়োদশ সম্মেলনের প্রথম যে ছবিটি প্রকাশ করেছে প্রথম আলো, সেখানে দেখা গেছে বৃদ্ধ এবং বৃদ্ধ চিন্তার সংখ্যাধিক্য। যেন বুড়ো হলে এবং সে বুড়োমি পর্যাপ্ত হলেই সিপিবি’র নেতা হওয়া যায়। ম্যাচিউরিটি’র প্রচলিত এই চিন্তা যে ভুল তা কম্যুনিস্ট দলগুলোর সংখ্যাল্পতায় পরিষ্কার বোঝা যায়। শ্রমজীবী মানুষের কথা বলা দলগুলো মানুষের মধ্যেই নেই। মানুষ তাদের সন্দেহের চোখে দেখে। তাদের কথা, তাদের সাংস্কৃতিক আচরণ, স্বাভাবিক ও সহজাত মানুষের সাথে যায় না। শিবির যখন সাধারণ মানুষের সহজাত জীবন প্রণালীর সাথে নিজদের টিউনড করার চেষ্টা করছে, যদিও জামায়াত এখনো এমন চিন্তার বিপরীতে, সেখানে সিপিবি এগুচ্ছে সেই পুরানো বয়ান নিয়ে। সেখানে এক মেঘমল্লার আর কতটুকু বৃষ্টি ঝরাতে পারবে। তারও পর, সিপিবি’র চিন্তক এবং অ্যানালিস্টরাও বর্তমান সময়কে দেখছে ঘোলা হয়ে যাওয়া পুরানো চশমা দিয়ে। অপরিণতদের ব্যর্থতাটা এখানেই। যে ব্যর্থতা জুলাই বিপ্লব পরর্বতী পরিস্থিতির সাথে যাচ্ছে না। এনিয়ে জোর-জবরদস্তি করলে বুড়োদের ব্যর্থতা হয়তো দেশটাকেই ব্যর্থ করে দেবে।
নোট : জানি এই লেখা পড়ার পর কেউ কেউ চরম বিরক্ত হবেন। বিরূপ মন্তব্যও করতে পারেন। বুড়োদের অবশ্য মুখে স্ল্যাং বলা সম্ভব নয়, তবু মনে মনে বলবেন। বলুন, কিন্তু তার পরও বলি, দেশটার কথা চিন্তা করুন। তরুণরা যে ইনক্লুসিভ দেশের আশায় জীবন দিয়েছে, পঙ্গু হয়েছে, তাদের আত্মত্যাগের মর্যাদা দিন। নাহলে আপনাদের জন্য অপেক্ষা করছে নিশ্চিত করুণ পরিণতি।

