Logo
Logo
×

অভিমত

আরব বিশ্বের সংঘাতময় রূপান্তরের ধারা কী দক্ষিণ এশিয়াতেও ঘটতে যাচ্ছে?

ড. মো. আদনান আরিফ সালিম

ড. মো. আদনান আরিফ সালিম

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১০:১৯ পিএম

আরব বিশ্বের সংঘাতময় রূপান্তরের ধারা কী দক্ষিণ এশিয়াতেও ঘটতে যাচ্ছে?

আজ থেকে প্রায় দেড় দশক আগের কথিত আরব বসন্ত আরব বিশ্বের অনেক দেশের শাসনব্যবস্থায় যে পরিবর্তনের সূচনা করে, অনেকের মতে সেখানে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ছিল। তারা মধ্যপ্রাচ্যে তাদের নিজস্ব স্বার্থে দীর্ঘকাল ধরেই হস্তক্ষেপ করে চলছে। তবে এশিয়ায়, এটা শুধু যুক্তরাষ্ট্রই নয়, বরং চীন এবং তাদের সংঘর্ষকারী স্বার্থগুলোও দৃশ্যমান। পাশাপাশি ফ্যাসিবাদী শাসন এই আন্দোলনগুলোর দিশা এবং ফলাফলকে প্রভাবিত করেছিল বহুলাংশে। 

এই বিষয়গুলো নিয়ে অনেক বিশ্লেষক এখনই প্রশ্ন তুলেছেন এই আন্দোলন কী তবে ‘দক্ষিণ এশিয়ার বসন্ত' নিয়ে আসতে উন্মুখ? বাংলাদেশ এবং নেপাল তাদের বসন্ত দেখতে পেয়েছে। ভারতের নানা স্থানে চলমান আন্দোলন শেষ অবধি কোথায় গিয়ে ঠেকে সেটা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে দেদার। অনেকে আগ বাড়িয়ে বলতে চাইছেন ভারত ও পাকিস্তানের অখণ্ডতা নিশ্চিত করতে পারবে তো তাদের সরকার? 

দক্ষিণ এশীয় বসন্ত কোথায় গিয়ে থামবে বলা কঠিন। তবে তা ধীরে ধীরে সব হিসেব পাল্টে নতুন একটি প্রতিরোধের রূপ নিচ্ছে। তাই বিশ্লেষকগণ এই গণবিক্ষোভের মাঝে আরব বসন্তের প্রতিধ্বনি শুনতে পাচ্ছেন। তবে তাদের সবার কাছেই এই বিক্ষোভের ফলাফল এখনও অজানা। তিউনিসিয়ায় বুয়াজিজির আত্মদাহের পর এক মাসের মধ্যে প্রেসিডেন্ট বেন আলী দেশ ছেড়ে পালিয়েছিলেন। আবু সাঈদ, ওয়াসিম, মুগ্ধ-ইয়ামিনদের হত্যা করার সপ্তাহ পার হওয়ার আগেই হেলিকপ্টারে করে ভারতে পালিয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদের প্রতীক শেখ হাসিনা। তবে প্রতিবাদের পর তিউনিসিয়ায় নতুন একটি সংবিধান এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সূচনা হয়, যা আজ পর্যন্ত টিকে আছে। ওদিকে মিশরে দানা বাঁধা প্রতিবাদ শীঘ্রই মুরশি সরকারের পতন ঘটায়। মিশর ফিরে যায় সামরিক শাসনের অধীনে। কিন্তু তখনকার সেই প্রতিবাদগুলো মহামারি হিসেবে ছড়িয়ে পড়েছিল লিবিয়া এবং সিরিয়াতেও। 

রাষ্ট্রের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে আরব দেশগুলোতে যে বিদ্রোহের সূচনা হয় এবং সেখানকার শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদগুলো দ্রুত গৃহযুদ্ধের দিকে রূপ নিয়েছিল। ওদিকে আমেরিকার সরাসরি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সেখানকার পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে উঠেছিল। এইসব অঞ্চলে মুসলিম ব্রাদারহুডের আকস্মিক উত্থান এবং তাদের সঙ্গে মার্কিন নীতির বৈরিতা পরিস্থিতি শান্ত হতে দেয়নি। মূলত উগ্র জাতীয়তাবাদী দক্ষিণপন্থার বিরুদ্ধে পুঁজিবাদীদের আধিপত্যবাদী লড়াই লিবিয়ায় ন্যাটোর হাতে মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতন ঘটায়। তাকে নির্মমভাবে মেরে ফেলার পর দেশটি আরও সংকটময় পরিস্থিতির মুখে পুরোপুরি ভেঙে পড়ে।  

সিরিয়ায় জনগণের প্রতিবাদগুলো বাশার আল-আসাদের বর্বর দমন-পীড়নের সম্মুখীন হয়। পরে রাশিয়া, ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিদেশি শক্তিগুলো তার মধ্যে জড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় বাশার আল আসাদও পালিয়ে যায়। তবে তারপর সিরিয়া ভয়াবহ গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল।  ইয়েমেন এবং বাহরাইনে প্রতিবাদগুলো সীমিত পরিসরে ক্ষমতার স্থানান্তরের মাধ্যমে শেষ হয়েছিল। আর এই পরিস্থিতিগুলো দক্ষিণ এশিয়ার মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে। 

তাই তারা আন্দোলনের পর পর যেকোনো মূল্যে শান্তি চাইছে। বাংলাদেশের মানুষ অপেক্ষা করছে একটি শান্তিপূর্ণ অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে। আর নেপালও সেদিকে হাঁটছে। দ্রোহ ও প্রতিরোধ থেকে বিপ্লবী রক্তপাতের বদলে দক্ষিণ এশিয়ায় বেশিরভাগ দেশের মানুষ মূলত শান্তি চাইছে। এজন্যই সেখনে আরব বসন্তের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সুযোগ কম। তবে বৃহদাকৃতির রাষ্ট্রগুলোর ভৌগোলিক সীমারেখা আগের মতো ধরে রাখতে হলে আরও বেশি রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক দিক থেকে সততা এবং নমনীয়তা দেখাতে হবে। পাশাপাশি ধর্মীয় উগ্রবাদকে প্রশ্রয় না দিয়ে পরধর্ম ও পরমত সহিষ্ণুতাকে প্রণোদিত করতে হবে। 

গণতন্ত্রের প্রতি বিমুখ হওয়াতে আরব বিশ্বের গভীর দ্বন্দ্ব এখনও অনির্দিষ্টকাল ধরে স্থায়ী হয়ে রয়েছে। বাহরাইনে, শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সানী রাজতন্ত্রের অধীনে সমতা এবং গণতান্ত্রিক সংস্কারের জন্য প্রতিবাদ হয়েছিল। আজও, সেক্টরীয় বিভাজনগুলো অব্যাহত রয়েছে, যেখানে শিয়া সম্প্রদায় এখনও রাজনৈতিকভাবে বঞ্চিত এবং বৈষম্যের অভিযোগ তুলছে, যদিও কিছু কসমেটিক সংস্কার করা হয়েছে। ইয়েমেনে, আলি আবদুল্লাহ সালেহর ৩৩ বছরের দুর্নীতিপূর্ণ শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভের কারণে প্রতিবাদ শুরু হয়। যদিও সালেহ উৎখাত হয়েছিলেন, তার উপ-প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহীরা সানা শহরে ক্ষমতা দখল করে। আজ, ইয়েমেনে বিশৃঙ্খলা চলছে।

আরব বসন্তের ফলাফলগুলো ছিল মূলত মিশ্র ধাঁচে। সেখানে তিউনিসিয়া একমাত্র দেশ যেখানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তবে সিরিয়া, লিবিয়া এবং ইয়েমেনে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা অব্যাহত রয়েছে। এদিকে, দক্ষিণ এশিয়ায় নেপাল, ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান এবং থাইল্যান্ডে সম্প্রতি হওয়া বড় আন্দোলনগুলোর ফলাফলগুলোও ভিন্ন হয়েছে। আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া রক্তাক্ত হলেও তার পরে সেভাবে রক্তপাত ঘটেনি। 

দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান অস্থিরতা একটি সমান্তরাল গতিপথ দেখাচ্ছে। নেপালে, সোশ্যাল মিডিয়া নিষেধাজ্ঞা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করেছে। ৭ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া প্রতিবাদ ৮ সেপ্টেম্বর ওলীর পদত্যাগের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। বাংলাদেশের বিপরীতে এই আন্দোলন ছিল ক্ষণস্থায়ী এবং অবশ্যই কম রক্তপাতের মধ্য দিয়ে এই রূপান্তর এসেছিল অনেকটা তিউনিসিয়ার মতোই। বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের বিপ্লব সরকারি চাকরিতে শেখ হাসিনা সরকারের তৈরি করা কোটা তথা সংরক্ষণবাদের বিরুদ্ধে ছিল। তবে সরাসরি গুলি চালিয়ে মানুষ হত্যার বিরুদ্ধে দেশের সবাই ফুঁসে উঠলে এটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পদত্যাগের পর হেলিকপ্টারে করে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছিল।  

অনেক ভারতপন্থী বিশ্লেষক বাংলাদেশকে মিশরের অস্থির পরবর্তী সময়ের মতো মনে করে প্রাণখুলে লিখে যাচ্ছে। কারণ দীর্ঘদিনের পর ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ার মতো ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্তি পেয়ে অতিরিক্ত স্বাধীনতা বাংলাদেশে কিছু বিচ্ছিন্ন স্বেচ্ছাচারিতার ঘটনা ঘটাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশেও প্রেসিডেন্ট হোসনি মুবারকের পতনের পরের মতো পরিস্থিতি বিরাজ করছে। নানা দলের মুখোমুখি অবস্থান আর স্বার্থ দেশটিতে স্থিতিশীলতা আনতে দিচ্ছে না। ওদিকে বাংলাদেশে নিয়মতান্ত্রিক সরকার গঠনের প্রশ্নে নির্বাচন করতে এখনও পাড়ি দিতে হবে অনেকটা পথ।

শ্রীলঙ্কায় ২০২২ সালের প্রতিবাদের সময় সেখানকার প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসার পতন ঘটার পর যে ঘটনাগুলো ঘটেছিল তা বাংলাদেশে সেভাবে ঘটেনি।  ওদিকে পাকিস্তান, ভারতের প্রতিবেশী। তাদের বারবার শাসন পরিবর্তনের কারণে  ইমরান খানের গ্রেফতারের বিরুদ্ধে বারবার প্রতিবাদ হয়েছে। ভারতে ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলন হচ্ছে। মোদির মৌলবাদের বিরুদ্ধে বিজয় থ্যালাপাথির মতো ফিল্মস্টার প্রতিবাদী জনসমাবেশে জনতার ঢল নামিয়েছেন। থাইল্যান্ডে, গত দশকে বহু আন্দোলন হয়েছে, এবং জুন মাসে, ব্যাংককে হাজার হাজার প্রতিবাদকারী প্রধানমন্ত্রী পেটংতান শিনাওত্রাকে পদত্যাগ করতে আহ্বান জানিয়েছেন।

আরবের মতোই, যুব নেতৃত্বাধীন এই আন্দোলন এশিয়াতেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সংগঠিত হয়েছে। জনতা প্রথমে দুর্নীতি এবং অসচ্ছলতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। ফলাফল স্বাভাবিকভাবেই ভিন্ন হয়েছে। তবে শক্তিশালী সংস্কার এবং অন্তর্ভুক্তিক শাসন ব্যবস্থা ছাড়া, ইয়েমেন, সিরিয়া এবং এমনকি বাংলাদেশ এবং শ্রীলঙ্কার মতো দেশে অস্থিরতা অব্যাহত থাকাটাই স্বাভাবিক। 

এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে মার্কিন এবং চীনের প্রভাবের পাশাপাশি আরও অনেক চলক সক্রিয়। বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা এবং ইন্দোনেশিয়া ভারতের জন্যও কৌশলগত গুরুত্ব রাখে। তাই  'দক্ষিণ এশিয়ায় যদি বসন্ত আসেও তবে এর ফলাফল অতীতের মত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।  আর তার সুদূর প্রসারী প্রভাবে সবার আগে ভাঙনের মুখে পড়বে ভারত ও পাকিস্তান। তবে স্বীকার করে নিতে হবে যে, দক্ষিণ এশিয়ায় তরুণদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া এই আন্দোলনগুলোর বিভিন্ন সাদৃশ্য এবং পার্থক্য রয়েছে আরব বসন্তের সঙ্গে। প্রথমত, দু'টি আন্দোলনেই মানুষের মূল দাবিগুলো ছিল সরকারের প্রতি এক ধরনের অগণতান্ত্রিক শাসন, অর্থনৈতিক সংকট এবং নাগরিক স্বাধীনতার প্রতি আক্রমণ। আবার, এশিয়ার অনেক দেশেই রাজনৈতিক দুর্নীতি, অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা, সরকারি অব্যবস্থাপনা এবং মানুষের মৌলিক অধিকার নিয়ে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এটি, নিঃসন্দেহে, এক ধরনের তরুণদের মধ্যে অশান্তি এবং চরম হতাশার প্রতিফলন, যারা সমাজের মূলধারায় বা সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিজেদের স্থান খুঁজে পায় না।

বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়া—এই দেশগুলোর মধ্যে দৃশ্যমান সাদৃশ্য হলো, সবগুলো দেশেই মূল আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে তরুণরা। আরব বসন্তের ক্ষেত্রেও মূল নেতৃত্ব ছিল বিক্ষুব্ধ তরুণদের। বাংলাদেশের বর্তমান আন্দোলনগুলোতেও মূলত শিক্ষার্থীরা, যারা তাদের অধিকার ও সামাজিক ন্যায়ের পক্ষে রাস্তায় নেমে এসেছে, তারা সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। নেপাল এবং শ্রীলঙ্কার আন্দোলনগুলোতেও বিশেষভাবে তরুণরা তাদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরছে। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এই যুব আন্দোলনগুলোর মধ্যেই এক আশ্চর্য শক্তি রয়েছে। এখানে পাওয়া গিয়েছে একটি আদর্শিক এবং সাংস্কৃতিক রূপান্তরের অঙ্গীকার।

তবে, দক্ষিণ এশিয়ায় 'এশীয় বসন্ত' ধারণাটি আরব বসন্তের থেকে কিছুটা ভিন্ন। প্রথমত, দক্ষিণ এশিয়ার দেশের রাজনীতির কাঠামো এবং শাসনতন্ত্র আরব দেশের তুলনায় ভিন্ন। এশিয়ায় রাজনৈতিক ঐতিহ্য এবং সমাজ ব্যবস্থা কিছুটা জটিল, যেখানে ধর্ম, সংস্কৃতি, এবং জাতীয়তাবাদ আরো গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করে। আরব বসন্তের বিপ্লবগুলোতে মূলত মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার একনায়কত্বের পতন ছিল লক্ষ্য, তবে দক্ষিণ এশিয়ায় আন্দোলনগুলো আরো বিচিত্র, যেখানে সাধারণ জনগণের বৃহত্তর অংশ—বিশেষত যুবসমাজ—আরও নির্দিষ্ট স্থানীয় ইস্যু ও সমস্যার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াচ্ছে।

আরব বসন্তের যে প্রধান মৌলিকত্ব ছিল তা হলো শাসকশ্রেণীকে উৎখাত করার অঙ্গীকার, যেখানে জনগণ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সামগ্রিকভাবে বিদ্রোহ করেছিল। তবে দক্ষিণ এশিয়ায় তরুণদের মধ্যে এই আন্দোলনগুলো অনেক ক্ষেত্রে সরকারের পদত্যাগ অথবা শাসকের পরিবর্তন চাইছে না, বরং তারা শাসনতন্ত্রের সংস্কার এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচারের দাবি জানাচ্ছে। শ্রীলঙ্কায়, উদাহরণস্বরূপ, অর্থনৈতিক সংকট এবং মৌলিক চাহিদার অভাবের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চলছে, যা তাদের বিক্ষোভের মূল উৎস।

আরব বসন্তের মতো, এই আন্দোলনগুলোও এক ধরনের পরিবর্তনের শপথ, তবে তাদের লক্ষ্য স্থায়ী গণতন্ত্রের চেয়ে, সম্ভবত, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক উন্নতির দিকে বেশি। অন্যদিকে, দক্ষিণ এশিয়ায় মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈষম্য এবং জাতীয় সমস্যার সমাধান খোঁজার তাগিদও এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিছু ক্ষেত্রে, এর ফলে সরকারগণ নিজেদের প্রতিষ্ঠানগত সংস্কারে মনোযোগী হয়েছে, কিন্তু তবুও মেনে নেওয়া যায় না যে তারা জনগণের প্রকৃত চাহিদাগুলো পূরণ করতে সক্ষম।

দক্ষিণ এশিয়ায় সাম্প্রতিক উত্তাল পরিস্থিতি আরব বসন্তের প্রতিধ্বনি শোনাচ্ছে, যা ২০১০ সালের শুরুর দিকে উত্তর আফ্রিকা এবং পশ্চিম এশিয়া কাঁপিয়ে দিয়েছিল। এই সপ্তাহে, নেপালের জেনারেশন জি (Gen Z) আন্দোলনকারীরা হিমালয় অঞ্চলের বিভিন্ন শহরে রাস্তায় নেমে পুলিশদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে এবং প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগে বাধ্য করে। অনেকেই এই ঘটনার সঙ্গে আরব বিশ্বে গণতন্ত্রের পক্ষে হওয়া প্রতিবাদগুলোর সাদৃশ্য দেখতে শুরু করে। তারা প্রশ্ন তুলেছে, এটি কি 'এশীয় বসন্ত'?

নেপালেই যেমন, গত কয়েক বছরে এশিয়ায় একাধিক দেশে অস্থিরতার একই ধরণ দেখা গেছে। তবে বাংলাদেশে প্রতাপশালী ফ্যাসিবাদের পতন আন্দোলন ছিল অনেকটা সরকারের পক্ষ থেকে আরোপিত। তারা প্রতিবাদী জনতার উপর হামলা ও গুলিবর্ষণ করে আন্দোলনকে সরকার পতনের একদফা দাবির দিকে ধাবিত করেছিল। ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ এবং শ্রীলঙ্কায় প্রতিবাদগুলো বিশ্বব্যাপী মনোযোগ আকর্ষণ করেছে এর প্রকৃতিগত ভিন্নতায়। প্রথমে প্রতিবাদীরা শ্রীলঙ্কায় সরকারের পতন ঘটিয়েছে। তারপর ক্ষমতাধর মন্ত্রীদের ঠেঙ্গিয়ে জনবহুল রাস্তা দিয়ে অন্তর্বাস পরিয়ে দৌড় করিয়েছে। 

বাংলাদেশের কোটা সংস্কার আন্দোলনের ধারাবাহিক পরিণতি হিসেবে যেভাবে সরকারের পতন ঘটেছে সেখানে আরও ভয়াবহ রক্তপাত ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারতো। কিন্তু প্রধান বিরোধীদল হিসেবে বিএনপির সংযম, তাদের নেত্রী বেগম খালেদাজিয়া এবং নেতা তারেক রহমানের পরিস্থিতি শান্ত করার আকুতি হানাহানি প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে শিক্ষার্থী জনতাও দ্রুত আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে প্রতিশোধের বদলের পরিবেশকে বাসযোগ্য করার দিকে মন দিয়েছিল। ওদিকে পাকিস্তান এবং থাইল্যান্ডেও গত কয়েক বছরে বড় ধরনের আন্দোলন হয়েছে। আরব বসন্তের মতো, দক্ষিণ এশিয়ার এইসব দেশে আন্দোলনগুলো মূলত অস্বচ্ছলতা, শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা, স্বৈরাচারিতা, দ্বিচারিতার প্রতিরোধে  যুব সমাজের প্রত্যক্ষ  ভূমিকা থেকেই শুরু হয়েছিল। বাস্তবে তিউনিশিয়ার বেই বুয়াজিজি আর বাংলাদেশের আবু সাইদের মধ্যে পার্থক্য আছে খুব কম। 

আরব বসন্তের মতো, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো দক্ষিণ এশিয়ার আন্দোলনগুলোতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। নেপালের ক্ষেত্রে মূলত জেনারেশন জি আন্দোলনকারীরা আন্দোলনের গতি সঞ্চার করেছে । তাদের প্রায় সবাই অনলাইন প্ল্যাটফর্মে গভীরভাবে জড়িত। ওদিকে নেপালে সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপসের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ হয়ে ওঠে প্রতিবাদের ট্রিগার। এটি জনতার অন্তরে জমে থাকা ক্ষোভের  বিস্ফোরণের আগে একটি স্ফূলিঙ্গের মতো কাজ করেছিল। তাদের এই আকস্মিক প্রতিবাদ ধীরে ধীরে দুর্নীতি, পরিবারতন্ত্র এবং অভাবের বিরুদ্ধে দাবানলে রূপ নিয়েছিল।

আমরা জানি যে, আরব বসন্ত শুরু হয়েছিল তিউনিসিয়ায়। এটি উদ্ভূত হয়েছিল মোহাম্মদ বুয়াজিজির আত্মদাহের মাধ্যমে, যিনি পুলিশি দুর্নীতি এবং অর্থনৈতিক কষ্টের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছিলেন। ওদিকে কোটার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থী জনতা আন্দোলনে নামলে শেখ হাসিনার পুলিশ সরাসরি গুলি করে মেরে ফেলে বাংলাদেশের বিপ্লবী সাঈদ, ওয়াসিম, ইয়ামিন ও মীর মুগ্ধের মতো দুই সহস্রাধিক মানুষকে।  দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষেত্রে যদিও প্রেক্ষাপট ভিন্ন, কিন্তু আরব বসন্তে যে প্রতিবাদগুলো শুরু হয়েছিল, তার প্রতিবাদসূচক কারণগুলো দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে যেমন নেপাল, ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড এবং পাকিস্তানে অস্থিরতার সৃষ্টি করেছে। এটি অবশ্যই লক্ষ্যযোগ্য যে, আরব বসন্তের ক্ষেত্রে প্রতিবাদগুলো দ্রুত একের পর এক দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল, কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ায় আন্দোলনগুলোর ফলাফল এখনও অনিশ্চিত।

ড. মো. আদনান আরিফ সালিম। গবেষক ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর। সহযোগী অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।-

Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন