Logo
Logo
×

অভিমত

আমাদের অগণতান্ত্রিক এলিটেরা

কাকন রেজা

কাকন রেজা

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৫, ০৫:৫৬ পিএম

আমাদের অগণতান্ত্রিক এলিটেরা

হাসনাত আবদুল্লাহ। ছবি: সংগৃহীত

এলিটিজম এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, একধরনের অহং, যে অহং বিভ্রান্তিকর। তাদের ধারণা তারাই শ্রেষ্ঠ। তাদের ধারণা তাদের বিশেষায়িত ক্ষুদ্র গোষ্ঠীটিই সমাজকে শাসন করবে, কারণ তারা অন্যদের চেয়ে এগিয়ে থাকা মানুষ। তাদের ধারণা রাষ্ট্র পরিচালনায় তারাই যোগ্য, অন্যরা অযোগ্য। এই অন্যরা হলো তাদের ভাষায় সাধারণ মানুষ। এলিটিজম এর সংজ্ঞাতেই বলা আছে, এরা অগণতান্ত্রিক। তারা রাষ্ট্রের মূলনীতি, ‘সকল নাগরিকের সমান অধিকার’—এতে বিশ্বাস করে না। মূলত তারা নাগরিক শব্দটিতেই বিশ্বাস করে না। তাদের বিশ্বাসে নাগরিক মানে তাদের রায়ত-প্রজা। 

এখন চোখে মেলে নিজের রাজনৈতিক সমাজে তাকান, দেখুন তো এমন এলিটিজম এর লক্ষণ পরিস্ফুট হচ্ছে কিনা। এমন এলিটদের দেখতে পাচ্ছেন কিনা। ‘ফকিন্নির পুত’ উচ্চারণের ঘৃণা দৃশ্যমান হচ্ছে কিনা। হচ্ছে তো। এসব উচ্চারণই হলো এলিটিজম। আর এমন এলিটদের হাতে রাষ্ট্র পড়লে সেই রাষ্ট্র ক্রমেই হয়ে উঠবে বৈষম্যময়। চব্বিশের জুলাই বিপ্লবে দেড় সহস্রাধিক মানুষ প্রাণ দিয়েছেন বৈষম্যের বিরুদ্ধে, তাদের সেই আত্মত্যাগ সকলই বৃথা যাবে। চব্বিশের জুলাই বিপ্লব মূলত এই এলিটিজমের বিরুদ্ধেই। ‘আমার বাপের দেশ’ এই কথার বিরুদ্ধেই মূলত সারাদেশ ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। ‘আমার বাপের দেশ’ বলে সারাদেশকে শ্মশানে পরিণত করা হয়েছিল। সারাদেশ হয়ে উঠেছিল এক অন্ধকার কারগার। শুধু তারাই শ্মশানের বিপরীতে স্বর্গের সুখ আস্বাদন করছিলেন যারা ‘বাপের দেশ’ মেনে নিয়ে সে দেশের নাগরিক নয়, সেই এলিটিজমের রায়ত-প্রজা হয়ে উঠেছিলন। 

ফ্যাসিজমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে এলিটিজম। হিটলার নিজের ‘আর্য’ ভাবনায় মোহগ্রস্ত ছিলেন। যেমন, ভারতের ব্রাহ্মণ্যবাদীরা ভাবেন। যেভাবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদিজি ঈশ্বরের অংশ হয়ে ওঠেন। নন-বায়োজিক্যাল হয়ে ওঠেন। সেই এলিটিজম থেকে, সেই ‘আমার বাপের দেশ’ এর চিন্তা থেকেই বাংলাদেশে ফ্যাসিস্ট রেজিম প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। সেই এলিটিজম এর আধিপত্য বিপ্লবোত্তর বাংলাদেশে আবার দেখতে পাচ্ছি। বিপ্লবের রূপকারের দাবি নিয়ে শুরু হয় এই এলিটিজম যাত্রার। কাদের বা কার নেতৃত্বে বিপ্লব শুরু হয়েছিল এই তর্কের আড়ালে বিকশিত হতে থাকে ফ্যাসিবাদের পূর্বসুরী এলিটিজম এর। 

তরুণরা যখন নিজেদের জীবনদানের সংকল্প করে, তখনই বাংলাদেশের ফ্যাসিস্ট রেজিমের কাউন্ট-ডাউন শুরু হয়ে যায়। এই তরুণদের প্রায় কেউই এলিট পরিবার থেকে আসা নয়। তারা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া, দেশের সাধারণ মানুষের সন্তান। কৃষক থেকে শ্রমজীবী এই শ্রেণির সন্তাদের রক্তেই আজ আমাদের দ্বিতীয় স্বাধীনতা। কিন্তু মুশকিল দাঁড়ালো বিপ্লব পরবর্তীতে। বাংলাদেশের অথর্ব এলিট এবং এলিটদের সন্তানরা যখন দেখলেন, বিপ্লবের নেতৃত্ব তাদের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। বিপ্লবের নেতৃত্ব হাতছাড়া মানে, ক্ষমতা হাতছাড়া হয়ে যাবার সম্ভাবনা। দেশের ক্ষমতায় বসবে সাধারণের সন্তান, এটা কথিত পলিটিক্যাল এলিটদের সহ্য হলো না। তাদের গাত্রদাহ শুরু হলো। শুরু হলো বিপ্লবীদের চরিত্রহননের চেষ্টা। ওই যে, ‘দেশ খেয়ে ফেলা হলো দেখা হলো না, হাঁস খাওয়া নিয়ে সিনেমা শুরু হলো’ সেই অবস্থা আর কী। 

এলিটিজম এর এই বিপদটি ভয়াবহ। তারা নিজেদের বাইরে কাউকে স্বীকার করে নিতে চায় না। ক্ষমতার ক্ষেত্রে নিজেদের ছাড়া অন্যদের যোগ্য ভাবতে পারে না। তারা সবার আদাব-সালাম প্রত্যাশা করে। না দিলেই বেয়াদব ভাবা ও বলা শুরু হয়। অনেকটা আগের দিনের জমিদারতন্ত্রের মতন। জমিদারদের বাড়ির সামনে দিয়ে জুতা পায়ে, ছাতা মাথায় দিয়ে যাওয়াটা ছিল বেয়াদবি। জুতা খুলে, ছাতা নামিয়ে বগলদাবা করে পার হতে হতো জমিদারের বাড়ি। হ্যাঁ, সামন্তবাদ। আজকে যারা এলিটিজম এর চর্চা করছেন তারা মূলত সামন্তবাদী। আর সামন্তবাদরে সঙ্গে গণতান্ত্রিক চিন্তা কোনভাবেই যায় না। সেজন্যই এলিটিজম এর সংজ্ঞায় এলিটদের বলা হয়েছে অগণতান্ত্রিক। 

আমাদের এই ভূখণ্ডের মানুষ সামন্তবাদের বিরুদ্ধেও লড়েছে। জমিদারতন্ত্র নিপাত গেছে। পশ্চিম পাকিস্তানিদের এলিটিজমও এই ভূখণ্ডের মানুষ প্রতিরোধ করেছে। পশ্চিম পাকিস্তানি এলিটিজম বিদায় করেছে। কিন্তু যে একাত্তর ছিলো এলিটিজম এর বিরুদ্ধে, ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে সেই একাত্তরই আবার হয়ে উঠলো এলিটিজম আর ফ্যাসিজমের নতুন ক্ষেত্র। প্রথমে ‘আমার কথাই শেষ কথা’ এমন এলিটিজম এর সৃষ্টি হলো স্বাধীনতা পরবর্তীকালে। যার ফলেই বাংলাদেশের প্রথম বিপ্লব ‘সিপাহী জনতার বিপ্লব’ সংঘটিত হলো। তারপর মাঝখানে কয়েক বছর আবার জেঁকে বসলো এলিটিজম। ‘আমার বাপে দেশ স্বাধীন দেশ করেছে’, ‘আমার বাপের দেশ’, ‘আমি দেশের ষোল কোটি মানুষকে খাওয়াই’, ‘আমি দিলাম’ এইসব বয়ান দিয়ে শুরু হলো দীর্ঘ দেড় দশকের সামন্তবাদ, এলিটিজম। এক ভয়াবহ ফ্যাসিস্ট রেজিম। 

এখন আবার জর্জ অরওয়েল বিখ্যাত উপন্যাস ‘অ্যানিমেল ফার্ম’ এর দৃশ্যরূপ দেখতে পাচ্ছি চব্বিশের জুলাই বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশে। একশ্রেণির রাজনীতিবিদ, বলতে গেলে চাপাবাজি ছাড়া জুলাই বিপ্লবে যাদের তেমন কোনো অংশীদারত্ব নেই। বরং উল্টো প্রশ্ন আছে ফ্যাসিস্ট রেজিম দীর্ঘায়িত করার পেছনে তাদের ভূমিকা নিয়ে। সেই সব রাজনীতিবিদ আজকে নিজেদের এলিট দাবি করে প্রকৃত বিপ্লবীদের গালি-গালাজ করছেন। তাদের চরিত্রহননের চেষ্টা করছেন। বিপ্লবকে প্রকারন্তরে অস্বীকার করার চেষ্টা করছেন। আজকে বিপ্লবোত্তরকালে যেখানে বিপ্লবীদের সম্মানিত করার কথা, তাদের মাথায় তুলে রাখার কথা, সেখানে তারা উল্টো আতঙ্কিত হচ্ছেন। বুলেটের সামনে দাঁড়িয়ে যারা বলেছিলেন, ‘উই আর ওপেন টু কিল’ তারা আজকে আশঙ্কায় রয়েছেন তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইমেজ নিয়ে। এই এলিটর তাদের পোশাক, খাবার ও চেহারা নিয়ে কথা বলতে শুরু করেন। কখন বলতে শুরু করেন, ‘এই ফকিন্নির পুতেরা কেন রাজনৈতিক অংশীদারত্ব চায়’। 

বাংলাদেশের সোকল্ড এলিটদের চিন্তা এতই নিচু যে, একজন সাধারণের সন্তান সুট-বুট পরলে তাদের মাথা নষ্ট হয়ে যায়। তারা কথা তুলতে থাকে সুট-বুটের অর্থের উৎস নিয়ে! ওয়েস্টিনের নাস্তা নিয়ে! এ ব্যাপারে ডাকসুর স্বতন্ত্র ভিপি প্রার্থী শামীম হোসেনকে উদ্ধৃত করা যেতে পারে। তিনি বললেন, ‘একটা ভালো প্রতিষ্ঠানে লেকচার দিয়েও ত্রিশ থেকে চল্লিশ হাজার টাকা উপার্জন করা সম্ভব।’ তিনি বললেন, তিনি পড়িয়ে যা রোজগার করেন তা দিয়েই মাসে পনেরো দিন ওয়েস্টিনে নাস্তা করতে পারেন। এই সাধারণ কথাটা এলিটদের মাথায় ঢোকে না। তাদের চিন্তা জুড়ে শুধুই তারা। তারা ছাড়া অন্যরা কেন সুট-বুট পরবে, ওয়েস্টিনে খেতে যাবে, কেন তারা রাজনীতিতে তাদের চেয়ে জনপ্রিয় হবে, চিন্তায়-আলাপে অগ্রসরমান হবে, এসব চিন্তায় সোকল্ড এলিটরা সবসময় অস্থির থাকেন। যে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে আজকের রাজনীতির মাঠেও। 

একটা কথা পরিষ্কার বলি, চব্বিশের জুলাই ছিল ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে বিপ্লব। যে ফ্যাসিজমের চিন্তার একটা বড় অংশ এলিটিজম। এই এলিটিজম থেকে বেরিয়ে না আসতে পারলে আগামীতে নব্য ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে সেই ‘ফকিন্নির পুত’দের বিপ্লব করতে হবে দেশের সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে। আবার প্রাণ যাবে হাজারও তরুণের। আফসোসটা এই জায়গাতেই, তরুণরা জান দেয়, আর ক্ষমতায় বসে জান নেনেওয়ালারা। ডিম পাড়ে হাঁসে, খায় বাঘডাশে অবস্থা আর কী। 

Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন