Logo
Logo
×

অভিমত

আল জাজিরার মতামত প্রতিবেদন

শান্তিই ইসরায়েলের বড় শত্রু

Icon

জাভেদ জারিফ

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৫, ১০:৫৩ এএম

শান্তিই ইসরায়েলের বড় শত্রু

জাভেদ জারিফ, তখন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, এবং ব্রিটেন, রাশিয়া, ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ২০১৫ সালের ১৪ জুলাই অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় পারমাণবিক চুক্তি ‘জেসিপিওএ’-র সফল সমাপ্তি ঘোষণার পর একসঙ্গে ছবি তোলেন। গেটি ইমেজেস

দশ বছর আগে, ১৪ জুলাই আমি চীন, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি হিসেবে এক ঐতিহাসিক কূটনৈতিক অর্জনের ঘোষণা দিই। আমরা একটি অপ্রয়োজনীয় সংকটের শান্তিপূর্ণ পরিসমাপ্তি ঘটাই, যা মিথ্যা ও নিরাপত্তা-ভিত্তিক বিভ্রান্তিমূলক নীতির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। এই সংকট আসলে প্রকৃত পারমাণবিক হুমকি থেকে মনোযোগ সরিয়ে দেওয়ার জন্য তৈরি হয়েছিল। পুরো বিশ্ব তখন ইরান পারমাণবিক চুক্তি বা ‘জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন’ (জেসিপিওএ) সই হওয়ার উদযাপন করেছিল, শুধু ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও ইসরায়েলি পারমাণবিক বর্ণবৈষম্যমূলক শাসকেরা ছাড়া। তাদের কাছে শান্তি ও স্থিতিশীলতাই সবচেয়ে বড় অস্তিত্বের হুমকি ছিল, আর এখনও তাই আছে। তারা তখনই চুক্তি ধ্বংস করার অঙ্গীকার করে।

আজ, আমাদের উত্তরসূরিদের কেউ কেউ ইরানের বিরুদ্ধে এক আগ্রাসনের প্রতিক্রিয়া সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে, সেই সময় যখন নতুন পারমাণবিক আলোচনা চলছে। এই হামলা এসেছে ওয়েস্ট এশিয়ার এমন এক রাষ্ট্রের কাছ থেকে, যেটি এনপিটি স্বাক্ষরকারী নয়, কিন্তু পারমাণবিক অস্ত্রধারী—ইসরায়েল। তারা ইরানের এমন পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে যা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণে ছিল, আর সেইসঙ্গে বেসামরিক মানুষ, শিশু কেন্দ্র, বিজ্ঞানী ও অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে যুদ্ধাপরাধ করেছে। গাজার কসাই খ্যাত এই রাষ্ট্র এবার এমন এক পর্যায়ে গেছে, যেখানে জাতীয় নেতাদের ওপর হামলা করে হাজার বছরের রীতিও ভেঙেছে। এটা এক সুস্পষ্ট এবং ঘোষিত প্রয়াস—পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলতে।

যুক্তরাষ্ট্র, যেটি এখন পর্যন্ত একমাত্র রাষ্ট্র যারা পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করেছে, সেই ইসরায়েলের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, যখন তাদের অভিযান ব্যর্থতার মুখে পড়ে। তারা ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক অগ্রগতিকে থামাতে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় অবৈধভাবে হামলা করেছে। অথচ এই অগ্রগতি অনেকটাই হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র জেসিপিওএ থেকে একতরফাভাবে সরে যাওয়ার পর।

এদিকে ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য এবং ইইউর বর্তমান প্রতিনিধিরা—যারা একসময় জেসিপিওএ-র অংশ ছিলেন—একদিকে নেতানিয়াহুকে দিয়ে নিজেদের ‘নোংরা কাজ’ করিয়ে নেওয়ার দাবি করছে, অন্যদিকে চুক্তির বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা বা ‘ডিসপিউট রেজল্যুশন মেকানিজম’ চালু করার হুমকি দিচ্ছে। অথচ তারা নিজেরাই বিগত দশ বছরে অন্তত সাত বছর তাদের অর্থনৈতিক ও আর্থিক প্রতিশ্রুতি পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং ইরানের শান্তিপূর্ণ পরিশোধন কর্মসূচি বাতিলের ডাক দিয়ে চুক্তির মূল ভিত্তিকেই প্রত্যাখ্যান করেছে।

২০২১ সালের ২০ জুলাই আমি জাতিসংঘ মহাসচিবকে ১৪০ পৃষ্ঠার এক চিঠি লিখে জেসিপিওএ-র ‘স্ন্যাপব্যাক’ চালু করার যে অধিকার ইউরোপীয় পক্ষের আছে বলে দাবি করা হয়, সেটিকে ভুল ও আত্মসেবামূলক ব্যাখ্যা হিসেবে খণ্ডন করি। সেই চিঠি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের দলিল A/75/968 ও নিরাপত্তা পরিষদের দলিল S/2021/669 হিসেবে ছাপা হয়। এখন ইউরোপীয় পক্ষগুলোর সাম্প্রতিক বিবৃতি ও কার্যকলাপ স্পষ্ট করে দিচ্ছে—তারা আর জেসিপিওএ অংশীদার নেই।

ইরানের সশস্ত্র বাহিনী নিজেদের স্বনির্ভর সামরিক সক্ষমতার ওপর ভর করে আবারও ইসরায়েলের অজেয় ভাবমূর্তিকে চূর্ণ করেছে। তারা প্রমাণ করেছে, দুইটি পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র একত্র হলেও হাজার বছরের প্রাচীন একটি সভ্য রাষ্ট্রকে নতজানু করতে পারে না।

আজ এটা স্পষ্ট—ইসরায়েলের আঞ্চলিক প্রাধান্যের বিভ্রম এবং যেকোনো সময় হামলা চালানোর সক্ষমতা আসলে ইরানকে দুর্বল করার নীতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এর পরবর্তী লক্ষ্য হচ্ছে অঞ্চলের অন্য শক্তিগুলো—যার ফলে গোটা মুসলিম ওয়েস্ট এশিয়া বিভাজন ও অস্থিরতায় পড়ে। এই নীতি না চীনের, না রাশিয়ার স্বার্থে—যাদের জন্য স্থিতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ, না যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বৈশ্বিক কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু নেতানিয়াহু ও তার পশ্চিমা সমর্থকরা এতটাই নির্মম যে নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে তারা বিশ্বকে চিরকালীন যুদ্ধে ঠেলে দিতে পারে। এই যুদ্ধ পরিকল্পিত হয় বর্ণবৈষম্য, গণহত্যা ও আরব প্রতিবেশীদের ওপর আগ্রাসনের মাধ্যমে। এর সঙ্গে থাকে ব্ল্যাকমেইল, কেলেঙ্কারি আর চিরস্থায়ী চাঁদাবাজি।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এখনই উচিত এই ভিত্তিগত হুমকি মোকাবিলা করা—যেটি শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তারও হুমকি। এটি প্রায় সব দেশের স্বার্থ ও জনগণের কল্যাণের ওপর আঘাত হানে।

আমার চার দশকের কূটনৈতিক জীবনে আমি নিজের চোখে দেখেছি, ১৯৯১ সালে লেবাননে আমেরিকান জিম্মি বিনিময়ের আলোচনায় ইসরায়েল কীভাবে বাধা দিয়েছিল—তাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বরাবরই সামান্য লাভের জন্য মিত্রদের সম্পদ, স্বাধীনতা আর প্রাণ উৎসর্গ করতে প্রস্তুত থাকে। যারা এখনো মনে করেন ইসরায়েল তাদের রক্ষা করবে, তারা একদিন বুঝবেন, তারা আসলে ইসরায়েলের হয়ে লড়ার জন্য উৎসর্গ করা হয়েছে—ফিরে কিছু পাওয়ার কোনো আশা নেই।

নেতানিয়াহুর নীতির মূল স্তম্ভ হলো বিশৃঙ্খলা, বিবাদ ও অস্থিরতা। তার কাছে একমাত্র প্রকৃত হুমকি হলো আঞ্চলিক সহযোগিতা। হোক তা পারমাণবিক ও গণবিধ্বংসী অস্ত্রমুক্ত মধ্যপ্রাচ্য গড়ার প্রস্তাব—যা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ১৯৭৪ সাল থেকে দিয়ে আসছে—অথবা ১৯৮৭ সালের নিরাপত্তা পরিষদের রেজল্যুশন ৫৯৮ অনুযায়ী হরমুজ প্রণালীতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সহযোগিতার কাঠামো গড়ার প্রস্তাব।

কাতারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হামাদ বিন জাসিম বিন জাবের আল থানি সতর্ক করে বলেছেন—এই অঞ্চলের, এমনকি নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের জন্যও, ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রভাবে আঞ্চলিক দুঃসাহসিকতার অবসান ঘটানো ছাড়া উন্নতির কোনো পথ নেই।

এখনই সময় নিরাপত্তা পরিষদের উচিত এমন একটি আঞ্চলিক কাঠামো গঠন করা, যেখানে সংলাপ, আস্থা গড়ে তোলা এবং সহযোগিতা সম্ভব হবে—বিশেষত হরমুজ অঞ্চল বা মুসলিম ওয়েস্ট এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে। এর পেছনে থাকতে হবে বৈশ্বিক নিরাপত্তার ছায়া ও স্থায়ী সদস্যদের নিশ্চয়তা।

ইরান ২০১৯ সালে হরমুজ শান্তি উদ্যোগ (হোপ) এবং ২০২৪ সালে মুসলিম ওয়েস্ট এশিয়া সংলাপ সংস্থা (এমওয়াডা) প্রস্তাব করেছে। আমাদের অঞ্চলের সব দেশের—বাহরাইন, মিসর, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব, সিরিয়া, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইয়েমেন—যারা ইতিমধ্যেই ইসরায়েলের তৈরি বিভীষিকাময় ভবিষ্যতের আভাস পেয়েছে, তাদের উচিত এখনই উদ্যোগ নেওয়া। তারা ইরানের প্রস্তাবগুলিকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে অথবা নিজেদের পরিকল্পনা দিতে পারে। একক বা যৌথভাবে, তারা নিরাপত্তা পরিষদে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করতে পারে যাতে এই অঞ্চল নিজেই নিজের নিরাপত্তার কাঠামো তৈরি করতে পারে।

জেসিপিওএ সই হওয়ার পর গত দশ বছরের অভিজ্ঞতা একটি শিক্ষাই দিয়েছে—জবরদস্তি শেষ পর্যন্ত তাদেরই ক্ষতি করে যারা তা চালু করে। ভবিষ্যতের জন্য কূটনীতি, আশা এবং পারস্পরিক লাভের ভিত্তিতে পথ গড়াই একমাত্র যুক্তিসম্মত পথ। সময় এখনই। [আল জাজিরার মতামত বিভাগ থেকে অনুবাদ]

Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন