আল জাজিরার মতামত প্রতিবেদন
সুপারহিরো সিনেমার পতন, যেমন ডুবছে আমেরিকান সাম্রাজ্য
কিথ এ স্পেন্সার
প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৫, ১১:২৭ এএম
ছবিটি ওয়ার্নার ব্রাদার্স পিকচার্সের সৌজন্যে প্রকাশিত — এতে “সুপারম্যান” চলচ্চিত্রের এক দৃশ্যে ডেভিড কোরেনসুয়েটকে দেখা যাচ্ছে।
গত সপ্তাহে ওয়ার্নার ব্রাদার্স পিকচার্স নতুন সুপারম্যান সিনেমা মুক্তি দিয়েছে। ছবিটি মুক্তির প্রথম সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১২২ মিলিয়ন ডলার আয় করে। যদিও এই আয়কে সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে, এটি আগের দশকের বড় বাজেটের ছবির তুলনায় অনেক কম। ২০১৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ব্যাটম্যান ভার্সেস সুপারম্যান ছবিটি প্রথম সপ্তাহেই ১৬৬ মিলিয়ন ডলার আয় করেছিল, যা মুদ্রাস্ফীতি বিবেচনায় ২২৪ মিলিয়নের সমান।
গত কয়েক বছরে সুপারহিরো সিনেমার আয়ের ধারাবাহিক পতন হয়েছে, নতুন সুপারম্যান ছবিটিও এর ব্যতিক্রম নয়। ২০১০ সালের দিকে এই ঘরানার সিনেমা বিশ্বব্যাপী ৫০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করত। এখন সেই মাত্রায় পৌঁছায় খুব কম ছবিই। ২০২৩ সালে ভ্যারাইটি ম্যাগাজিন জানায়, সুপারহিরো ঘরানার ছবিগুলো বড় ধরনের আয়ের খরা অনুভব করছে।
এই পতনের পেছনে অনেকেই “সুপারহিরো ক্লান্তি”কে কারণ বলে মনে করেন। সুপারম্যানের পরিচালক জেমস গান এই কথাই বলেন। ডিজনির সিইও বব আইগার বলেন, অতিরিক্ত সুপারহিরো ছবির ফলে দর্শকদের মনোযোগ কমে গেছে।
তবে শুধু ক্লান্তিকে কারণ বলা ভুল। সব শিল্পরূপের মতো এই ঘরানার জনপ্রিয়তা বাড়া-কমার পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব থাকে। সুপারহিরো ঘরানাটি ১৯৩৮ সালে প্রথম সুপারম্যান কমিক প্রকাশের মাধ্যমে শুরু হয়। ২০০১ সালের ৯/১১ হামলার পর এই ঘরানা নতুন উচ্চতায় পৌঁছে। হামলার পর আমেরিকার প্রচারণা মেশিন চালু হয়, এবং সুপারহিরো সিনেমায় ‘শত্রুদের’ চিত্রায়ণ সহজ হয়ে পড়ে।
পেন্টাগন হলিউডের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই কাজ করে আসছে। তারা সিনেমায় সামরিক সরঞ্জাম দিতে রাজি হয় চিত্রনাট্যে নিয়ন্ত্রণ রাখার শর্তে। ৯/১১ পর ‘আয়রন ম্যান’, ‘ক্যাপ্টেন আমেরিকা’সহ অনেক ছবির চিত্রনাট্যে পেন্টাগনের প্রভাব ছিল। ‘ক্যাপ্টেন মার্ভেল’ ব্যবহার করা হয়েছিল মার্কিন বিমানবাহিনীর পাইলট নিয়োগ প্রচারে।
এই ছবিগুলোতে মার্কিন সেনা ও সুপারহিরো একত্রে ‘বিশ্বশান্তি’ প্রতিষ্ঠায় কাজ করে বলে দেখানো হয়েছে। ছবির নায়করা ‘গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, বহুসাংস্কৃতিকতা’— এসব ‘আমেরিকান মূল্যবোধ’ রক্ষা করে। ক্যাপ্টেন আমেরিকা ছিল নাৎসিবাদের বিরুদ্ধে মার্কিন বিজয়ের প্রতীক। ব্ল্যাক প্যান্থার ছিল উদারপন্থী, বৈচিত্র্যপূর্ণ আমেরিকার মুখ।
কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলেছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে করা এক জরিপে দেখা যায়, ৫৭ শতাংশ আমেরিকান বলেন তারা চান দেশের নেতা অপ্রতিবন্ধিত ক্ষমতা পাক। আরেক জরিপে ৪৫ শতাংশ বলেন, জাতিগত বৈষম্য নিয়ে অতিরঞ্জিত অভিযোগই বড় সমস্যা।
এগুলো দেখায়, আমেরিকা যে উদারনৈতিক সমাজ বলে সুপারহিরো ছবিতে চিত্রিত হয়, বাস্তবে অনেকেই সেই ধারণাকে আর গুরুত্ব দেন না। ফক্স নিউজের এক জরিপে ৬২ শতাংশ বলেন, আমেরিকা এখন নিম্নগামী। ২০২৩ সালে পিউ রিসার্চ জানায়, ৫৮ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন, আজকের জীবন পঞ্চাশ বছর আগের চেয়ে খারাপ।
এই মনোভাবের বড় ধস দেখা যায় ২০২০ সালে। করোনা মহামারির সময় সামাজিক বিভাজন চূড়ান্ত রূপ নেয়। সরকারকে অবিশ্বাস, নিজস্ব স্বার্থের প্রাধান্য, এবং জনস্বাস্থ্যবিরোধী আচরণ দেশকে ভেঙে দেয়। এই বিভক্ত বাস্তবতায় সুপারহিরো ছবির ‘একত্র জাতি’ ভাবনা আর দর্শকের সাথে মেলে না।
পরের বছর আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার— বিশ্বে আমেরিকার ‘নায়ক’ ভাবমূর্তিকেও চ্যালেঞ্জ করে। এই যুদ্ধে আমেরিকা ১০০,০০০ জনেরও বেশি মানুষ মারে, ২০ বছরে খরচ করে ২.৩ ট্রিলিয়ন ডলার, কিন্তু আফগান জনগণের জীবনে স্থায়ী উন্নয়ন আনতে ব্যর্থ হয়।
দেশের ভিতরে মজুরি কমে, বৈষম্য বাড়ে, পরিকাঠামো ভেঙে পড়ে। রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়েও বিশ্বাস কমে যায়। বামপন্থীরা মনে করেন, কর্পোরেট স্বার্থ ডেমোক্রেটিক পার্টিকে নিয়ন্ত্রণ করছে। ডানপন্থীরা আরও উগ্র, জাতিবিদ্বেষী ও কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠেছে। এসব বাস্তবতায় সুপারহিরো সিনেমার ‘ভালো আমেরিকা’ আর দর্শকদের কাছে বাস্তব মনে হয় না।
নতুন সুপারম্যান সিনেমার পরিচালক গান বলেন, এটি আমেরিকান মূল্যবোধের প্রতিচ্ছবি— একজন অভিবাসীর গল্প, যে মানবিকতা ও সদয়তার মূল্য শেখায়। কিন্তু ডানপন্থীরা এই মন্তব্যকে রাজনৈতিক বলে আক্রমণ করেন। ট্রাম্পের উপদেষ্টা কেলিয়ান কনওয়ে বলেন, “সিনেমা দেখতে গিয়ে আমরা উপদেশ শুনতে চাই না।”
আজকের আমেরিকায় সিনেমাকে “জাগরণপন্থী” না “বিরোধী” এমন ট্যাগে ফেলা হয়, যা একসময় সব পক্ষের দর্শককে একত্র করত, সেই সিনেমার ভবিষ্যৎকে সংকটে ফেলেছে।
সুপারহিরো সিনেমার বার্তা ছিল আশাবাদ, আর আমেরিকা ও উদারনৈতিক ব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান। কিন্তু আজকের আমেরিকায় আশার অভাব, গণতন্ত্র বা বহুত্ববাদে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে বহু মানুষ। তাই আজ আর তারা জানে না কোন ‘নায়ক’ আদর্শিকভাবে আমেরিকাকে উপস্থাপন করতে পারে। এই অবস্থায় সুপারহিরো সিনেমার প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়া একেবারেই অস্বাভাবিক নয়।
কিথ এ স্পেন্সার ক্যালিফোর্নিয়ার একজন লেখক ও সাংস্কৃতিক সমালোচক। তার প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণমূলক লেখা প্রকাশিত হয়েছে The Washington Post, Salon, UnHerd, Jacobin, SFGate, Dissentসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমে। তিনি Salon পত্রিকার সাবেক সম্পাদক। তার লেখা বইয়ের নাম “A People’s History of Silicon Valley”, যেখানে সিলিকন ভ্যালির ইতিহাসকে সাধারণ মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরা হয়েছে।
