Logo
Logo
×

অভিমত

বিএনপিকে আওয়ামী লীগের সমতায় আনার চেষ্টা এবং

কাকন রেজা

কাকন রেজা

প্রকাশ: ১১ মে ২০২৫, ১২:২১ এএম

বিএনপিকে আওয়ামী লীগের সমতায় আনার চেষ্টা এবং

এক ‘রাজাকার' শব্দ শেখ হাসিনার লৌহকঠিন শাসনের পতন ঘটিয়েছিল। বারুদের মুখে স্ফুলিঙ্গের কাজ করেছিলো শব্দটি। যখন লিখছি তখন আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আন্দোলন চলছে। শাহবাগ উত্তাল। এ সময় কাউকে কাউকে দেখছি বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে উস্কাচ্ছে ‘রাজাকার’ শব্দটি উচ্চারণের জন্য। যে বিভেদের মন্ত্র দীর্ঘদিন বাংলাদেশকে বিভক্ত রেখেছিল, সেই বিভক্তির মন্ত্রই জপছে কেউ কেউ। আমি জানি না, জানলেও প্রমাণ সাপেক্ষ নয়, তাই বলছি না, তবে এটা নিশ্চিত কেউ কেউ শেখ হাসিনার সমতায় আনতে চাইছে বেগম জিয়া ও তারেক রহমানকে। প্রভাস আমিন না বুঝেই তেল দিতে গিয়ে শেখ হাসিনাকে প্ররোচিত করেছিলেন ‘রাজাকার’ শব্দটির ক্রূর উচ্চারণে। তেমনি এখন কেউ কেউ বুঝে এবং স্বজ্ঞানে বিএনপির সুপ্রিমোকে দিয়ে ‘রাজাকার’ শব্দটি উচ্চারণ করাতে চাইছে। যেন আবার স্লোগান ওঠে, ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার’। এবার হয়তো ‘কে বলেছে’ এর উত্তর ‘স্বৈরাচার’ হবে না, হবে অন্যকিছু। সেই অন্যকিছুকে প্রতিষ্ঠা করতেই বিএনপি’র সুপ্রিমোদ্বয়কে দিয়ে ‘রাজাকার’ শব্দটি উচ্চারণ করাতে উদগ্রীব কিছু ধূর্ত বুদ্ধিজীবী, একক্টিভিস্ট। ফাঁদ পেতে রাখা হয়েছে, পা দিলেই হলো। 

আওয়ামী লীগ ‘রাজাকার’ তথা ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ বিষয়টিকে ট্যাবু হিসেবে ব্যবহার করে আসছিল। কারণ আওয়ামী লীগের মূলত কোনো রাজনৈতিক বয়ান ছিল না। বাঙালি জাতীয়তাবাদ বর্তমান বিশ্বে অচল। জাতিবাদী চিন্তা এই সময়ে পুরোপুরি অপ্রাসঙ্গিক। গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের মিশেল হলো একটা অলীক ব্যাপার। এই ইউটোপিয়া কবেই পরিত্যাজ্য ঘোষিত হয়েছে। সুতরাং আওয়ামী লীগের মূলত রাজনৈতিক বয়ান শূন্য হয়ে পড়েছিল। বয়ানশূন্য আওয়ামী লীগ টিকেছিল ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ নামক ট্যাবুর উপর। ট্যাবু হলো এমন একটা বিষয় যা অনুসারীদের কাছে পবিত্র, একইসাথে বিপজ্জনক। একটা কাল্ট যা ধারণ করে। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের আবেগের সাথে জড়িত। এই আবেগকে পুঁজি করেই এতদিন রাজনীতি করেছে আওয়ামী লীগ। মুক্তিযুদ্ধ ছিল আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুঁজি। আর রাজনীতিকে আওয়ামী লীগ প্রকৃত অর্থেই বাণিজ্যে পরিণত করেছিল। সেই বাণিজ্য  কাউকে কাউকে সম্ভবত উৎসাহিত  করেছে। তারা বিএনপিকেও বাণিজ্যিক দলে পরিণত করার প্রাণপণ চেষ্টায় রয়েছে। তাদের সে চেষ্টায় সঙ্গতই উদ্ভব হয়েছে কিছু প্রশ্নের। 

বিএনপি কেন এই দাবির সাথে সংহতি প্রকাশ করছে না, তাদের সংশয় কোথায়? নাকি তাদের ভয় রয়েছে তারাও ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগের মতন হয়ে উঠবে। তখন তাদেরও নিষিদ্ধের দাবি উঠতে পারে? নাকি বিএনপি ভারতকে খুশি রাখতে চাইছে? না রিফাইন্ড আওয়ামী লীগকে দুর্বল প্রতিপক্ষ হিসেবে রেখে দিতে? এসব প্রশ্নের উত্তর কিন্তু জটিল নয়। কেন নয়, এ প্রশ্নের বিপরীতে বলা যায়, বিএনপির গত দেড় দশক মানুষের কাছে পরিচিত ছিল মজুলমের দল হিসেবে। মানুষ দেখেছে কী পরিমাণ অত্যাচার সইতে হয়েছে তৃণমূল বিএনপি’র নেতাকর্মীদের। মামলা-হামলা, গুম-খুন ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। মানুষ বিএনপির নেতাকর্মীদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল, তাদের সমর্থনে রাজপথে নেমেছিল তারা বারবার। কিন্তু পরিণতি কী হয়েছে, তারা প্রতারিত হয়েছে। আন্দোলন সফল করতে যে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা জরুরি, সে পরিকল্পনা মূলত ছিল কল্পনাই। কিন্তু সেই কল্পনাকে বাস্তব করেছে এদেশের কিছু দুঃসাহসী তরুণ। তারা পথে নেমেছিল জীবন দিতে এবং অকাতরে জীবন দিয়েছে। একটা লাশ পরেছে, সেই সহযোদ্ধার লাশ পাশে রেখেই তারা এগিয়ে গিয়েছে। মানুষ বিশ্বাস করেছে তাদের। মানুষ দেখেছে এই তরুণদের কমিটমেন্ট, ডেকিকেশন। ফলে একটি লৌহকঠিন রেজিমের পতন ঘটেছে। এই পতনের সবচেয়ে বড় বেনিফিশিয়ারি এখন বিএনপি। সে অনুযায়ী বিএনপি’র রাজনীতি যতটা সাবধানি হবার কথা ছিল, তা হচ্ছে না। মজলুমের দল হিসেবে মানুষের সহানুভূতি ও সমর্থনের জায়গায় থাকা দলটি দেশের মানুষের পালস বুঝতে সম্ভবত ব্যর্থ হচ্ছে। বেগম খালেদা জিয়ার পাহাড়সম যে ইতিবাচক রাজনৈতিক ইমেজ সেই ইমেজকেও কাজে লাগাতে পারছে না বিএনপি। মানুষ তারেক রহমানের উপর ভরসা রেখে চলেছে, কেউ কেউ যেন সেই ভরসাতেও ফাঁটল ধরানোর চেষ্টা করছে। বুঝি না, শহীদ জিয়ার হাতে সৃষ্ট এই দলটির কেন ভয় যে, তারাও ভবিষ্যতে নিষিদ্ধ হতে পারে! তাহলে কি বিএনপির কোনো নেতা মনে করেন, তারাও একসময় আওয়ামী লীগের মতন ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠবেন! বিস্মিত হই। যে দলের নেত্রী নিজ দলের ক্যাডারদের নিয়ন্ত্রণে ‘ক্লিনহার্ট’ এর মতন একটি অপারেশন চালাতে পারেন, সেই দলের ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠার কোনো সম্ভাবনা সঙ্গতই থাকে না। তারপরও কেন এমন ভয়? 

প্রশ্ন উঠেছে, বিএনপি কি ভারতকে খুশি রাখতে চাইছে। তাহলে তো শেখ হাসিনাকে আবার ক্ষমতায় বসাতে হয়। কারণ বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ধারণ করা একটি দল কখনো ভারতের খুশির কারণ হয়ে উঠতে পারে না। যে দলের প্রতিষ্ঠাতা সার্ক সৃষ্টি করে ভারতের কর্তৃত্বকে খর্ব করতে চেয়েছেন, তার সৃষ্ট দল কখনো ভারতের আস্থাভাজন হয়ে উঠতে পারে না। হয়তো আপাত ভারত বিএনপিকে মন্দের ভালো হিসেবে মেনে নেবে, কিন্তু তলে তলে আবার ফ্যাসিজমের গোড়ায় পানি ঢালবে। সুতরাং রিফাইন্ড আওয়ামী লীগের আলাপ তুলতে হলে, শহীদ জিয়ার সময়ে যেতে হবে। তখনও রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ হয়েছিল। হয়েছিল আব্দুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে বাকশাল। শেষ পর্যন্ত দেখা গেছে সব এক গোয়ালের গরু। ইতিহাস মনে রাখা দরকার। 

শাহবাগে নানান স্লোগান হচ্ছে। ধূর্তরা সামনে আনছেন শিবিরের স্লোগানকে। কৌশল সেই পুরানো। শিবির যদি কোনো বিতর্কিত স্লোগান দেয়, সেটা হয়তো তাদের কৌশল। সামনে নির্বাচন মানুষের বিএনপির প্রতি যে সমর্থন রয়েছে তাতে ভাগ বসাতে তারাও কৌশল করতে পারে। হতে পারে তারা জানে, বিতর্কিত স্লোগান দিলে ধূর্ত বুদ্ধিজীবীরা তা লুফে নেবে এবং তারা বিএনপিকে দাবির প্রতি সংহতি জানাতে বাধা দেবে। রাজনীতিতে এই কৌশল স্বাভাবিক। এই কৌশলকে মোকাবেলার চেষ্টা হলো একে ইগনোর করা। মাওলানা রুমি বলেছিলেন, উপেক্ষার চেয়ে বড় কোনো অস্ত্র নেই। রাজনীতিতে কোনো সময় কোনো বিষয় উপেক্ষা করতে হয়। এটা আরো বড় কৌশল। 

Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন