Logo
Logo
×

অভিমত

সুসানার দাদা ছিলেন বাংলার গভর্নর, যখন দুর্ভিক্ষে ৩০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়

Icon

কবিতা পুরি

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৪, ০৬:২৯ এএম

সুসানার দাদা ছিলেন বাংলার গভর্নর, যখন দুর্ভিক্ষে ৩০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়

স্যার আর্চিবল্ড ওয়াভেল, ভারতের ভাইসরয়, ১৯৪৩ সালের শেষের দিকে দুর্ভিক্ষ পরিদর্শন করছেন

সুসানা হারবার্টের দাদা ১৯৪৩ সালে দুর্ভিক্ষের সময় ব্রিটিশ ভারতে বাংলার গভর্নর ছিলেন। সেই দুর্ভিক্ষে বাংলায় কমপক্ষে ৩০ লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল। সুসানার কাছে সেই গল্প শুনেছেন কবিতা পুরি, থ্রি মিলিয়ন পডকাস্টের উপস্থাপক।

সুসানা বলছেন, ‘যা ঘটেছে তার জন্য আমি অত্যন্ত লজ্জা বোধ করছি।’

আমি (কবিতা পুরি) যখন সুসানার সাথে প্রথম দেখা করি, তখন তিনি (সুসানা) ১৯৪০ সালের একটি ছবি আঁকড়ে ধরে রেখেছেন। এটি বাংলার গভর্নরের বাসভবনে বড়দিনে তোলা। সেখানে সারিবদ্ধভাবে বসে আছেন অনেকে। সুসানার দাদা বাংলার গভর্নর স্যার জন হারবার্ট, ভাইসরয় লিনলিথগো প্রমুখ। তাদের পায়ের কাছে একটি ছোট ছেলে, সাদা শার্ট, হাফপ্যান্ট, মোজা ও চকচকে জুতা পরা। এটা সুসানার বাবা। তারা সবাই সরাসরি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে।

সুসানার দাদা ১৯৪৩ সালের শেষের দিকে মারা গিয়েছিলেন।

দুর্ভিক্ষের কারণ অনেক এবং জটিল। যদিও জন হারবার্ট (সুসানার দাদা) ছিলেন বাংলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঔপনিবেশিক ব্যক্তিত্ব, তিনি একটি বিস্তৃত ঔপনিবেশিক কাঠামোর অংশ ছিলেন। তিনি দিল্লিতে তার কর্তাদের কাছে জবাবদিহি করতেন।

সুসানা হারবার্ট

ডক্টর জনম মুখার্জি, ইতিহাসবিদ ও হাংরি বেঙ্গল-এর লেখক, বলেছেন, জন হারবার্ট (সুসানার দাদা) ছিলেন দুর্ভিক্ষের সাথে সবচেয়ে সরাসরি যুক্ত। কারণ তিনি সে সময়ে বাংলা প্রদেশের গভর্নর (প্রধান নির্বাহী) ছিলেন।

১৯৪৩ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জন হারবার্ট যেসব নীতি কার্যকর করেছিলেন তার মধ্যে একটি হলো ‘ধ্বংস করো’। এই নীতি চালু করেছিলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল। এই নীতির ফলে নৌকা ও চাল ধ্বংস করা হয়েছিল। নৌকা ছিল সেকালে বাংলার প্রধান বাহন। ধ্বংস করার কারণ হলো, ব্রিটিশ সরকার ভাবছিল জাপানিরা আক্রমণ করতে আসছে। চাল ও নৌকা ধ্বংস করলে জাপানিরা ভেতরে যেতে পারবে না এবং টিকতে পারবে না।

উপরন্তু, ঔপনিবেশিক অন্য অনেক নীতির কারণে ইতিমধ্যে বাংলার অর্থনীতি বিপর্যস্ত ছিল। এরপর এল ধ্বংস নীতি, যে কারণে জেলেরা সমুদ্রে যেতে পারত না, কারিগররা তাদের পণ্য বাজারে নিতে পারত না।

১৯৪০ সালে সুসান্নার বাবা, সামনের সাদা পোশাক পরা শিশুটি


মুদ্রাস্ফীতি ইতিমধ্যেই বেশি ছিল। কারণ ঔপনিবেশিক সরকার এশিয়ান ফ্রন্টে বিশাল যুদ্ধের জন্য বিপুল পরিমাণ কাগজের টাকা ছাপিয়েছিল। ফলে টাকার ছড়াছড়ি, কিন্তু বাজারে পণ্য নেই। জাপানিদের হাতে পড়ার পর বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার) থেকে বাংলায় চাল আমদানি বন্ধ হয়ে যায়। প্রায়ই লাভের জন্য চাল মজুত করা হত। তার ওপর একটি মারাত্মক ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে, যা অনেক ফসল নিশ্চিহ্ন করে দেয়।

যুদ্ধের মাঝামাঝি অন্য দেশ থেকে খাদ্য আমদানির দাবি ওঠে, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল সেই দাবি বারবার অস্বীকার করেন।

আমি (কবিতা পুরি) অবাক হয়েছিলাম, কেন বাংলার গভর্নরের নাতনি সুসান্নাহ এত বছর পর লজ্জা বোধ করলেন। সুসানা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করলেন, “ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সাথে আমার যে একটা সংযোগ আছে সেটা দারুণ কিছু বলে মনে হয়েছিল যখন আমার বয়স কম ছিল। ছোটবেলায় আমি আমার দাদার পুরনো অনেক কাপড় পছন্দ করতাম। সেখানে সিল্কের স্কার্ফ ছিল, যার একটিতে লেখা ছিল ‘মেড ইন ব্রিটিশ ইন্ডিয়া’। কিন্তু এখন যখন আমি সেগুলো দেখি তখন আমার গা কেঁপে ওঠে, এবং নিজেকে প্রশ্ন করি, আমি কেন এই জিনিসগুলি পরতে চাই? ‘ব্রিটিশ ইন্ডিয়া’ ট্যাগ লাগানো কাপড় এখন আর পরার উপযুক্ত বলে মনে হচ্ছে না।”

সুসানা ব্রিটিশ ভারতে তার দাদার জীবন সম্পর্কে আরও জানার ও বোঝার জন্য বদ্ধপরিকর। ওয়েলসের পারিবারিক বাড়ির আর্কাইভে তার দাদা-দাদির কাগজপত্রের স্তূপের মধ্যে তিনি বাংলার দুর্ভিক্ষ বিষয়ে যা কিছু জানতে পারেন তা পড়ছেন। এই কাগজপত্রগুলো একটি জলবায়ু-নিয়ন্ত্রিত কক্ষে রাখা হয়েছে। একজন আর্কাইভিস্ট মাসে একবার এসে এগুলো দেখে যান এবং তদারক করেন।

সুসানা বলেন, ‘এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, দাদা যে নীতিগুলি বাস্তবায়ন করেছিলেন সেগুলো দুর্ভিক্ষের মাত্রায় ও প্রভাবে প্রচুর অবদান রেখেছিল। দাদার দক্ষতা ছিল, সম্মান ছিল। কিন্তু ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দূরবর্তী কোণে (বাংলায়, বর্তমান বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিম বঙ্গ) ৬ কোটি মানুষের জীবন পরিচালনার জন্য তাকে নিয়োগ দেওয়া উচিত হয়নি।’

পারিবারিক আর্কাইভে সুসানার দাদির (লেডি মেরি) একটি চিঠি রয়েছে। লেডি মেরি ১৯৩৯ সালে তার স্বামীকে লিখেছেন এই চিঠি। সুসানা বলেন, ‘চিঠিগুলি পশ্চাৎপট পড়লে বোঝা যায়, দাদা বাংলার গভর্নর পদের জন্য মোটেও উপযুক্ত ছিলেন না।’

সুসানা বলেন, ‘দাদা ছিলেন একজন প্রাদেশিক সাংসদ এবং সরকারি হুইপ। দিল্লির অফিসে একজন তরুণ অফিসার হিসেবে তার সামান্য কিছু অভিজ্ঞা ছিল। ভারতীয় রাজনীতিতে কার্যত তার কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না।’ ইতিহাসবিদ জানম মুখার্জিকে সুসানা প্রশ্ন করেন, ‘এমন একজন ব্যক্তিকে কেন, কিভাবে বাংলার গভর্নর বানানো হল?’

মুখার্জির উত্তর, ‘এটিই ঔপনিবেশিকতা। এটি আধিপত্যের বিষয়। কিছু এমপি যাদের ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতা নেই, যারা স্থানীয় ভাষা জানেন না, যারা ব্রিটেনের বাইরে কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কাজ করেননি, তারাই কলকাতায় গভর্নর হাউসে গিয়ে বসবাস করতে পারেন (মানে অন্য জাতিকে শাসন করতে পারেন)। তার কোনো রকম অভিজ্ঞতা না থাকলেও তিনি যে, তিনি সমগ্র দেশের সব মানুষের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।’ সেই সিদ্ধান্তের ফল কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা সাম্রাজ্যবাদী শাসক জানতে চায় না।

সুসানা হারবার্ট আমাকে (কবিতা পুরি) বলেছেন, ‘যা ঘটেছে তার জন্য আমি অত্যন্ত লজ্জা বোধ করছি।’

Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন