চীন-পাকিস্তান দোস্তি এবং ভারত মহাসাগরে রাজনীতির খেলা
সংকল্প গুর্জর
প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৪, ০৫:১০ পিএম
চীন-পাকিস্তান অক্ষ ১৯৬৩ সাল থেকে বিদ্যমান রয়েছে। ওই সময় দেশ দুটি বুঝতে পারে যে তাদের উভয়েরই উদ্দেশ্য ভারতের প্রভাব সীমিত করা। সম্প্রতি এই অক্ষ আরো শক্তিশালী হয়েছে। এর পেছনে রয়েছে চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর (সিপিইসি) ও কৌশলগত সামুদ্রিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের মতো উদ্যোগ। এই সম্পর্কের সর্বশেষ অগ্রগতি হলো পাকিস্তানের সাবমেরিন বহর বৃদ্ধিতে চীনের সহায়তা।
পাকিস্তান তার নৌবহরের আধুনিকায়ন করছে। আর চীন তাকে সাবমেরিন দিচ্ছে। অন্যান্য সহযোগিতা দিচ্ছে। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, সম্প্রতি চীন তাদের উচাং শিপইয়ার্ড থেকে হ্যাঙ্গর শ্রেণির সাবমেরিন চালু করেছে। একটি সাবমেরিন-চুক্তি অনুযায়ী, চীন পাকিস্তানে চারটি এবং চাইনিজ শিপইয়ার্ডে আরো চারটি সাবমেরিন নির্মাণ করবে। সাবমেরিনগুলি পাকিস্তানের নৌসক্ষমতা বাড়াবে।
সাবমেরিন চুক্তিটি পাকিস্তানের সামগ্রিক নৌ-আধুনিকীকরণ কর্মসূচির অংশ। এটি চীন-পাকিস্তান নিরাপত্তা সম্পর্কের গভীরতার ইঙ্গিত দেয়। চীন-পাকিস্তান সম্পর্ককে ‘পাহাড়ের চেয়ে উঁচু, সমুদ্রের চেয়ে গভীর, মধুর চেয়ে মিষ্টি ও ইস্পাতের চেয়ে শক্তিশালী’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে উভয়পক্ষ থেকে। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের অনেক দেশ তাদের নৌসক্ষমতার আধুনিকায়ন করছে। সমুদ্রসীমায় চীন-পাকিস্তান অক্ষকে শক্তিশালী করা একই ট্রেন্ডলাইনেরই অংশ।
চীন-পাকিস্তান অক্ষশক্তি বাড়িয়ে তোলার আরও দুটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ দৃশ্যমান: যৌথ নৌমহড়া ও অবকাঠামো উন্নয়ন। গত কয়েক বছরে চীন ভারত মহাসাগরে তার নিরাপত্তা উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। পাকিস্তানসহ বেশ কয়েকটি দেশের সাথে নিয়মিত নৌমহড়া চালাচ্ছে। এই নৌমহড়ার সর্বশেষ পুনরাবৃত্তি হয় ২০২৩ সালের নভেম্বর উত্তর আরব সাগরে, যা এক্সারসাইজ সি গার্ডিয়ান নামে পরিচিত। মহড়ায় সাবমেরিনবিরোধী ড্রিল অন্তর্ভুক্ত ছিল। উভয় নৌবাহিনীকে একে অপরের সাথে পরিচিত করাতে এবং বিশ্বাস গড়ে তুলতে সাহায্য করে সেই মহড়া। পাকিস্তানের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ গোয়াদর বন্দরের উন্নয়নে চীন ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে, যা জিবুতির পরে ভারত মহাসাগরে চীনের দ্বিতীয় নৌঘাঁটি হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ভারতের মাত্রা
চীন ভারত মহাসাগরে ২০০৮ সাল থেকে ধীরে ধীরে তার নৌ উপস্থিতি প্রসারিত করছে। যেকোনো সময় তারা তিন থেকে ছয়টি চীনা যুদ্ধজাহাজ ভারত মহাসাগর অঞ্চলে হাজির করতে পারে । চীনের গবেষণা জাহাজ ও মাছ ধরার জাহাজগুলিও এ অঞ্চলে সর্বদা উপস্থিত রয়েছে। পাকিস্তানের নৌবাহিনীর আধুনিকীকরণ এবং নৌসক্ষমতা বৃদ্ধি করার পেছনে চীনের লক্ষ্য কী? ভারত মহাসাগরে চীনের প্রধান প্রতিপক্ষ ভারতের বিরুদ্ধে একটা পাল্টা শক্তি হিসেবে পাকিস্তানকে গড়ে তোলা।
হিমালয় পর্বতমালায় ভারতীয় সামরিক বাহিনীর ওপর চীন প্রতিনিয়ত চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছে। এর পাশাপাশি পাকিস্তানকে শক্তিশালী করাও চীনের একটি কৌশল বলে মনে করা যেতে পারে।
আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার, ইউক্রেন ও গাজায় যুদ্ধের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জড়িত থাকায় চীন আরব সাগর অঞ্চলে উপস্থিতি বাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে। নৌবাহিনীর আধুনিকায়নে সহযোগিতা করে চীন পাকিস্তানেও তার প্রভাব বিস্তার করতে পারছে। এই ধরনের প্রভাব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যে আসে। ফলস্বরূপ, পাকিস্তান ইন্দো-প্যাসিফিকের ধারণাকে সমর্থন করতে অস্বীকার করেছে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্বারা চ্যাম্পিয়ন।
ভারত মহাসাগরের ভূ-রাজনীতি
হরমুজ প্রণালির কাছে এবং অশান্ত পারস্য উপসাগরের কাছে অবস্থিত পাকিস্তান, যা চীনের জন্য একটি অতিরিক্ত সুবিধা। কম্বোডিয়ার জিবুতি ও রেম, সেই সঙ্গে পাকিস্তানের গোয়াদরে ভবিষ্যৎ চীনা ঘাঁটি ভারত মহাসাগরে চীনের উপস্থিতি অনেক দূর এগিয়ে যাবে। এছাড়া মালদ্বীপ ও মিয়ানমারের মতো দেশগুলির রাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তনও বেইজিংয়ের জন্য বিশেষ সুবিধাজনক।
অর্থনৈতিক পদক্ষেপও চীন-পাকিস্তান অক্ষের শক্তি বৃদ্ধিতে গভীর অবদান রাখে। চীন পাকিস্তানে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করেছে, যা আনুমানিক ৬০ বিলিয়ন ডলার। চীনা প্রকল্প ও নাগরিকদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পাকিস্তানের সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। নিরাপত্তার জন্য পাকিস্তানের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত থাকা চীনের জন্য অপরিহার্য।
পাকিস্তানের প্রতি চীনের অব্যাহত সমর্থন (পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সমস্যা ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা সত্ত্বেও) এই অঞ্চলের অন্য দেশগুলির কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেয় যে, চীন একটি বিশ্বাসযোগ্য শক্তি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে প্রয়োজনে তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য চীনকে বিশ্বাস করা যেতে পারে।
চীনের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নির্ভর করে সস্তা জ্বালানির অব্যাহত সরবরাহের ওপর। তাদের জ্বালানির নিরাপত্তা দেয় প্রধান তেল সরবরাহকারী ইরান ও সৌদি আরব। সেজন্য চীনকে পারস্য উপসাগরের উপর নির্ভর করতে হয়। আর এই উপসাগরের তীরেই রয়েছে পাকিস্তান, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইউক্রেন ও গাজা যুদ্ধের মতো সংকটে বিশ্বের জ্বালানি-বাজার অস্থির। কিন্তু চীন ইরান থেকে সস্তায় জ্বালানি কিনতে পারছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান উন্মুক্ত বাজারে তেল বেচতে পারে না।
ভারত মহাসাগরের ভূ-রাজনৈতিক লেন্সের মাধ্যমে দেখলে, পারস্য উপসাগর ও উত্তর ভারত মহাসাগরের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে চীনকে সহায়তা করবে পাকিস্তানের নৌসক্ষমতা। এই পর্যবেক্ষণ চীনের জন্য জরুরি। কারণ একদিকে রয়েছে ভারতীয় শক্তি আরেক দিকে আছে মধ্যপ্রাচ্যে বিরাট মার্কিন ঘাঁটি।
(সংকল্প গুর্জর : ‘দ্য সুপার পাওয়ারস প্লেগ্রাউন্ড: জিবুতি ও একুশ শতকের ইন্দো-প্যাসিফিকের ভূ-রাজনীতি’-এর লেখক)
