পেশাদার খেলোয়াড়দের রাজনীতি থেকে দূরে থেকে নিজেদের ক্যারিয়ারে মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ সোমবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে জাতীয় ক্রীড়া ভাতা ও ক্রীড়া কার্ড কর্মসূচির উদ্বোধন অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘খেলোয়াড় বন্ধুরা, আপনাদের সবার প্রতি আমার একান্ত আহ্বান, একান্ত অনুরোধ, পেশাদার খেলোয়াড়ি জীবনে আপনারা কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর প্রতিনিধি নন বা হবেন না দয়া করে। বরং ক্রীড়ানৈপুণ্য দিয়ে দেশের প্রতিনিধি হয়ে উঠবেন আপনারা।
‘দেশের জন্য সম্মান বয়ে নিয়ে আসবেন, গৌরব বয়ে নিয়ে আসবেন আপনারা। দেশে-বিদেশে বিজয়মালা বরণ করে বিশ্বে ক্রীড়াজগতে বাংলাদেশকে উচ্চতর মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করবেন ইনশাল্লাহ।’
খেলোয়াড়দের নিজেদের সেরাটা দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টগুলোর দিকে আমাদের লক্ষ্য থাকবে। আমাদের ছেলেমেয়েরা যে দেশের জন্য সম্মান বয়ে নিয়ে আসতে পারে, সেটা এরই মধ্যে প্রমাণ হয়েছে। ইনশাআল্লাহ আগামী দিনেও এটা অব্যাহত থাকবে। কথা বলার অনেক কিছুই আছে। আমার মনে কথা কম কাজ বেশি করতে হবে। কথা কম, খেলতে হবে বেশি। দেশপ্রেম, দৃঢ় ইচ্ছা আর টিম স্পিরিট থাকলে আপনাদের সাফল্যের পথে কেউ বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না বলে আমি বিশ্বাস করি।’
জাতীয় ক্রীড়া ভাতা ও ক্রীড়া কার্ড কর্মসূচির উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। সোমবার, ৩০ মার্চ। ছবি: প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর
এ সময় খেলাধুলায় দেশকে এগিয়ে নিতে মহাপরিকল্পনার গ্রহণ করা করা হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’—এই অঙ্গীকার নিয়ে আমরা ক্রীড়াঙ্গনকে আমূল বদলে দিতে চাই। দেশের প্রতিটি জেলায় আন্তর্জাতিক মানের ‘স্পোর্টস ভিলেজ’ এবং প্রতিটি ইউনিয়নে খেলার মাঠ তৈরির মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।’
এর আগে, দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ক্রীড়াবিদদের রাষ্ট্রীয় বেতন কাঠামোর আওতায় আনতে জাতীয় ক্রীড়া ভাতা ও ক্রীড়া কার্ড কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে ২০টি খেলার ক্রীড়াবিদরা আনুষ্ঠানিক ভাতার আওতায় আসলেন। অনুষ্ঠানে ১২৯ জন ক্রীড়াবিদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে ১ লাখ টাকা করে স্থানান্তর করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো সেই আর্থিক অনিশ্চয়তা দূর করা যা অনেক সময় মেধাবী ব্যক্তিদের ক্রীড়া জীবন ছেড়ে দিতে বাধ্য করে। তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বে ক্রীড়া আর শুধু শখ বা বিনোদনের বিষয় নয়; এটি একটি স্বীকৃত পেশা। বাংলাদেশেও ক্রীড়াকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হবে—এ প্রতিশ্রুতি বিএনপি ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে ইশতেহারে দিয়েছিল, যার বাস্তবায়ন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, খেলোয়াড়দের আর্থিক অনিশ্চয়তা দূর করতে সরকার প্রথমবারের মতো তাদের বেতন কাঠামোর আওতায় আনছে এবং ক্রীড়া ভাতা প্রদান শুরু করেছে। এতে খেলোয়াড়রা নিজেদের পছন্দের খেলাকে নিশ্চিন্তে পেশা হিসেবে নিতে পারবেন।
ক্রীড়াকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের ছোটোবেলা থেকেই খেলাধুলায় উৎসাহিত করতে চতুর্থ শ্রেণি থেকে খেলাধুলা বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে শিক্ষা কারিকুলামেও পরিবর্তনের কাজ চলছে।
তারেক রহমান বলেন, শিশু-কিশোরদের প্রতিভা বিকাশে ১৯৭৬ সালে শুরু হওয়া বিটিভির জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’ নতুনভাবে চালু হয়েছে। এবার ক্রীড়া প্রতিভা খুঁজে বের করতে আগামী ৩০ এপ্রিল থেকে সিলেট থেকে শুরু হয়ে দেশব্যাপী ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ আয়োজন করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী এ ক্রীড়া কার্ডকে সরকারের বৃহত্তর জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির অংশ হিসেবে বর্ণনা করেন, যা বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে তৈরি করা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, ইতোমধ্যে ফ্যামিলি কার্ড, ইমাম-খতিব ও অন্যান্য ধর্মীয় নেতাদের সম্মানী ভাতা এবং সারা দেশে খাল খনন কর্মসূচি চালু হয়েছে। আগামী ১৪ এপ্রিল থেকে কৃষক কার্ড চালু হবে। এর ধারাবাহিকতায় চালু হলো ক্রীড়া কার্ড। শারীরিক প্রতিবন্ধী ক্রীড়াবিদরাও এর আওতায় আসবেন।
যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক জানান, আগামী সাত দিনের মধ্যে ৫০০ জন ক্রীড়াবিদকে এই কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে ক্রীড়াকে একটি সম্মানজনক পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, এ ভাতা চালুর মাধ্যমে তা পূরণ হলো।
ফুটসাল, কাবাডি, ভলিবল এবং আর্চারিসহ শারীরিক প্রতিবন্ধী ও সক্ষম—উভয় ধরনের ক্রীড়াবিদরাই এ কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত। তবে জাতীয় ক্রিকেট বোর্ড স্বাধীনভাবে পরিচালিত হওয়ায় ক্রিকেটারদের এই ব্যবস্থার বাইরে রাখা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং আরাফাত রহমানের ক্রীড়া ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক অবদান নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
