সিএনএন প্রতিবেদন
মার্কিন হামলা: তেহরানবাসীর অনুভূতি কেমন?
তেহরানের রাস্তাগুলো অস্বাভাবিকভাবে নীরব। শহর যেন থম মেরে আছে। কিন্তু এই নীরবতা হঠাৎ ভেঙে দেয় আকাশ থেকে নামা বোমা।
শুক্রবার সকালে তীব্র বিমান হামলার কয়েক ঘণ্টা পর তেহরানের এক ৩০ বছর বয়সী বাসিন্দা সিএনএনকে বলেন, ‘শহরটা এখন যেন ভূতের শহর। কেউ রাস্তায় বের হচ্ছে না, কেউ আসা–যাওয়া করছে না। মাঝে মাঝে কাউকে দেখলে মনে হয় যেন আত্মাহীন মানুষ হাঁটছে—একেবারে ‘ওয়াকিং ডেড’-এর মতো।’
তিনি আরও বলেন, মানুষ আতঙ্কে ছিল। তবু কেউ কেউ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে যুদ্ধবিমান দেখছিল, যেন তারা সিনেমা দেখতে এসেছে।
আরেকজন তেহরানবাসী বুধবার সিএনএনকে বলেন, ‘আমরা খুব অদ্ভুত সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। বুঝতেই পারছি না খুশি হব, নাকি দুঃখ পাব।’
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সমন্বিতভাবে ইরানে হামলা চালাচ্ছে। এর জবাবে পাল্টা হামলা শুরু হয়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়ে বড় যুদ্ধে রূপ নিয়েছে।
এই যুদ্ধ অনেক ইরানির মনে জটিল অনুভূতি তৈরি করেছে। যারা বহুদিন ধরে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির কঠোর শাসনের অবসান চান, তাদের মধ্যে এক ধরনের আশা দেখা যাচ্ছে। আবার সরকারপন্থী অনেক মানুষের জন্য শুরু হয়েছে শোকের সময়। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু খামেনির উত্তরসূরিদেরও লক্ষ্যবস্তু করার কথা বলেছেন।
তবে অনেক ইরানি আছেন যারা সরকার পরিবর্তন চান, কিন্তু বিদেশি সামরিক হামলার মাধ্যমে তা ঘটবে—এটা কখনো ভাবেননি।
এক তেহরানবাসী বলেন, ‘শত্রু আমাদের ওপর হামলা চালাচ্ছে, শহরে বোমা ফেলছে। তবু আমরা ঠিক কী অনুভব করব বুঝতে পারছি না।’ নিরাপত্তা শঙ্কার কারণে এই প্রতিবেদনে কথা বলা অনেক ইরানি তাদের নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিএনএনের সঙ্গে কথা বলেছেন।
দীর্ঘদিনের দমন–পীড়নের কারণে অনেকের মনে ক্ষোভ জমে ছিল। ওই বাসিন্দা বলেন, ‘আগের অবস্থাটা আরও কঠিন ছিল। আমরা বন্ধুদের মধ্যে বলতাম, এই যুদ্ধ বিপজ্জনক, অনিশ্চয়তা আছে। কিন্তু আগের পরিস্থিতি মানসিকভাবে আরও কঠিন ছিল।’
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়েও সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় হাজার হাজার বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। তখন পুরো দেশে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।
তবে সবাই সরকার পরিবর্তন চান না। বুধবার রাতে পাঠানো এক ভয়েস বার্তায় শোনা যায়, খামেনির মৃত্যুর পর ঘোষিত প্রথম শোক দিবসে রাস্তায় জড়ো হওয়া সরকারপন্থী মানুষের স্লোগান।
ওই তেহরানবাসী বলেন, ‘এটাই এখনকার জীবন। তারা প্রতি রাতে বের হয়। শুধু কয়েকজন নয়, অনেক মানুষ। এই পরিস্থিতিও আমাদের পাগল করে দিচ্ছে।’
ইরানের সমাজে আগে থেকেই রাজনৈতিক বিভাজন ছিল। যুদ্ধের কারণে সেই বিভাজন এখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
তবে রাজনৈতিক অবস্থান যাই হোক, বোমা হামলা অনেক মানুষের জন্য ভয়ের কারণ হয়ে উঠেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো জানিয়েছে, শনিবার থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে শিশুও রয়েছে।
ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মিনাবে শনিবার এক বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলায় অন্তত ১৬৮ শিশু ও ১৪ শিক্ষক নিহত হয়েছেন বলে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে।
এই ঘটনার পর জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক দ্রুত, নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘নির্বিচারে হামলা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন।’
হোয়াইট হাউস বুধবার বলেছে, ওই হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা জড়িত ছিল কি না তা তারা নাকচ করছে না। তবে তারা দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ‘বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় না।’
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় আবাসিক এলাকা, হাসপাতাল, স্কুল, জরুরি সেবা কেন্দ্র এবং ঐতিহাসিক স্থাপনাসহ বহু বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

