Logo
Logo
×

সংবাদ

আল জাজিরার মতামত প্রতিবেদন

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সহজ বিজয়ের ভ্রান্ত কল্পনা

Icon

জাসিম আল-আজ্জাওয়ি

প্রকাশ: ০১ মার্চ ২০২৬, ০১:৫৬ পিএম

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সহজ বিজয়ের ভ্রান্ত কল্পনা

ইরানে হামলা চালানোর আগে টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্পষ্ট করে বলেছিলেন, তারা কেবল কোনো সমঝোতা আদায়ের জন্য সামরিক চাপ দিচ্ছেন না। তাদের লক্ষ্য শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন।

এই হামলা এবং এর পরপরই ইরানের দ্রুত পাল্টা জবাব দেখিয়ে দিল, কূটনীতির মাটি কতটা নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। মধ্যস্থতাকারীরা কয়েক দিন আগেই আলোচনায় বড় ধরনের ‘অগ্রগতি’র কথা জানিয়েছিলেন। বলা হয়েছিল, আগামী সপ্তাহে আবার বৈঠক হবে। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পরিষ্কার হয়েছে, আলোচনাকে হয়তো কখনোই সফল হতে দেওয়া হয়নি। বরং সেটি ছিল যুদ্ধ প্রস্তুতি আড়াল করার একটি উপায়।

হামলার সময়টাও অনেক কিছু বলে দেয়। মনে হচ্ছে, ওয়াশিংটন ও তেল আবিব কয়েক সপ্তাহ আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিল। ইসরায়েলি গণমাধ্যম জানিয়েছে, ইহুদিদের পুরিম উৎসবের আগে অভিযান চালানোর জন্য ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছিল। পুরিম সেই বাইবেলীয় কাহিনি স্মরণ করে, যেখানে প্রাচীন পারস্যে ইহুদিরা গণহত্যা থেকে রক্ষা পেয়েছিল।

ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু দুজনই একটি ‘বিজয়’ ঘোষণা করতে চান। কিন্তু সেই বিজয় আদৌ সম্ভব হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র বলছে, তারা বেসামরিক ও সামরিক নেতৃত্ব এবং সামরিক স্থাপনায় আঘাত করেছে। হয়তো তাদের আশা, দ্রুত নেতৃত্ব অচল করে যুদ্ধ শেষ করা যাবে। ইসরায়েল দাবি করেছে, তারা ইরানের নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে ‘খুব উচ্চ মাত্রার সাফল্য’ পেয়েছে। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানও লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিলেন বলে তারা জানিয়েছে। খামেনির সুরক্ষিত কমপ্লেক্সে বড় হামলার ছবিও প্রকাশ হয়েছে। ইসরায়েলি গণমাধ্যম জানিয়েছে, আইআরজিসির কমান্ডার জেনারেল মোহাম্মদ পাকপুর, সর্বোচ্চ নেতা ও তার উপদেষ্টা আলি শামখানি এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী আমির নাসিরজাদেহ নিহত হয়েছেন।

গত ২০০১ সালের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানের জবাব ছিল ধীর ও হিসেবি। এবার চিত্র ভিন্ন। ইরানি সশস্ত্র বাহিনী প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পাল্টা আঘাত হানে। ইরাক, কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবে মার্কিন ঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। পাশাপাশি ইসরায়েলের হাইফা, তেল আবিব ও ইলাতে হামলা চালানো হয়।

এই দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখায়, ইরান আগেই হামলার আশঙ্কা করেছিল এবং প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল। এখন প্রশ্ন, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ইরান কতটা দীর্ঘস্থায়ী লড়াই চালাতে পারবে, আর যুক্তরাষ্ট্র কতটা দৃঢ় থাকবে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও এই যুদ্ধ নিয়ে উচ্ছ্বাস নেই। ইউগভ ও দ্য ইকোনমিস্টের সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, মাত্র ২৭ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি ব্যবহারের পক্ষে। ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডের আরেক জরিপে সমর্থন আরও কম, ২১ শতাংশ।

যুদ্ধ ট্রাম্পের জন্য বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করেছে। ইরান যদি আত্মসমর্পণ না করে, তাহলে তাকে হয় সংঘাত বাড়িয়ে দীর্ঘ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হবে, নয়তো পিছু হটে দুর্বলতার অভিযোগ শুনতে হবে। মধ্যবর্তী নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, এই যুদ্ধ তার প্রেসিডেন্সির বড় পরীক্ষায় পরিণত হবে। রিপাবলিকান পার্টি যদি কংগ্রেসে নিয়ন্ত্রণ হারায়, তাহলে ট্রাম্পের রাজনৈতিক কর্মসূচি আটকে যেতে পারে। ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলে তার বিরুদ্ধে অভিশংসন চাপও বাড়তে পারে।

এই যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে—এমনটা খুব কম বিশ্লেষকই মনে করছেন। আগের ১২ দিনের যুদ্ধের মতো সহজে যুদ্ধবিরতি হবে, এমন লক্ষণ নেই। ইরান আঞ্চলিকভাবে পাল্টা আঘাত চালাতে প্রস্তুত, যা দীর্ঘ যুদ্ধের ইঙ্গিত দেয়।

ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের বড় চ্যালেঞ্জ হলো, তেহরানের ওপর চাপ বজায় রেখে কীভাবে অঞ্চলকে সম্পূর্ণ অস্থিতিশীল হওয়া থেকে রক্ষা করা যায়। আরেকটি সমস্যা হলো, তারা প্রকাশ্যেই শাসন পরিবর্তনকে চূড়ান্ত লক্ষ্য করেছে।

হামলার ঘোষণা দিয়ে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র মূলত আকাশপথে অভিযান চালাবে, স্থল সেনা মোতায়েন করবে না। তিনি ইরানের জনগণের উদ্দেশে বলেন, ‘তোমাদের স্বাধীনতার সময় এসে গেছে।’ তিনি তাদের বিদ্রোহের আহ্বান জানান।

দুই মাস আগেই ইরানে নজিরবিহীন গণবিক্ষোভ হয়েছিল। কিন্তু কর্তৃপক্ষ কঠোর দমনপীড়ন চালায়, হাজারো মানুষ নিহত হয়। সেই স্মৃতি এখনো সমাজে গভীর দাগ রেখে গেছে। তাই আপাতত বড় আকারের নতুন গণঅভ্যুত্থান সম্ভাবনা কম বলেই মনে হচ্ছে। ইরান এখনো দৃঢ় অবস্থানে আছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নেতৃত্ব-নিধনমূলক হামলা হয়তো চলবে। কিন্তু তা সফল হলেও শাসন পরিবর্তন নিশ্চিত নয়।

শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের জেনারেলরা হয়তো বলবেন, দীর্ঘ যুদ্ধ টেকসই নয়। আগের ১২ দিনের যুদ্ধের অভিজ্ঞতাও সেই শিক্ষা দেয়। যদি যুদ্ধ জেতা সম্ভব না হয়, তাহলে ট্রাম্পের জন্য পরিচিত কৌশল হতে পারে ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ বিজয় ঘোষণা করে বর্ণনা বদলে দেওয়া।

তারপর প্রশ্ন হবে, কীভাবে যুদ্ধবিরতি হবে। আলোচনা আড়াল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে—এমন ধারণা থেকে তেহরান আরও কঠোর অবস্থান নিতে পারে। যদি সরকার টিকে যায়, তাহলে তারা যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনায় ফেরার আগ্রহকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগিয়ে ছাড় আদায় করতে চাইবে। আজ কূটনীতির ভাঙন হয়তো আগামীকাল ইরানকে আরও শক্ত অবস্থান থেকে আলোচনায় বসার সুযোগ করে দিতে পারে।

জাসিম আল-আজ্জাওয়ি একজন পরিচিত সংবাদ উপস্থাপক, অনুষ্ঠান সঞ্চালক এবং গণমাধ্যম প্রশিক্ষক। তিনি দীর্ঘদিন ধরে টেলিভিশন সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। তিনি ‘ইনসাইড ইরাক’ নামে একটি সাপ্তাহিক অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করতেন। এই অনুষ্ঠানে ইরাকের রাজনীতি, সমাজ এবং চলমান ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা হতো। সংবাদ উপস্থাপনা ও প্রশিক্ষণ—দুই ক্ষেত্রেই তার অভিজ্ঞতা তাকে গণমাধ্যম অঙ্গনে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান এনে দিয়েছে।

Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন