টেলিগ্রাফের প্রতিবেদন
বাংলাদেশ বিপ্লব নয়, পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দিয়েছে
গত দেড় দশকের বেশিরভাগ সময়জুড়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশকে এক ধরনের বৈপরীত্য হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে—একদিকে ধারাবাহিক, এমনকি উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি; অন্যদিকে শেখ হাসিনার কঠোর শাসনে গণতান্ত্রিক পরিসর ক্রমশ সংকুচিত হওয়া।
এই সপ্তাহের সংসদ নির্বাচন—স্বাধীনতার পর ১৩তম—শুধু নিয়মিত ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া ছিল না। এটি এমন এক গণঅভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিত হয়, যা হাসিনার ১৬ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের আকস্মিক অবসান ঘটায় এবং দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন উত্থাপন করে।
ফলে এটি ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা—বহু বছরের একদলীয় প্রাধান্যের পর রাজনীতি কি নতুনভাবে শুরু হতে পারবে? ইসলামপন্থী উত্থান কি রাষ্ট্রের গতিপথ বদলে দেবে? ভোটবাক্সে পাওয়া উত্তর ছিল স্পষ্ট—এটি বিপ্লব ছিল না।
বিএনপি বিপুল ব্যবধানে ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করেছে, জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি আসনে জয় পেয়ে। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকার পর আবার জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরে এসেছেন। তিনি দুটি আসনে নির্ণায়ক বিজয় অর্জন করে এখন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে।
হাসিনা ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ১৭ বছরের শাসনের পর, দীর্ঘদিনের প্রধান বিরোধী দল এমন এক নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে, যেখান থেকে আওয়ামী লীগ আইনগতভাবে অংশ নিতে পারেনি।
তবে জয়ের ব্যাপ্তি তার প্রকৃতি আড়াল করতে পারে। এটি কোনো নতুন মতাদর্শিক জোয়ারের ঢেউ ছিল না, যা পুরনো ব্যবস্থাকে সরিয়ে দিয়েছে। বরং এটি ছিল ভোটারদের হতাশা, সংগঠনগত শক্তি এবং বাংলাদেশের ‘ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট’ নির্বাচনী ব্যবস্থার কঠোর অঙ্কের ফল।
ভোটের আগের মাসগুলোতে আরেকটি গল্প আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল—বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর উত্থান। জরিপগুলোতে দেখা যায়, দেশের বৃহত্তম ইসলামপন্থী দলের সমর্থন ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে—যা তাদের ঐতিহাসিক গড় ১২ শতাংশের তুলনায় বিশাল উল্লম্ফন। অনেক বিশ্লেষক ভাবছিলেন, বাংলাদেশ কি “জামায়াত মুহূর্ত”-এর দ্বারপ্রান্তে?
কিন্তু ভোটের অংশ বাড়লেই সংসদীয় আধিপত্য নিশ্চিত হয় না। সরকার গঠন করতে হলে ১৫১টি আসন জিততে হয়। জামায়াতের সমর্থন ঐতিহাসিকভাবে উচ্চ হলেও তা ছিল অসম এবং আঞ্চলিকভাবে কেন্দ্রীভূত—বিশেষ করে রাজশাহী, খুলনা ও রংপুর বিভাগে। সারাদেশে সমান গতির ঢেউ তৈরি করার মতো গতি তাদের ছিল না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা নির্বাচনকে তিন ভাগে ভাগ করেন—স্বাভাবিক নির্বাচন, বিচ্যুতিমূলক নির্বাচন এবং ঢেউ-নির্বাচন। এবারের নির্বাচন ছিল প্রথম দুই ধরনের মিশ্রণ। এটি স্থায়ী মতাদর্শিক পুনর্বিন্যাস নয়, আবার সারা দেশে একক পতাকার নিচে ক্ষোভ-চালিত ঢেউও নয়। বরং অনেক ভোটার সাময়িক বিচ্যুতি বেছে নিয়েছেন, তবে গভীর দলীয় কাঠামো অটুট ছিল।
ক্ষোভের একটি অংশ ছিল বিএনপির দিকেও। আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপির কিছু নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ঘুষ ও চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠে। চায়ের দোকান থেকে জেলা শহর পর্যন্ত ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ শোনা গেছে।
এই অসন্তোষ জামায়াতের উত্থানকে ত্বরান্বিত করে। বিএনপির কিছু সমর্থক দলত্যাগ করেন। দোদুল্যমান ভোটাররা “সৎ” ইসলামপন্থী বিকল্পের দিকে ঝুঁকেন।
জামায়াতের শৃঙ্খলাবদ্ধ কর্মীভিত্তি ও নৈতিক ব্র্যান্ডিং বিশেষ করে শহুরে ও শিক্ষিত ভোটারদের আকৃষ্ট করে। তবে আকর্ষণ মানেই স্থায়ী অঙ্গীকার নয়। বিএনপির ঐতিহাসিকভাবে বিস্তৃত ও সংগঠিত ভিত্তি ভেঙে পড়েনি।
মনোনয়নের ক্ষেত্রে বিএনপি কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেয়। তারা পুরনো ও পরিচিত নেতাদের ওপর ভরসা করে—যাদের নাম-পরিচিতি ও স্থানীয় নেটওয়ার্ক শক্তিশালী। জামায়াত তুলনামূলকভাবে কম পরিচিত প্রার্থী দেয়, বিশেষ করে কিছু বিভাগে তাদের সংগঠন দুর্বল ছিল।
গ্রামীণ বাংলাদেশে এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে সংসদ সদস্য শুধু আইনপ্রণেতা নন, বরং সামাজিক নিরাপত্তা, বিরোধ নিষ্পত্তি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার মধ্যস্থতাকারী। সততা প্রশংসনীয় হলেও তা সেবার নিশ্চয়তা দেয় না।
অনিশ্চয়তার মুখে অনেক ভোটার পরিচিত মুখকেই বেছে নিয়েছেন। তারা হয়তো ক্ষুব্ধ ছিলেন, কিন্তু “চেনা শয়তানই ভালো” নীতিতে ভরসা রেখেছেন।
জামায়াত নারীর অধিকার নিয়ে দ্ব্যর্থতার কারণে নারী ভোটারদের আশ্বস্ত করতে ব্যর্থ হয়। অথচ নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাংলাদেশের উন্নয়নের ভিত্তি। এই ইস্যুতে অস্পষ্টতা তাদের জন্য রাজনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
আরও স্পর্শকাতর ছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে জামায়াতের অতীত ভূমিকার ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা। মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তি। ইতিহাস নিয়ে পুনর্বিবেচনা ভোটারদের আবেগে আঘাত হানে।
জামায়াত তাদের ইতিহাসের সেরা ফল করলেও তা আংশিকভাবে বিএনপির ভুলের সুযোগ নিয়েই। তারা মিত্রদের নিয়ে ৭৬টি আসন জিতেছে—যা ছোট সাফল্য নয়। তবে সরকার গঠনের জন্য যথেষ্ট নয়।
এই নির্বাচনে একটি তৃতীয় শক্তিও উঠে এসেছে—২০২৪ সালের আন্দোলন থেকে জন্ম নেওয়া ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)। তারা জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে ছয়টি আসন পেয়েছে। বিজয়ী-সবকিছু-পায় ব্যবস্থায় এটি বিকল্প শক্তির প্রতি সীমিত হলেও বাস্তব সমর্থনের ইঙ্গিত দেয়।
তারেক রহমান এখন এমন একটি দেশের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন, যা আমূল বদলে যায়নি, বরং পুনঃসমন্বিত হয়েছে। ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৬১ শতাংশ—যা নাগরিক সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত দেয়।
এই বিজয় মতাদর্শিক রূপান্তরের চেয়ে কাঠামোগত সুবিধা ও ভোটারদের হিসাবি সিদ্ধান্তের ফল। ক্ষোভ ঢেউ তুলতে পারে, নৈতিক ভাষণ ভোট বাড়াতে পারে—কিন্তু বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় শেষ পর্যন্ত সংগঠন, নেটওয়ার্ক ও পরিচিতিই জয় এনে দেয়।
বিএনপি বিপ্লবের ঢেউয়ে নয়, বরং অনিশ্চয়তার মুহূর্তে নিজেদের অভিজ্ঞ ও সংগঠিত শক্তি দিয়ে ক্ষমতায় ফিরেছে—কারণ যথেষ্ট সংখ্যক ভোটার বিশ্বাস করেছেন, প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় তারাই দেশকে ভালোভাবে বোঝে।

