আদানির সঙ্গে কয়লার মূল্য পুনর্নির্ধারণ বা চুক্তি বাতিলের মত কমিটির
বিদ্যুৎ খাতে আগের সরকারগুলোর স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলো পর্যালোচনার লক্ষ্যে গঠিত জাতীয় রিভিউ কমিটি ভারতের আদানি পাওয়ার লিমিটেডের (এপিএল) সঙ্গে কয়লার মূল্য নির্ধারণ সংক্রান্ত শর্ত পুনর্বিবেচনার সুপারিশ করেছে।
কমিটি মনে করে, আদানি যদি এই বিষয়ে আলোচনায় না আসে, তবে প্রয়োজন হলে চুক্তি বাতিলের দিকেও যেতে হবে।
তবে তারা কোনো তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ না নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের ওপর এই সিদ্ধান্তের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছে কমিটি।
রিভিউ কমিটির সদস্যরা জানান, বিদ্যুৎ চুক্তির পেছনে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তা এবং আদানি গ্রুপের মধ্যে ‘অনৈতিক যোগসাজশের’ ইঙ্গিত মিলেছে।
এক সদস্য বলেন, ২০১৭ সাল থেকে শুরু হওয়া কিছু বিদেশি ব্যাংক লেনদেন এই চুক্তির সময়কাল ও আলোচনার সময়ের সঙ্গে মিলে যায়।
কমিটি বলেছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আদানি এখনও গুরুত্বপূর্ণ হলেও চুক্তির দুর্বল কাঠামো বাংলাদেশকে আর্থিক চাপের মুখে ফেলেছে।
বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, কয়লার মূল্য নির্ধারণে গৃহীত সূত্রে ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার মূল্যের গড় ব্যবহারের ফলে ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে।
একাধিক সদস্য জানান, পরিস্থিতিগত প্রমাণ থাকলেও কিছু কর্মকর্তার বিদেশি হিসাবে বিপুল অর্থ জমা হওয়ার তথ্য সামনে এসেছে।
কমিটির একজন সদস্য জানান, কারা চুক্তি দ্রুত সম্পন্ন করেছেন এবং এর সুবিধাভোগী ছিলেন—তাদের নাম প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করে এক সদস্য দাবি করেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা—যিনি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন—চুক্তিতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছেন।
তিনি দুই সাবেক সচিব—আবুল কালাম আজাদ ও আহমদ কায়কাউস—এর বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন।
চুক্তি বাতিলে আইনি ভিত্তি আছে কি না—জানতে চাইলে কমিটির চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, সব তথ্য সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা হবে।
২০১০ সালের বিশেষ আইনের আওতায় গঠিত এই কমিটির সদস্য ছিলেন—বিচারপতি মঈনুল ইসলাম, অধ্যাপক আবদুল হাসিব চৌধুরী, আলী আশফাক, জাহিদ হোসেন, মোশতাক হোসেন খান এবং শাহদীন মালিক।
কমিটি বলেছে, সংঘবদ্ধ দুর্নীতি বিদ্যুৎ খাতে গেঁড়ে বসেছে, যার ফলে বিদ্যুতের দাম প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে।
মোশতাক হোসেন খান বলেন, আদানি চুক্তির কিছু প্রমাণ আইনি ব্যবস্থার ভিত্তি হতে পারে। বিচারপতি মঈনুল ইসলাম বলেন, ‘চুক্তি বাতিল সম্ভব না হলেও দুর্নীতির প্রমাণ রয়েছে।’
সূত্র জানায়, বিদ্যুৎ বিভাগের একাধিক সাবেক সচিব ও কর্মকর্তারা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশে কাজ করেছেন।
চুক্তি সংক্রান্ত নথি সংগ্রহ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
এক কর্মকর্তা জানান, আদানি চুক্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। তার নির্দেশে সংশ্লিষ্টরা তা বাস্তবায়ন করেছেন।
২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর কয়লার দাম নির্ধারণ ইস্যুতে একাধিকবার আদানির সঙ্গে বৈঠক হয়।
২৩ জুন ভার্চ্যুয়াল বৈঠকে আদানি পক্ষ থেকে মধ্যস্থতাকারী নিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয় এবং আন্তর্জাতিক সালিশের ইঙ্গিত দেওয়া হয়।
বিপিডিবির চেয়ারম্যান রেজাউল করিম বলেন, এ ধরনের প্রস্তাব আইনি লড়াইয়ের পূর্বাভাস। উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান জানান, সরকার আইনি পথে প্রস্তুত।
২০১৫ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ঢাকা সফরে আদানি চুক্তির সূচনা হয়।
২০১৭ সালে স্বাক্ষরিত পিপিএ অনুযায়ী, ২৫ বছরের জন্য ১,৪৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ চুক্তি হয়।
২০২৩ সালে আদানির প্রথম ইউনিট উৎপাদন শুরু করে। তবে আদানির বিদ্যুৎ দাম অন্য ভারতের উৎসের তুলনায় ৮৫ শতাংশ বেশি।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে আদানির বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি দাম ছিল ১৪ টাকা ৮৭ পয়সা। অন্যদিকে একই সময় অন্যান্য সূত্র থেকে দাম ছিল ৮ থেকে ১০ টাকার মধ্যে।

