সংস্কৃতির চর্চা নিম্নতম স্তরে পৌঁছেছে: সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, ‘বাংলাদেশে সংস্কৃতির চর্চা এখন নিম্নতম স্তরে পৌঁছে গেছে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে দেশে একটি সাংস্কৃতিক জাগরণ ঘটাতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘কিশোরেরা মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটে আটকা পড়ছে, তাদের কোনো সামাজিক জীবন নেই।’ এই পরিস্থিতিকে তিনি কেবল সামাজিক সমস্যা নয়, বরং সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের পরিণতি হিসেবে দেখেন।
সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন অধ্যাপক চৌধুরী। রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে শুক্রবার বিকেলে অনুষ্ঠিত হয় এই আয়োজন। অনুষ্ঠানে ‘একাদশ জাতীয় ত্বকী চিত্রাঙ্কন ও রচনা প্রতিযোগিতা ২০২৫’-এর বিজয়ীদের পুরস্কৃত করা হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে ছায়ানট সংস্কৃতি ভবন ও উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের প্রসঙ্গ টেনে অধ্যাপক চৌধুরী বলেন, ‘এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং সংস্কৃতির ওপর আক্রমণ।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাউলদের ওপর আক্রমণ আগেও হয়েছে, কিন্তু এখন যেভাবে হচ্ছে সে রকম আগে দেখা যায়নি।’
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ঢাকা কলেজ, সিটি কলেজ ও আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীরা তুচ্ছ কারণে বারবার মারামারিতে জড়িয়ে পড়ছে।’ অথচ ছাত্রদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত ছিল মেধা, পড়ালেখা ও সৃজনশীলতায়—এমন মন্তব্য করেন তিনি।
সাভারের দুটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যকার সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এখন কিশোরেরা গ্যাং গড়ে তুলে চাঁদাবাজি করে। অনেকে নিকৃষ্টতম অপরাধ ও কল্পনাতীত অপরাধে ব্যস্ত হয় এবং সেগুলোর মধ্যে বীরত্ব প্রকাশ করে।’
এই পরিস্থিতির জন্য কিশোরেরা নিজে দায়ী নয় বলে মনে করেন অধ্যাপক চৌধুরী। তার ভাষায়, ‘এই পরিস্থিতির জন্য তারা নিজেরা দায়ী নয়, দায়ী গোটা ব্যবস্থা।’ তিনি বলেন, ‘এই অবস্থার পরিবর্তনের একটা সাংস্কৃতিক জাগরণ আনতে হবে। সেই জাগরণের প্রতীক হচ্ছে ত্বকী।’
ত্বকীর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ত্বকীকে কেন হত্যা করা হয়েছে, এটা স্পষ্ট। ত্বকীর কোনো অপরাধ ছিল না। নারায়ণগঞ্জকে যারা চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের কেন্দ্রে পরিণত করেছিল, তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি। তিনি সংস্কৃতিচর্চা করেন। এই দুটো কারণে শাস্তি দেওয়ার জন্য তার কিশোর সন্তানটিকে হত্যা করা হয়।’
২০১৩ সালের ৬ মার্চ নিখোঁজ হওয়া ত্বকীর মরদেহ ৮ মার্চ কুমুদিনী খাল থেকে উদ্ধার করা হয়। র্যাব-১১ গ্রেপ্তার করে আজমেরী ওসমানের সহযোগী সুলতান শওকত ভ্রমর, ইউসুফ হোসেনসহ পাঁচজনকে। সুলতান শওকত ভ্রমর ও ইউসুফ হোসেন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
তবে এখনো মামলার তদন্ত প্রতিবেদন হয়নি। এ নিয়ে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তদন্ত করতে পারে, কিন্তু করছে না। কারণ, তাদের করতে দেওয়া হচ্ছে না। এটা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থারই প্রতিচ্ছবি এবং এই ব্যবস্থার কারণেই হচ্ছে না।’
তিনি বলেন, ‘আজকে কিশোরেরা যে দুর্দশার মধ্যে আছে, সেটা তুলনাবিহীন। এ রকম দুর্দশা, দুর্গতি ও বিপন্ন অবস্থায় কিশোরদের আগে কখনো দেখা যায়নি।’
ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রসঙ্গে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প যে ধরনের কাজ করে যাচ্ছেন, অকপটে বলছেন যে আজকে এই দেশ দখল করব, ওইটা করব—সেগুলো পুরো পৃথিবী সহ্য করছে। জাতিসংঘ ভেঙে যাচ্ছে, সংঘবদ্ধ উদ্যোগগুলো ভেঙে যাচ্ছে।’
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারকে শেখ হাসিনার সরকারের সম্প্রসারণ বললে খুব ভুল হবে না।’
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন প্রশ্ন রাখেন, ‘মামলার অভিযোগপত্র এখনো কেন হচ্ছে না? কারা বাধা দিচ্ছে? অন্তর্বর্তী সরকার কেন এটাকে গুরুত্ব দিতে পারছে না?’
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি। তিনি বলেন, ‘দুই মাস পর ত্বকী হত্যার ১৩ বছর হবে, কিন্তু এখনো অভিযোগপত্র হলো না।’
ত্বকীর মা রওনক রেহানা মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন, তবে বক্তব্য দেননি। অনুষ্ঠানের শেষে তিনটি বিভাগে ৬০ জন প্রতিযোগীর হাতে পুরস্কার তুলে দেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আনু মুহাম্মদ, সারা হোসেনসহ অতিথিরা।

